করোনা ভাইরাস: চীনে নিহত বেড়ে ৫৬, আক্রান্ত ২ হাজার

রবিবার, জানুয়ারি ২৬, ২০২০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চীনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৬ জনে দাঁড়িয়েছে। নতুন এই ভাইরাসে এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ১ হাজার ৯৭৫ জনের মতো আক্রান্ত হয়েছে। ভাইরাসটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে ভাইরাসটি যাতে মহামারী হয়ে না উঠে সে ব্যাপারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সজাগ দৃষ্টি রাখছে। চীনের রাষ্ট্রীয় বরাতে এসব জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন রবিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চীনে এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৯৭৫ বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। শনিবার মৃত্যুর সংখ্যা ৪১ থেকে বেড়ে ৫৬ জনে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল উহানে, যেখান থেকে এই ভাইরাসের উদ্ভব হয়েছে। নতুন করে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবঙ ৩২৩ জন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।

ভাইরাসটি দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ায় এর ভয়াবহতা সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, “চীন ভয়াবহ ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আমরা এটা কাটিয়ে উঠতে পারব বলে বিশ্বাস করি।”
এখন পর্যন্ত ভাইরাসে মারা যাওয়া সব ঘটনাগুলোই চীনে। তবে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, নেপাল, ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি সনাক্ত করা গেছে। এছাড়া গতকাল কানাডার ওন্টারিওতে প্রথম একজনের শরীরে করোনা শনাক্ত করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে ভাইরাসটি একজন মানুষের মাধ্যমে আরেকজনের শরীরে ছড়াচ্ছে। এটি উহানের একটি বাজার থেকে উদ্ভূত হয়েছিল, যেখানে অবৈধভাবে ধরে আনা বন্যপ্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায় বলে বিশ্বাস স্বাস্থ বিশেষজ্ঞদের। বন্যপ্রাণীগুলো বিক্রি করার জন্য ধরে আনা হতো।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লুএইচও) এই সপ্তাহে নতুন করোনভাইরাসকে “চীনে জরুরি অবস্থা” হিসেবে ঘোষণা করেছে, তবে বিষয়টিকে এখনও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।

ভাইরাসটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েতে থাকায় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলে। ফরাসী কর্তৃপক্ষ শুক্রবার সন্ধ্যায় ইউরোপে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করেছে।

১১ মিলিয়ন জনসংখ্যার শহর ও মধ্য হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। উহানের বিমানবন্দরে সমস্ত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। শহর থেকে বেরিয়ে আসা প্রধান রাস্তাগুলি চেকপয়েন্ট দিয়ে অবরুদ্ধ করা হয়েছে। চলমান পর্যবেক্ষণ প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে কর্তৃপক্ষ উহানের নিকটবর্তী ১০টিরও বেশি শহরকে বাইরে থেকে একইভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

উহান পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর, ফার্মেসিগুলির সরবরাহ শেষ হয়ে যেতে শুরু করেছে। স্থানীয়া বাসিন্দাদের দ্বারা হাসপাতালগুলি ভর্তি হয়ে গেছে। আগামী সোমবারের মধ্যে শহরটি এক হাজার শয্যা বিশিষ্ট নতুন হাসপাতাল তৈরির কাজ শুরু করেছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। এছাড়া আগামী ১০ দিনের মধ্যে শুধুমাত্র করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে দু’টি নতুন হাসপাতালের কাজ শুরু হয়েছে। যেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।

শনিবার হুবেইয়ের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখানে আক্রান্ত ৬৫৮ জন রোগী চিকিতৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে। যাদের মধ্যে ৫৭ জনের অবস্থা গুরুতর।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা স্টাডিজের লিবার্থাল-রোজেল সেন্টারের পরিচালক মেরি গ্যালাঘার বলছিলেন, “এটা অবশ্যই বিভ্রান্তকর ও বিপর্যয়কর, প্রথমে সরকার নাগরিকদের আশ্বাস দিয়েছিল যে, ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে না এবং নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তারপর মাত্র চার দিন পরে উহান ও অন্যান্য শহরগুলিকে অভূতপূর্বভাবে অবরুদ্ধ করা হয়েছে।”

নতুনভাবে চিহ্নিত করোনা ভাইরাসটি বিপদজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কারণ এর সম্পর্কে এখনও অনেক অজানা বিষয় রয়েছে। যেমন, এটি কতটা বিপজ্জনক এবং এটি কত সহজেই মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

শনিবার থেকে শুরু হওয়া চন্দ্র নববর্ষের সপ্তাহব্যাপী ছুটির দিনে কয়েক মিলিয়ন চীনা দেশে-বিদেশে ভ্রমণ করার কারণে সংক্রমণ হার দ্রুত হতে পারে বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন।

এই অবস্থায় ভাইরাস আরও বেশি ছড়িয়ে পরতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সে কারণে নববর্ষের অনেক অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করায় চীনা কর্তৃপক্ষ উহান থেকে চলাচলকারী সকল যানবহন বন্ধ ঘোষণা করেছে। হুবেই প্রদেশে ভ্রমণে কড়া সতর্কতা জারি করেছে দেশটির সরকার।

বিশ্বজুড়ে বিমানবন্দরগুলি চীন থেকে আসা যাত্রীদের ভাইরাস শনাক্তে স্ক্রিনিংয়ের কাজ বাড়িয়েছে, যদিও কিছু স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং বিশেষজ্ঞরা এই জাতীয় স্ক্রিনিংয়ের কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন।

উহান শহরে সব বাস, মেট্রো এবং ফেরি চলাচল বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে শহর থেকে সব ফ্লাইট ও রেল সেবা বাতিল হয়েছে। ইঝু শহরে রেল স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে ইনসি শহরে সব বাস সেবা বাতিল করা হয়েছে।

যারা উহান শহর থেকে ফিরেছেন তাদের অন্তত ১৪ দিন বাড়িতে থাকার নির্দেশ দিয়েছে বেইজিং ও সাংহাই কর্তৃপক্ষ। এই ভাইরাস যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্যই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

উহান শহরে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের বসবাস। মূলত ওই শহরে প্রাদুর্ভাব ঘটার পর ভাইরাসটি রাজধানী বেইজিংসহ অন্যান্য প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রতিবেশী জাপান, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ম্যাকাও এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াতেও এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

এখন ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস। ফ্রান্সে তিনজনের এই ভাইরাসে আক্রান্তের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। শুক্রবার রাতে ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বোরডক্সে প্রথম একজন এবং প্যারিসে দু’জনের এই ভাইরাসে আক্রান্তের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লুএইচও) এ সপ্তাহে নতুন করোনাভাইরাসকে “চীনে জরুরি অবস্থা” হিসেবে ঘোষণা করেছে।

এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলো হলো জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট। সেভার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (সার্স) ঘরানার এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। এটি নিউমোনিয়া হতে পারে, যা কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক।