দিল্লিতে আপ বিধায়কের বহরে গুলি, নিহত ১

বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : দিল্লির আম আদমি পার্টির বিধায়ক নরেশ যাদব অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে জয়ের পর মন্দির থেকে ফেরার সময় তার কনভয়ে হামলা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীদের গুলিতে আপের এক কর্মী নিহত হয়। গুলিতে জখম হয়েছে আরও এক কর্মী। হাসপাতালে চিকিৎ‌সাধীন আপের ওই কর্মীর অবস্থাও সংকটজনক বলে জানা গিয়েছে।

আপের রাজ্যসভা এমপি সঞ্জয় সিং জানান, দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর মন্দিরে পুজা দিতে গিয়েছিলেন নরেশ যাদব। তার সঙ্গে দলের কর্মী-সমর্থকরাও ছিলেন। মন্দির থেকে ফেরার সময় হঠাৎ তার কনভয় লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে একদল দুর্বৃত্ত।

এদিকে বুথ-ফেরত সমীক্ষাকে সত্যি প্রমাণ করে দিল্লিতে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসেছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি (আপ)। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে ২০১৫ বিধানসভা নির্বাচনে পাওয়া ৬৭টি থেকে ৫টি কমে এবারের আসনসংখ্যা ৬২টি।

দেশজুড়ে ধর্মীয় উন্মদনা ছড়িয়ে জাতীয় নির্বাচনে জয় পেলেও, দিল্লিবাসীর আস্থা অর্জন করতে পারেনি উগ্রপন্থি নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি। তারা পেয়েছে মাত্র ৮ আসন, যদিও এবার তাদের আসন গতবারের চেয়ে ৫টি বেড়েছে। লোকসভা নির্বাচনে ভোট প্রাপ্তিতে দ্বিতীয় স্থানে থাকা কংগ্রেস এ বারও খাতা খুলতে ব্যর্থ।

২০১৪ সালে লোকসভায় জিতে দিল্লিতে মুখ থুবড়ে পড়েছিল নরেন্দ্র মোদীর অশ্বমেধের ঘোড়া। পাঁচ বছর পরে সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি হল। অথচ, কয়েক মাস আগেই লোকসভা ভোটে দিল্লির সাতটি আসনই জিতেছিল বিজেপি। আর বিধানসভায় পেয়েছে মাত্র আটটির আসন।

জয়ের পর মঙ্গলবার রাতে দলীয় কার্যালয়ে আপ প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেন, “দিল্লিকে ভালবাসি”, সরকারের কাজ এবং স্থানীয় সমস্যার ওপর ভিত্তি করে দেশের রাজধানীতে জয় পাওয়া “নতুন রাজনীতি”র জন্ম বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন ‘‘আজ থেকে গোটা দেশে এক নতুন রাজনীতি শুরু হল। কাজের রাজনীতি। প্রমাণ হল, যে কাজ করবে মানুষ তাকেই ভোট দেবে।’’

শাহিনবাগে নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে হাতিয়ার করে অমিত শাহের নেতৃত্বে ব্যাপক প্রচার করেছিল বিজেপি, কিন্তু এবারের নির্বাচনে হিংস্র প্রচারণায় সামান্যই ফল পেয়েছে তারা। দুই অঙ্কের আসনও পায়নি কেন্দ্রের শাসক দল, তবে গতবারের থেকে নিজেদের আসন বাড়িয়েছে গেরুয়া শিবির। এবারের নির্বাচনে ৮টি আসনে ফুল ফুটেছে তাদের পদ্ম বাগানে।

আপের এই জয়ের প্রশংসা করে একে বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে জয় বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধী রাজনীতিকরা। এবারের নির্বাচনে খাদ্য, বিদ্যুৎ, জল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সহ বিভিন্ন স্থানীয় ইস্যুর ওপরেই জোর দিয়েছিল শাসকদল আম আদমি পার্টি। এবং এর তার ফলও পেয়েছে তারা। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করছে আম আদমি পার্টি।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টুইট করে কেজরিওয়ালকে জয়ের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অভিনন্দন জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও। পরে প্রধানমন্ত্রীর টুইটের উত্তরে কেজরিওয়াল বলেছেন, ‘‘দিল্লিকে বিশ্বমানের শহর বানানোর জন্য আমি কেন্দ্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত।’’

আপ সূত্র মতে, ১৪ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার কথা ভাবছেন কেজরিওয়াল। ২০১৪ সালে প্রথম দফায় ৪৯ দিন ক্ষমতায় থাকার পর এই তারিখেই ইস্তফা দিয়েছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে ফের শপথ নিয়েছিলেন ওই তারিখেই।

এর আগে মঙ্গলবার সকালে ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর থেকেই এগিয়ে ছিল কেজরিওয়ালের দল। বেলা যত গড়িয়েছে ভোটের ব্যবধানও তত বাড়তে থাকে। ভোটে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকার খবর প্রকাশ হতেই দলীয় কার্যালয়ে ভিড় করতে শুরু করেছে উচ্ছ্বসিত দলীয় কর্মী-সমর্থকরা।

শনিবার ভোটের পর বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় যে, এবারও ক্ষমতায় আসছে আম আদমি পার্টি (আপ)। মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যেই চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার কথা। শনিবার বিধানসভার অনুষ্ঠিত হওয়া ভোট ভোটগণনা হয়েছে ২১টি কেন্দ্রে। এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

শনিবার ভোট শেষ হওয়ার পর দেশটির চারটি গণমাধ্যম তাদের বুথ ফেরত জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। সব জরিপেই ৭০ আসনের মধ্যে ৫০টিরও বেশি আসনে জয়ের আভাষ পাওয়া যায় আম আদমি পার্টির পক্ষে।

অন্যদিকে, ২০ বছর ধরে দিল্লির ক্ষমতার বাইরে থাকা বিজেপি মাত্র ১৬টি এবং দেশটির প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেস মাত্র একটি আসনে জয় পেতে যাচ্ছে বলে জানানো হয় জরিপগুলোতে। তবে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে করা সব জরিপের আভাষ প্রাথমিক ফলের সঙ্গে প্রায় মিলে গেছে।

দিল্লি বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় যেতে হলে যে কোনও দলের কমপক্ষে ৩৬টি আসনে জয় দরকার। এর আগে ২০১৫ সালের নির্বাচনে আম আদমি পার্টি ৬৭ আসনে জয় নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ওই বছর বিধানসভা নির্বাচনে মোট ভোটের ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল আম আদমি পার্টি। বিজেপি পায় ৩২ শতাংশ এবং ৯.৬ শতাংশ ভোট পায় কংগ্রেস।

ভারতের বিতর্কিত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে টানা বিক্ষোভের মাঝেই শনিবার দিল্লি বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নতুন এই নাগরিকত্ব আইন নিয়ে দেশটিতে ব্যাপক চাপের মুখে থাকা বিজেপি দিল্লির নির্বাচনে সুবিধা করতে পারবে না বলে বিশ্লেষকরা আগে থেকেই আভাষ দিয়েছেন।

২০১৩ সালে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবারের মতো অংশ নেয় আম আদমি পার্টি। নির্বাচনে ৭০টি আসনের মধ্যে ২৮টি জিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে এএপির। ভারতীয় জনতা পার্টি ওই নির্বাচনে ৩১টি ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ৮টি আসনে জয় পায়, ৩টি আসনে জয়ী হয় অন্যান্য দল।

ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর আম আদমি পার্টি দিল্লি বিধানসভায় সংখ্যালঘু সরকার গঠন করে। সরকার গঠনে কংগ্রেস কেজরিওয়ালের এই দলের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে। ফলে বিজেপিকে হারিয়ে অরবিন্দ কেজরিওয়াল দিল্লির দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।