করোনাভাইরাস আতঙ্ক, চাই সতর্কতা

বুধবার, জানুয়ারি ২৯, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

চীনে নোভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান বলেছেন, দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের প্রধান ড. উইলিয়াম শাফনার বলেছেন, তারা যতটা ঝুঁকিপূর্ণ ভেবেছিলেন, পরিস্থিতি এখন তার চেয়েও খারাপ। করোনাভাইরাস আক্রান্ত মানুষের দেহে কোনো লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই তা অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে বলে চীনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন। তারা বলছেন, করোনাভাইরাস সার্স বা ইবোলা রোগের ভাইরাসের মতো নয়, এবং এটির মোকাবিলা করা কঠিন। এর কারণ ব্যাখ্যা করে চীনের স্বাস্থ্য কমিশনের পরিচালক বলছেন, মানুষের দেহে এটি ঢোকার পর দু’সপ্তাহ পর্যন্ত কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। কিন্তু তখনো এটা একজন থেকে আরেকজনে ছড়াতে পারে।

১৯৬০ সালে প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব আবিষ্কার করা হয়। মানুষ ও পশু-পাখি এই ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে। অন্যান্য ভাইরাসের মতো এটিও হাঁচি-কাশি ও কফের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। এবার শুরুটা হয়েছে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে। ওই প্রদেশেই মারা গিয়েছে সবচেয়ে বেশি। ভয়ের কারণ বেশি, কারণ রোগটা ছড়াচ্ছে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে। তার ওপর চীনা স্বাস্থ্য কমিশনই বলছে, কেউ উহানে যাবেন না। যারা উহানে রয়েছেন, তারা শহর ছাড়বেন না।

চীনের বিভিন্ন প্রদেশে বহু বাংলাদেশ নাগরিকের বাস। সে দেশের ১৩টি প্রদেশে ও তাইওয়ানে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাসের সংক্রমণ। আবার চীনের এখন অনেক ব্যবসা বাণিজ্য বাংলাদেশের সঙ্গে। শত শত চীনা নাগরিক প্রতিদিন আসছে বাংলাদেশে।

ভারত এরই মধ্যে ‘লাল সতর্কতা’ জারি করেছে। সবগুলো মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করেছে। নেপালে এই ভাইরাসে আক্রান্ত এক ব্যক্তির তথ্য পাওয়া গেছে। ভারত-নেপালেও বাংলাদেশের নাগরিকদের অবাধ যাতায়াত। অর্থাৎ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ আতঙ্কজনক। আনন্দবাজার পত্রিকা খবর দিযেছে, সৌদি আরবে কর্মরত এক ভারতীয় নার্সের দেহে করোনাভাইরাস মিলেছে। সৌদি আরবে লাখ লাখ বাংলাদেশি, আমরা কি তাদের খোঁজ খবর নিচ্ছি?

চীনে থাকা আমাদের নাগরিকদের দেখভাল করছে দূতাবাস— এমনটা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু পুরো বিষয়টি নিয়ে একটি জাতীয় সতর্কতার প্রয়োজন। বিমানবন্দরে এক ধরণের তৎপরতা লক্ষ্যণীয়। কিন্তু সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা চীনা নাগরিকদের কি নজরদারিতে আনা হয়েছে? জানা নেই আমাদের। ভারত বা নেপাল হয়ে কেউ এদিকে এলে তার করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কোনো উপসর্গ রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আয়োজন দরকার স্থল বন্দরগুলোতে।

করোনা আক্রান্তদের সর্দি, কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্টের উপসর্গ থাকে। এই উপসর্গ যাদের মধ্যে দেখা যাবে, তাদেরই পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ভারতে চীন, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর থেকে যারাই আসছে তাদেরই কড়া নজরদারিতে রাখছে বলে খবর দিচ্ছে ভারতীয় গণমাধ্যম। ওই সব দেশ থাকা আসা কারও সর্দি-কাশির উপসর্গ থাকলে তাকে নিজের দেশে ফেরানো হচ্ছে। আমাদেরও দ্রুত শুরু করতে হবে রোগ প্রতিরোধের চিকিৎসা।

হঠাৎ আমদানি হওয়া এই ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো কাজ নয়, কিন্তু যথেষ্ট ভাবনা-চিন্তা করে এগুতে হবে সরকারকে, চিকিৎসকদের। চিকিৎসকরা বলেন, একটি ভাইরাস বিভিন্ন সময় তার জিনগত মিউটেশন ঘটিয়ে নানা ধরনের অসুখ তৈরি করতে পারে। করোনাভাইরাস নিয়েও একই শঙ্কা আছে। মূলত তাদের ওপরই এর হানা মারাত্মক, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করাই এর শিকার হতে পারে বেশি।

বাংলাদেশ কোনোভাবেই নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারে না। আমরা জানলাম, বিমানবন্দরে চীন, হংকং, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড থেকে আসা কারও মধ্যে যদি জ্বর থাকে, তাহলে বিমানবন্দরের স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের নাম, ঠিকানা লিখে রাখছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শগুলোর মধ্যে রয়েছে বারবার হাত ধোয়া, হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ না করা ও ঘরের বাইরে গেলে মুখোশ পরা ইত্যাদি। এগুলো ঠিকই আছে। কিন্তু কোনো কারণে যদি বাংলাদেশে একজন ব্যক্তিও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তাহলে এর সংক্রমণ ঠেকাতে কী কী করতে হবে, সেই ভাবনাটাই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের মতো উন্নত দেশই পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে হবে। আমরা ঝুঁকির মধ্যে আছি এবং আমরা যেন নিরুদ্বিগ্নভাবে চেয়ে না থাকি।

লেখক: এডিটর ইন চিফ,দৈনিক সারাবাংলা ও জিটিভি