সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা তুলে দেয়া উচিৎ

শুক্রবার, জানুয়ারি ১০, ২০২০

ঢাকা : সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিতে প্রায় এক যুগ ধরে আন্দোলন চলছে। অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অর্থাৎ সেশন জট, নিয়োগের স্বল্পতা, কোটা ইত্যাদি সমস্যায় যারা জর্জরিত ছিলেন মূলত তাঁরই প্রথমে মাঠে নেমেছিলেন চাকরিতে প্রবেশের পর্যাপ্ত সুযোগের আশায়। এভাবে সময়োপযোগী বিভিন্ন যৌক্তিকতাকে সামনে রেখেই তারা দাবি করেছিলেন চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা কমপক্ষে ৩৫ বছর করার।

বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও বহু আলোচনা হয়েছে আর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কমপক্ষে ৪ বার দাবি বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। সরকারের দায়িত্বশীলদের অনেকেই বিগত বছরগুলোতে বারবার দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলেও আজও আন্দোলনটি সফলতার মুখ দেখেনি। অন্যদিকে নির্দিষ্ট করে বয়সসীমার কথা উল্লেখ না করলেও ক্ষমতাসীন সরকারের গত নির্বাচনী ইশতেহারে মেধা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতাকে বিবেচনায় নিয়ে বয়স বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও রাখা হয়।

বারবার হতাশ হতে হতে আন্দোলনকারীদের বয়সসীমা ৩৫ বছর অতিবাহিত হওয়ার কারণে অনেকেই আজ মাঠে নেই। অন্যদিকে দেশের শিক্ষিত তরুণদের একটা অংশ ধারাবাহিকভাবে এই আন্দোলনটিকে চলমান রেখেছেন।

এই আন্দোলনের পোস্ট মোর্টেম করলে দেখা যায়, এক সময় যারা অনূর্ধ্ব ৩০ বছর ছিলেন তারা ৩০ ঊর্ধ্বদের ৩৫ বছর চাওয়ার দাবিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছেন, বিরোধীতা করেছেন চাকরিতে তাদের সাথে প্রতিযোগী বাড়বে বলে। আবার এই বিরোধীরা যখন ৩০ পার করেছেন তাঁরাই আবার স্বার্থের টানে এই আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন, সক্রিয় হয়েছেন।

এভাবেই বছরের পর বছর পক্ষ-প্রতিপক্ষের সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবেই ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘদিন চলমান রাখা একটা আন্দোলন রাষ্ট্রের জন্য ভালো কোন সংবাদ নয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে চলমান যে কোন আন্দোলন হঠাৎ দানা বেঁধে গর্জে উঠতে পারে রাজনৈতিক দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায়। ফলে যে কোন সময় দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হলে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেয়া আশংকা থেকে যায়। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একেকটা গ্রুপ যদি বয়স বাড়ানোর আশায় বছরের পর বছর মাঠে পড়ে থেকে তাঁদের সুন্দর ভবিষ্যতটাকে হত্যা করে ফেলে, তারুণ্য ধ্বংস করে দেয় তাহলে তাঁদের পরিবারের বা দেশেরই কি হাল হবে! যারা শুরুতে ছিলেন তাঁরাই প্রকৃতপক্ষে উপরোক্ত সমস্যাগুলোয় জর্জরিত, ভুক্তভোগী, দ্বিগুণ হতাশাগ্রস্থ।

সরকার যদি এখন ৩৫ করেও দেয় তাহলেও প্রকৃত ভুক্তভোগীরা উপেক্ষিতই থাকবে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এই বয়সের বাধায় তাঁরা আজও পারেনি বেসরকারি কোথাও প্রবেশ করতে আর পারবেও না। ৩৫ ঊর্ধ্বরা যখন সুযোগ পাবে না তখন তাঁরা আবারও সুযোগের দাবি নিয়ে নতুনভাবে সংগঠিত হয়ে মাঠে নামতে পারে।

চাকরিতে প্রবেশের মাপকাটি বয়স নয় বরং মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে হওয়া উচিৎ। মেধা যুদ্ধের মাধ্যমে যে কেউ যে কোন বয়সে প্রজাতন্ত্রের কর্মে প্রবেশ করতে পারবে এমন যুক্তিসংগত বিধি থাকা উচিৎ নিয়োগ বিধিতে। বিস্বস্থ সূত্রে জানা যায় বয়স প্রত্যাশীরা এখন আর ৩৫ চান না বরং উন্নত দেশগুলোর মত আবেদনের কোন বয়সসীমা থাকবে না এমন দাবি নিয়েই খুব দ্রুত সারাদেশের শিক্ষিত তরুণ চাকরিপ্রার্থীরা সংগঠিত হয়ে মাঠে নামবেন।

তারা চান তাদের কষ্টার্জিত শিক্ষাগত সনদের মেয়াদ আজীবন থাকুক। ইতোমধ্যে তারা চাকরিতে প্রবেশের বয়স অবসরের সমান করণসহ সময়োপযোগী সাতটি দাবির নতুন খসড়া তৈরি করেছেন বলে কেন্দ্রীয় সংগঠন থেকে জানা যায়। শিক্ষিত তরুণ সমাজ যে কোন দেশের উন্নয়নের হাতিয়ার। অথচ তাদেরকেই আমরা বছরের পর বছর কর্মে প্রবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রেখেছি।

বয়সের বাধায় তারা সরকারি বা বেসরকারি কোন ক্ষেত্রেই ৩০ বছরের পরে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে দিনদিন বাড়ছে বেকারত্ব। কয়েক বছর আগেও ইকনোমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক জরিপ বলেছিল, বিশ্বে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সর্বোচ্চ।

তাহলে কিভাবে আমরা উন্নত ও সমৃদ্ধশালী হওয়ার দেশের কল্পনা করি? ভালো বেতন-ভাতা, পেনশন সুবিধা, সামাজিক মর্যাদা ও চাকরির নিশ্চয়তা ইত্যাদি কারণে তরুণদের ঝোঁক বেশী সরকারি চাকরিতেই।

সম্প্রতি ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ যুব জরিপে দেখা যায়, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে ৫৭% নারী এবং ৪২% পুরুষ সরকারি চাকরি করতে চান। দিনদিন আমাদের শিক্ষার হার বাড়ছে যা অবশ্যই আনন্দের। তবে এই আনন্দ পরক্ষণেই ফিকে হয়ে যায় শিক্ষিতদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবলেই।

বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের নিয়মানুযায়ী পেনশন পেতে হলে ২৫ বছর চাকরির বয়স হতে হবে। কেউ যদি চাকরিতে ৩৭ বছর বয়সে প্রবেশ করেন তাহলে অবসরে যাবেন ৬২ বছরে। আজ থেকে ২৫ বছর পরে এ অঞ্চলের গড় আয়ু বেড়ে কমপক্ষে ৮০ বছর হওয়ার কথা। কারণ ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হলে আর্থ-সামাজিক সূচকগুলো যেমন- মাথাপিছু আয়, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তির উন্নতি, প্রবৃদ্ধির হার, ঘরে বসে ইনকাম সবই ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কথা।

তাহলে প্রবেশের বয়সসীমা তুলে দিলে আপত্তি কোথায়? সংবিধান ১৭ বার সংশোধন করতে পারলে সার্ভিস রুলসের এই ধারাও কুরআনের মত অকাট্য দলিল নয় যে চাইলেই কাঁটাছেঁড়া করা যাবে না! উন্নত সকল দেশগুলো এবং আমাদের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশেও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা অবসরের সমান। কারণ তারা তাদের তরুণদের হাত অদৃশ্য প্রৌঢ়ত্বের শিকল দিয়ে না বেধে তাদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর প্রাধান্য দিচ্ছে।

ফলে তারা অর্থনৈতিকভাবেও শক্তিশালী এবং বেকারত্ব সূচকে তারা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। মূলত মানুষের দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বা সুপ্ত প্রতিভা একটু বেশী বয়সেই দৃশ্যমান হয়। তরুণদের সুযোগ না দেয়ার দুর্বল যুক্তি অবশ্যই দূরদৃষ্টিহীন ও স্ববিরোধী। তাই আমরা বাস্তবিক সার্বিক দিক বিবেচনায় সচেতন নাগরিক হিসেবে বলবো, সোনার বাংলা গড়তে হলে ফাঁকা বুলি বাদ দিয়ে তরুণদের সকল দাবি চাকরিতে প্রবেশের সীমা তুলে দিয়ে সকল ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবেই দেশ বেকারত্বের কালিমা থেকে মুক্তি পাবে এবং উন্নত ও সমৃদ্ধশালী হওয়ার পথে এগুবে।

রবিউল ইসলাম ও হুমায়ুন কবির
রাষ্ট্র বিজ্ঞান (৪র্থ সেমিস্টার), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।