ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি পাকিস্তানের সঙ্গে উন্নতি?

শনিবার, জানুয়ারি ২৫, ২০২০

ঢাকা: গত ৪৮ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক কখনোই উষ্ণ ছিল না। এই দুই দেশের মধ্যে সব সময়ই সম্পর্কের টানাপড়েন ছিলো। ২০১৬ সালে ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের অংশগ্রহণে অনীহার কারণে পাকিস্তান সার্ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাকিস্তান ২০১৭ সালে ঢাকায় আয়োজিত আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের বৈঠক বর্জন করেছিল। একাধিকবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে পাকিস্তানে দল পাঠাতে অস্বীকার করেছে। দেশে জঙ্গি অর্থায়নে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার অভিযোগে বাংলাদেশ বরাবরই পাকিস্তানকে দায়ী করে আসছে। এজন্য বহিষ্কার করা হয়েছিল পাকিস্তানি কূটনীতিককে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এতটা খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল যে, উভয় দেশ একে অপরের পেশাজীবীদের জাতিসংঘের হয়েও নিজ নিজ দেশে কাজ করতে ভিসা দেয়া বন্ধ রাখে। কূটনীতিক সাকলাইন সাইয়েদাকে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হাইকমিশনার হিসেবে গ্রহণ না করা নিয়ে ব্যাপক টানাপড়েন ছিলো। কিন্তু এসব কিছুকে ছাপিয়ে হঠাৎ করেই পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এর অংশ হিসেবে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বড় আকারের এবং স্থায়ী কনস্যুলেট জেনারেল ভবন নির্মাণের উদ্যোগও নিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটির সংশোধনী জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করা যেমন এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য তেমনি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কেরও উন্নয়ন ঘটাতে চায় বাংলাদেশ।
শুধু তাই নয় ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পাকিস্তান যাওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে। তিন মাসে তিন দফায় এই সফর অনুষ্ঠিত হবে। ২৪ জানুয়ারি থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম দফায় লাহোরে গিয়ে তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলবে বাংলাদেশ। এরপর ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দফায় পাকিস্তানে গিয়ে রাওয়ালপিন্ডিতে বাংলাদেশ খেলবে প্রথম টেস্ট। একমাত্র টেস্ট খেলেই দেশে ফিরে আসবে দল। তারপর আবার এপ্রিল মাসে পাকিস্তান যাবে টাইগাররা। ৩ এপ্রিল করাচিতে একমাত্র ওয়ানডের পর ৫ এপ্রিল থেকে সেখানেই হবে দ্বিতীয় টেস্ট। শুরু থেকে বলা হচ্ছিল বাংলাদেশ টেস্ট খেলবে না, টি-টোয়েন্টি খেলবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি খেলতে তিন দফার এই সফর নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে নানারকম কথা হচ্ছে। অনেকে মনে করছেন যে, এটা পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরাজয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেছেন যে, এটা কোনো কূটনৈতিক পরাজয় নয়, বরং বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করেছে। পাপন যাই বলুন না কেন, বাংলাদেশের এই পাকিস্তান সফর বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন বার্তা বহন করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি অনলাইন পত্রিকাও এই খবর দিয়েছে।
‘পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে বাংলাদেশ?’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে পত্রিকাটি বলেছে, ‘প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে উঠছে বাংলাদেশ। এটার ফলে অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।’ দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় দৈনিকও সম্প্রতি একই ধরনের খবর প্রকাশ করেছে। ‘ইসলামাবাদে হচ্ছে স্থায়ী কনস্যুলেট ভবন: পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার উদ্যোগ’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করতে চায় সরকার। দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কেও উন্নয়ন প্রত্যাশা রয়েছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই ইসলামাবাদে বড় আকারের একটি স্থায়ী কনস্যুলেট ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কনস্যুলেট ভবন নির্মাণের জন্য পাকিস্তান সরকার ৭ হাজার ৭৬৮ কোটি বর্গমিটারের একটি জমি বাংলাদেশকে দিয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ও ইসলামাবাদে প্রকল্পটি নির্মাণের পক্ষে তাদের সুপারিশ দিয়েছে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যায় চারটি যুক্তি তুলে ধরা হয়েছেÑ (ক) পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা ও তা শক্তিশালী করা; (খ) দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়ন করা; (গ) বর্তমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মিশনে প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো সুবিধা সৃষ্টি; (ঘ) পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ সরকারকে দূতাবাসের জন্য প্রদত্ত জমির সদ্ব্যবহার করা। পাকিস্তাানে কনস্যুলেট ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য সুপারিশে পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, “ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের নির্মাণাধীন কনসুলেট ভবনটি হলে নিজস্ব ভবনে মিশনের দাফতরিক কাজ পরিচালনা করা সম্ভব হবে। একনেকে প্রকল্পটির সংশোধনী সদয় ও সানুগ্রহ অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হলো।” পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের পক্ষে ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের ঠিকানা- ব্লক-৯ ও ১৫, সেক্টর জি-৫, ডিপ্লোম্যাটিক এনক্লেভ, ইসলামাবাদ, পাকিস্তান। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। তৃতীয় দফায় সংশোধিত এ প্রকল্পটির কাজ আগামী ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) চলমান প্রকল্প হিসেবে প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত। বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ কোটি টাকা।
হঠাৎ করে কেন পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে বাংলাদেশ?
দীর্ঘ টানাপড়েনের পর বাংলাদেশ হঠাৎ করে কেন পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের শীতল সম্পর্ক যেমন এই ঘনিষ্ঠতার নেপথ্যে কাজ করছে ; তেমনি চীনা প্রভাবও এখানে কাজ করছে। তবে নাগরিকত্ব আইনসহ নানা ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অব্যাহত টানাপড়েনও পাকিস্তানের প্রতি ঘনিষ্ঠ হওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। ভারতের ‘নয়া নাগরিকত্ব আইন’, পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশকে একই পাল্লায় রেখে ভারতের মন্ত্রী অমিত শাহের বার বার সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা বলা, নতুন করে আবারো ভারত থেকে বাংলাদেশে শরণার্থী ঢোকার আশংকা, এমনকি সাম্প্রতিক শেখ হাসিনার কলকাতা সফরের সময় দিল্লীর কোনও প্রতিনিধির উপস্থিত না থাকা, এমনকি আজ অবদি তিস্তা পানি বণ্টনের কোন সুরাহা না হওয়া; সর্বোপরি অতি সম্প্রতি তিন তিনজন বাংলাদেশি মন্ত্রীর ভারত সফর বাতিল প্রভৃতি কারণে বিশেষজ্ঞমহল মনে করছেন যে, দু’দেশের সম্পর্কে একটা বড় চিড় ধরতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ- ভারত সম্পর্কের যে অবনতি হচ্ছে কোলকাতার বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকাও এক প্রতিবেদনে তার ইঙ্গিত দিয়েছে। পত্রিকাটি লিখেছে, “২০০৯ সালে ভোটে জিত নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে ভারত-বাংলাদেশের এমন তিক্ততা আগে কখনও দেখা যায়নি। কোন কারণেই অতীতে কখনও বাংলাদেশ পক্ষের ভারত সফর বাতিল হয়নি। কূটনীতিকদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে সাম্প্রতিক অতীতে যে মন কষাকষি চলছিল তাতে ঘৃতাহুতি হয়েছে নয়া নাগরিকত্ব আইন পাস করার বিষয়টি। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে এক বন্ধনীতে রেখে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বার বার সংখ্যালঘু নির্যাতনের উল্লেখ, রোহিঙ্গার পর ফের ভারত থেকে বাংলাদেশে শরণার্থী ঢোকার আশঙ্কা, শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক কলকাতা সফরে কেন্দ্রের কোনও প্রতিনিধির উপস্থিত না থাকা-সব মিলিয়ে গোটা বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতার ঢেউ তৈরি হয়েছে। যার জেরে সম্প্রতি তিন জন বাংলাদেশের মন্ত্রী এবং সরকারি প্রতিনিধির বাংলাদেশ সফর বাতিল করে এর জবাব দিয়েছে ঢাকার সরকার। কিন্তু তার পরে সম্পর্ক কিছুটা সহজ করতে নরেন্দ্র মোদী বছরের প্রথম দিন ফোন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। দুই নেতার মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়। পাশাপাশি আগামী ১৭ মার্চ থেকে বাংলাদেশে শুরু হতে চলা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের সাফল্য কামনা করেন মোদী। কিন্তু তাতে যে চিঁড়ে ভিজছে না, সেটা স্পষ্ট।”
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে সরকার যে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে সম্প্রতি পেঁয়াজ আমদানিই তার একটি উদাহরণ। ভারত রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে যখন পেঁয়াজের সংকট চলছিল, সেসময় পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানি করেছিল ঢাকা। এছাড়া এনআরসি ইস্যুতে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনারের গাড়িতে হামলা, সাইনবোর্ড উপড়ে ফেলা, যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক বাতিলসহ নানা ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্ব বেড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার পর্যবেক্ষক ডেভিড এন রবিনসনের মতে, ‘বাংলাদেশে ভারত সব সময় বড়ভাইসুলভ আচরণ করে আসছিল। ফলে এই দেশটিও চীনের দিকে ঝুঁকছে। বিষয়টি স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতকে তুষ্ট করার দশকপ্রাচীন ঐতিহ্য ভেঙে ফেলতে কোনোই দ্বিধা করেননি। তিনি তার নতুন মন্ত্রিসভায় সুশিক্ষিত, ফোকাসড ও সর্বোপরি ভারতীয় প্রভাবমুক্ত সদস্যদেরই বেশি করে স্থান দিয়েছেন।’
১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তা দেয়ার জের ধরে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ওপর ভারতের জোরালো প্রভাব রয়েছে এবং দেশটি আওয়ামী লীগের সাথে বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ। ভারত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখলেও আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ফ্রন্টে চীন বিশাল প্রেক্ষাপটে আবির্ভূত হওয়ায় দৃশ্যত সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে গেছে দক্ষিণ এশিয়ায়। আঞ্চলিক রাজনীতির খেলায় শেখ হাসিনা চীনের দিকে অধিক ঝুঁকেছেন। ফলে চীনের কৌশলগত মিত্র পাকিস্তানের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়াটাই স্বাভাবিক।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সক্ষমতার অনুক্রমের মধ্যে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য রূপান্তর ঘটেছে। একই সময়ে, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ের এক দারুণ ক্ষেত্রও হয়ে উঠেছে এই অঞ্চল। ভারত ও চীন উভয় শক্তির প্রান্তিক দেশ বাংলাদেশ আর বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে প্রবেশাধিকার রয়েছে দেশটির। বাংলাদেশের এই অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে, ভারত ও চীন উভয় দেশ এই ভূখণ্ডের সাথে ভালো তথা নিয়ন্ত্রক সম্পর্কের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। কিন্তু ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভারতের ওপর এককভাবে নির্ভর করে নির্বাচন জয়ের আয়োজন করতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে ভারতের পাশাপাশি চীনের দ্বারস্থ হতে হয়েছে বহুলাংশে। সহযোগিতা ছিলো রাশিয়ারও। নিরাপত্তা পরিষদে যেকোনো বিপত্তি ঠেকাতে রাশিয়ার পাশাপাশি চীনের সমর্থন ঢাকার অবস্থানকে অনেক জোরালো করতে পারে তাতে সন্দেহ নেই। একই সাথে নির্বাচনের জন্য বিপুল তহবিলেরও প্রয়োজন পড়েছে সরকারি দলের। তহবিল সংগ্রহের জন্য চীনা প্রকল্পের ব্যাপারে সমঝোতা সবচেয়ে বড় সুযোগ এনে দেয়। এই অবকাশ ভারতীয় প্রকল্প বা সরবরাহে কম। ফলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া এবং এরপর আন্তর্জাতিক বৈধতার লবিংয়ের জন্য চীনের সঙ্গে এক গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। অবশ্য গত কয়েক বছর ধরেই আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের পরিবর্তে চীনের সঙ্গে ক্রমশ: ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে ২৪ বিলিয়ন ডলারের চীনা সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এই বিনিয়োগের বিপুল অংশই হলো অবকাঠামো খাতে। চীনা পররাষ্ট্র নীতিতে কৌশলগত বিষয়ের গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে; কিন্তু বেইজিং অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসুবিধা দানের মধ্য দিয়ে কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। এও বলা হচ্ছে যে, চীন থেকে অনেক শিল্প প্রকল্প বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হতে পারে। এতে লাখ লাখ চাকরির ব্যবস্থা এবং সেই সাথে বাংলাদেশের রফতানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও বাড়তে পারে। এসব হলো চীনা সম্পর্কের আশাবাদ। আর এই আশাবাদকে সামনে রেখেই শেখ হাসিনার সরকার চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এর ফলাফল হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্ব বাড়ছে। অপরদিকে ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর পেছনে কাজ করছে বাংলাদেশের নয়া সহযোগী দেশ চীনের প্রভাব।
কুয়ালালামপুরভিত্তিক একটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চিতভাবেই মনে হচ্ছে ভারতের সাথে নাড়ির সম্পর্কটি কেটে গেছে বা কাটা পড়ার পর্যায়ে রয়েছে।’ ‘ভারত এখন দূরে থাকায় নিশ্চিতভাবেই যে প্রতিবেশী সুবিধা পাবে সে হলো শক্তিশালী চীন। বাংলাদেশে বিপুল বিনিয়োগ করায় ভারতীয় প্রভাবের শক্তিকেন্দ্রগুলো বিচ্ছিন্ন রাখতে চীন কার্যকরভাবে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন সফলভাবে পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রতিবেশী থেকে বাংলাদেশকে সরিয়ে এনেছে। সাধারণভাবে যতটুকু মনে করা হয়ে থাকে, চীনা সংশ্লিষ্টতা তার চেয়ে অনেক বেশি।’
দিল্লির সবচেয়ে বড় ভয় হলো বেইজিংয়ের ঋণফাঁদে আটকে ঢাকাকে চীন বিশেষ বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলে কিনা। শ্রীলঙ্কায় এই অবস্থা সৃষ্টির কারণে ভারত প্রভাব খাটিয়ে কলম্বোতে সরকার পরিবর্তন ও নিজস্ব আস্থাভাজনকে সরকারপ্রধান করার পরও চীনা প্রভাব থেকে দেশটিকে বের করে আনতে পারেনি। চীন যেভাবে বাংলাদেশে আগ্রাসী বিনিয়োগ করছে তাতে এই অবস্থা থেকে খুব বেশি সময় না-ও লাগতে পারে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ভাগ্য যেন বাইরের শক্তির টানাপড়েন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্রীড়াক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পাশ্চাত্য তাদের বাজার ও অর্থনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল একটি দেশকে চীন-রাশিয়ার বলয়ে একীভূত হয়ে যেতে দেখে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠলে খেলার এই মাঠে রক্তক্ষয়ী সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে, এমন আশংকা করছেন বিশ্লেষকরা।

(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২০ জানুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত)