ভারতের অর্থনীতি কি স্ট্যাগফ্লেশনের পথে?

মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১, ২০২০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতে গত ডিসেম্বরে খুচরা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশে। গত ছয় বছরের মধ্যে দেশটিতে খুচরা মূল্যস্ফীতির এ হার ছিল সর্বোচ্চ। বলা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে পেঁয়াজসহ সবজির ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধিই এ পরিস্থিতির মূল কারণ। তাছাড়া কয়েক মাস ধরে পতনমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেই বিস্তৃত পরিসরে অব্যাহত রয়েছে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হার। এ অবস্থায় ভারতের অর্থনীতি নতুন সংকটের পথে পা বাড়াচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির কারণে শঙ্কা দেখা দিয়েছে স্ট্যাগফ্লেশনের। আর গত নভেম্বরেই এ বিষয়ে দ্য হিন্দু পত্রিকায় এক লেখায় সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং।

স্ট্যাগফ্লেশন হলো এমন এক অর্থনৈতিক অবস্থা, যেখানে কোনো অর্থনীতি একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ বেকারত্বের চক্রে আটকা পড়ে। ভারতের অর্থনীতিতে বর্তমানে এ তিন সমস্যাই প্রকট হয়ে উঠেছে। ২০১৮ সাল থেকে টানা গত ছয় প্রান্তিকে দেশটির প্রবৃদ্ধি ছিল নিম্নমুখী। এর মধ্যে গত জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে পুরো অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের আশপাশে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অধিকাংশ অর্থনীতিবিদই মনে করছেন, প্রবৃদ্ধির হারে এ ধসের মূলে রয়েছে পণ্য ও সেবা খাতে ভোক্তাদের চাহিদা ঘাটতি। যদিও, এর আগে চাহিদা ঘাটতিকে ভারতের নিম্ন মূল্যস্ফীতির প্রাথমিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওই পরিস্থিতিতে ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধির জন্য রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়াকে (আরবিআই) সুদহার কমাতে উৎসাহিত করেন সরকারের পাশাপাশি বহু অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। কিন্তু সুদহার কমানোর ফলে সরকার ও আরবিআইয়ের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, তাতে পদত্যাগে বাধ্য হন আরবিআইয়ের তৎকালীন গভর্নরসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা। অবশেষে ২০১৯ সালে গভর্নর শক্তিকান্ত দাসের তত্ত্বাবধানে পাঁচবার রেপো রেট কমাতে বাধ্য হয় আরবিআই।

বিশ্লেষকদের আশা ছিল, সুদহার কমানোর ফলে চাহিদা যেমন বাড়বে, তেমনি উজ্জীবিত হবে সামগ্রিক অর্থনীতি। কিন্তু এর বিপরীতে ২০১৯ সালের শেষ ছয় মাসে ভারতে দ্রব্যমূল্য হুহু করে বাড়তে থাকে, উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকে প্রবৃদ্ধির হার। এ পরিস্থিতিতে মনে করা হচ্ছে, ভারতের অর্থনীতি ক্রমেই স্ট্যাগফ্লেশনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে একটি বৈপরীত্যমূলক সম্পর্ক রয়েছে। এ ধারণা প্রথম প্রস্তাব করেন নিউজিল্যান্ডের অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম ফিলিপস। তার নামানুসারে এ ধারণার নামও দেয়া হয় ‘ফিলিপস কার্ভ’। পরবর্তী সময়ে মূলধারার অর্থনীতিবিদরা ধারণাটির স্বীকৃতি দেন।

ফিলিপস কার্ভ অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের বৈপরীত্যমূলক সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিতের পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অনুমান। এ অনুমান বলছে, মূল্যস্ফীতি কোনো অর্থনীতিকে তার পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে সহায়তা করে। এ মূল্যস্ফীতি স্বল্পমেয়াদে হলেও শ্রমিকদের এমন এক অর্থনীতির মধ্যে ফেলে, যেখানে তারা নিম্ন মজুরি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এর ফলে যেমন উচ্চ বেকারত্বের সম্ভাবনা দেখা দেয়, তেমনি সৃষ্টি হয় উৎপাদন ঘাটতি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি একটি নির্দিষ্ট পর্যায় অতিক্রমের পর, নতুন করে আর কর্মসংস্থান কিংবা প্রবৃদ্ধির সুযোগ থাকে না। ফলে বেকারত্বকে দূরে রাখতে নীতিনির্ধারকরা প্রায়ই মূল্যস্ফীতির হার একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখার জন্য পরামর্শ দেন।

যেসব অর্থনীতিবিদ পর্যাপ্ত ভোক্তা চাহিদা না থাকাকে ভারতের অর্থনীতির বর্তমান শ্লথগতির কারণ বলে মনে করছেন, তারা এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো বেশি করে ব্যয় বৃদ্ধির পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু স্ট্যাগফ্লেশনের কারণেই সরকার কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারছে না। তাছাড়া বর্তমানে খুচরা মূল্যস্ফীতির হার আরবিআইয়ের নির্ধারিত ২-৬ শতাংশ সীমা থেকে অনেক বেশি হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার কমিয়ে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার অবস্থায়ও নেই। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্য কোনো উপায়ে বাজারে নতুন অর্থ ছাড়লে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তা আরো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একইভাবে সরকারও যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নে ব্যয়ের ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেয়, তবে সেটাও হবে মূল্যস্ফীতির কারণ।

স্ট্যাগফ্লেশন থেকে উত্তরণের জন্য করণীয় নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতদ্বৈধতা রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, স্ট্যাগফ্লেশন নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে নীতিনির্ধারকদের উচিত সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেয়া। কারণ, আশঙ্কা করা হচ্ছে এ বছর ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হবে। অন্যদিকে স্ট্যাগফ্লেশন থেকে অর্থনীতিকে বাঁচাতে সরকারিভাবে বড় ধরনের অর্থ খরচের কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহ পোষণ করছেন অন্যরা। তাদের মতে, এর মধ্য দিয়ে আসলে স্থায়ী কোনো সমাধান হবে না। এ অবস্থায় সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরবরাহ খাতকে পুনর্গঠনের পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবদরা।

দ্য হিন্দু অবলম্বনে