গৃহবধূ থেকে রণজয়ী সংগ্রামী রাজনীতিক

শনিবার, জানুয়ারি ৪, ২০২০

ঢাকা: সংগ্রামী স্বাধীনতার পরপরই যখন বিভক্ত ও রক্তাক্ত বাংলাদেশ, তখন দেশের হাল ধরেন মহান মুক্তিযুদ্ধের মহান বীর জিয়াউর রহমান। তাঁর দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্বেই বিশ্বের বুকে হিমালয়ের মতো দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল যুদ্ধে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ। কিন্তু ঠিক তখনই অদৃশ্য যড়ষন্ত্রে শাহাদাৎ বরণ করেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। 

শেষ হলো এক নক্ষত্রের, নেতৃত্ব শূন্য হয়ে গেল গোটা বাংলাদেশ। দেশের আকাশে এ যেন এক কালো মেঘ। জাতিকে তাড়া করছে এক অশনিসংকেত। অকালে স্বামীকে হারিয়ে শোকাহত ও হতভম্ব গৃহবধূ স্ত্রী। ক্ষোপে-অভিমানে অবুঝ দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে দেশছাড়ার সিদ্ধান্ত। কিন্তু জাতি তাকে ছাড়লো না। তাদের একদফা দাবি- নেতৃত্ব শূন্য জাতির হাল ধরতে হবে তাকেই। নেতাকর্মী আর দেশবাসীর প্রবল চাপে শেষপর্যন্ত হাল ধরলেন। শুরু সেই গৃহবধুর সংগ্রামী অজানা গন্তব্য।

তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আজ ৪ জানুয়ারি সেই সংগ্রামের ৩৬ বছর পূর্ণ হয়ে ৩৭ বছরে পদাপর্ণ করলো। ১৯৮১ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া।

সংগ্রাম ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী সেই গৃহবধু আজ দীর্ঘ প্রায় ২ বছর যাবত কারাগারে বন্দি। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পুরান ঢাকার বকশীবাজারের নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবন্দি জীবনযাপন করছেন গৃহবধূ থেকে ৩ বার প্রধানমন্ত্রী হওয়া রণজয়ী রাজনীতিক নারী।

জন্ম ও পরিবার
মহীয়সী এই নারীর জন্ম দিনাজপুরে। ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম গ্রহণ করেন বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় এই নারী প্রধানমন্ত্রী। তার প্রকৃত নাম ছিল খালেদা খানম পুতুল। তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ভাইয়েরা সবার ছোট। তাঁর পিতামহ হাজী সালামত আলী, মাতামহ জলপাইগুড়ির তোয়াবুর রহমান। বাবা ইস্কান্দর মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার।

তাঁর স্বামী বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধান এবং ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীরউত্তম। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে তারেক রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, তিনি এখন সপরিবারে লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। তাঁর কনিষ্ঠ ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালায়া হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।

দিনাজপুরেই বাল্যজীবন ও পড়ালেখা।  খালেদা খানম পুতুল ছিলেন জিয়াউর রহমানের দূর সম্পর্কের খালাতো বোন। জিয়াউর রহমান তখন পাকিস্তান আর্মির ক্যাপ্টেন। বিয়ের সময় জিয়ার পোস্টিং ছিল দিনাজপুরে। ১৯৬০ সালের আগস্টে জিয়ার সাথে বিয়ের পর থেকেই পরিচিত হন বেগম খালেদা জিয়া নামে।

রাজনীতিতে পদার্পণ
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীনও রাজনীতিতে বেগম জিয়ার উপস্থিতি ছিল না। স্বামীর মৃত্যুর আগে রাজনীতিতে আসার কল্পনাও করেননি তিনি। স্বামী, সন্তান আর পরিবার নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন এই গৃহবধূ। কিন্তু বাস্তবতা হল ১৯৮১ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর নেতাকর্মীদের প্রবল চাপে ও আহবানে ঘর ছেড়ে রাজপথকেই ঠিকানা বানাতে হয় তাঁকে। গৃহবধূ থেকে দেশ ও মানুষের মুক্তির জন্য বেছে নেন সংগ্রামী জীবন। এখন তাঁর শরীরে বয়সের ছাপ পড়েছে। তবুও এই মুহূর্তে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্থিতিশীলতার তিনিই একমাত্র প্রতীক।

১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ সামরিক অভুত্থ্যানে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের অনুরোধে-আহবানে তিনি ১৯৮২ সালে ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল এরশাদ বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। বেগম জিয়া এর বিরোধিতা করেন।

১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপাসরন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে পার্টির চেয়ারপারসন নির্বাচনে তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বি নির্বাচিত হন। এরপর তার নেতৃত্বেই মূলতঃ বিএনপির পূর্ণ বিকাশ হয়।


তার নেতৃতেই এরশাদের পতন
এই গৃহবধূর নেতৃত্বেই শুরু হয় স্বৈরাশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলন। বেগম জিয়া প্রথমে বিএনপিকে নিয়ে ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৭ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করেন। এর মাধ্যমে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। একই সময় তার নেতৃত্বে ৭ দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলের সাথে যৌথভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি শুরু করে।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তীব্র আন্দোলনে কোনঠাসা এরশাদ সরকার। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি হয়। ১৫ দল ভেঙে ৮ দল ও ৫ দল হয়। ৮ দল নির্বাচনে যায়। এরপর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, ৫ দলীয় ঐক্যজোট আন্দোলন চালায় এবং নির্বাচন প্রত্যাখান করে।


১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’ এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। এর ফলে এরশাদ সংসদ ভেঙে দেন। পুনরায় শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। অবশেষে দীর্ঘ ৮ বছর একটানা নিরলস ও আপোসহীন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়া মোট ৫টি আসনে অংশ নিয়ে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন।

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার ও ২০০১ সালে জোটগতভাবে নির্বাচন করে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। খালেদা জিয়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) দুবার চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেছেন।


নির্যাচনেও অপ্রতিদ্বন্দ্বী
রাজনীতিতে যেমন সংগ্রামী তেমনি নির্যাচনেও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। খালেদা জিয়া নিজ দলের নেতৃত্বে যেমন দিয়েছেন, তেমনি নির্বাচনের মাঠেও তাঁর সাফল্য শতভাগ। কোনও নির্বাচনেই খালেদা জিয়া কখনোই পরাজিত হননি। বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে ২০১৪ ও ২০১৮ ছাড়া বাকি সবগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনটি সংসদ নির্বাচনে ৫টি করে আসন এবং ২০০৮ সালে ৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতে জয়ী হোন খালেদা জিয়া। সব আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ভোট সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম, তারা কোনও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারেননি।


আপসহীন
সেনাসমর্থিত ওয়ান ইলেভেনের মাধ্যমে ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়াকে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘদিন কারাবাসের পর তিনি আইনি লড়াই করে সবকটি মামলায় জামিন নিয়ে মুক্তিপান। কারাগারে থাকাকালে তাকে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি যেতে অস্বীকার করেন।

এর আগেও তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছেন এবং কারাবন্দি জীবন কাটিয়েছেন, কিন্তু আপস করেননি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হয়ে পরের বছর ১১ সেপ্টেম্বর তিনি হাইকোর্টের আদেশে মুক্তিপান।

বেগম খালেদা জিয়া এখন একটি নামই শুধু নয়-একটি প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মহীয়সী এই মহিলা নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। স্বৈরাচার একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের পক্ষে তিনি বছরের পর বছর লড়াই করেছেন, সংগ্রাম করেছেন-জনগণের কাতারে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি জনগণকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজপথে সংগ্রাম করেছেন। কারাগারে গেছেন। গৃহে অন্তরীণ থেকেছেন।