১৯-এ কি পেল, কি হারালো বিএনপি?

শনিবার, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৯

ঢাকা : দীর্ঘ প্রায় ২ বছর যাবত কারাবন্দি ও অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিতে বহু পর্যবেক্ষণ ও দলীয় সাংসদ সদস্যদের শপথ নাটকে শেষ হলো বিএনপির আরও একটি বছর। দোয়া-মুনাজাত, কালোপতাকা মিছিল, মানববন্ধন ও কয়েকটি সমাবেশে দলটি ইতিমধ্যে অতিবাহিত করলো ১১ মাস ২৮ দিন।

গত ১৬ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার স্বজনরা তাঁর জীবনশঙ্কা নিয়ে কথা বলার পর এখন আন্দোলনের হুঙ্কার দিচ্ছে বিএনপি। যদিও দলটি শীর্ষ নেতাদের দাবি, একবার আন্দোলন করে ব্যর্থ হলে বিএনপির বড় বিপদ হয়ে যাবে তাই এখনো পর্যবেক্ষণে চলছে দল। তবে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার চিন্তায় নীরব থাকলে এর মধ্যেই যদি খালেদা জিয়ার অঘটন ঘটে তাহলে দলটির বর্তমান অবস্থাও থাকবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এদিকে তৃণমূলের আন্দোলনের চাপে বর্তমানে বেকায়দা অবস্থায় রয়েছে দলটি। তবে দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভাষ্য, বিএনপি যদি এখন হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি ঘোষণা করে তাহলে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিক ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তির আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগই বিপদে পড়ে যাবে। তাই বিএনপি উভয় দিক চিন্তা করে আন্দোলনের চিন্তাই করছেন বলে দলটি বিশস্ত সূত্রের দাবি। যেভাবে নানা ঘটনায় ব্যর্থতায়-সফলতায় দলটি পার হলো একটি বছর। পর্যবেক্ষণসহ নীচে তা তুলে ধরা হলো।

কিভাবে খালেদা জিয়া বাঁচবেন? প্রশ্ন স্বজনদের
১৬ ডিসেম্বর বিকেলে বিএসএমএমইউতে চিকিৎসাধীন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাতের পর সেজ বোন সেলিমা ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘উনার (খালেদা জিয়া) শরীর খুবই খারাপ। উঠা-বসা কিছুই করতে পারছে না। খেতে পারছে না, খেলেই বমি হয়ে যাচ্ছে, পেটে ব্যথা হচ্ছে। এতো অসুস্থ মানুষ, এতো বয়স হয়ে গেছে তাঁর। সে তো হাটা চলা করতে পারছে না, বসতে পারছে না।’

খালেদা জিয়ার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তার (খালেদা জিয়া) সুগার তো কন্ট্রোলে আসছে না। ১২ নিচে কোনও দিনই ফাস্টিং সুগার আসে নাই। আজকে তো তার ফাস্টিং সুগার ১৪/১৫। ১২/১৪ ঘণ্টা না খেয়ে আছে তারপরে ফাস্টিং আজকে ১৪/১৫। এই রকম অসুস্থতায় তার উন্নত চিকিৎসা দরকার। আমরা তো বলেছিলাম, উনারা (সরকার) জামিন তো দিলেন না। আমরা কী করব?’

বিএসএমএমইউতে বোনের ঠিক মতো চিকিতসা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন সেলিমা ইসলাম। তাঁর দাবি, ‘উনার পেটে ব্যথা হচ্ছে। ডাক্তার ঔষধ দিচ্ছে না। এখানে ঠিক মতো তার চিকিৎসা হচ্ছে না। এখানে কিভাবে সে বাঁচবে? মনে হচ্ছে না আর তার শরীরে…।’

অনিশ্চয়তায় খালেদা জিয়ার মুক্তি, শেষ আপিলেও খারিজ
শঙ্কা নিয়েও জামিনে মুক্তির আশায় ছিলেন নেতাকর্মীরা। কিন্তু সেই আশাটুকুও শেষ হয়ে যায় গত ১২ ডিসেম্বর। এদিন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের বেঞ্চ আবেদন খারিজ করেন। এরপর থেকেই খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখছে বিএনপি। এখন দলটি আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছেন।

হঠাৎ তৎপর এমপিরা, প্রধানমন্ত্রীকে খালেদা জিয়াকে দেখে যাওয়ার অনুরোধ
কারাবন্দি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে তৎপর হয়ে ওঠে বিএনপির সংসদ সদস্যরা। সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিএনপির সংসদীয় মুখপাত্র হারুন অর রশিদ।

গত ২ অক্টোবর বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) খালেদা জিয়াকে দেখে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে বিএনপি নেতারা । বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারও সাহায্য ছাড়া নড়ানড়া করতে পারেন না বলে দাবি করেন দলটির সংসদ সদস্য জি এম সিরাজ।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলতে চাই, আপনি নিজে একবার হাসপাতালে আসুন। দেশের তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে আপনি দেখে যান। আমরা নিশ্চিত, আপনি যদি খালেদা জিয়াকে দেখেন, তাহলে আপনার মানবিক বোধ জাগ্রত হবে। আপনার মায়া হবে।’

খালেদা জিয়া সুচিকিৎসায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক
কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ৫ মার্চ দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজ কার্যালয়ে এই বৈঠক হয়।

মহাসচিব ছাড়াও আর উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ড. আব্দুল মইন খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠক শেষে বের হয়ে বিএনপি মহাসচিবের ভাষ্য ছিলো এমন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি বিশ্বাস করি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার কথা রাখবেন।’

খালেদা জিয়ার মুক্তিতে প্রথম যে দুটি কর্মসূচি
কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বছরের প্রথম দুটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর মধ্যে ছিলো খালেদা জিয়াসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্যায়ভাবে বন্দি নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিএনপির উদ্যোগে প্রতিবাদ কর্মসূচি ও একই দাবিতে ৯ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী (ঢাকা মহানগর বাদে) প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

হঠাৎ হাইকোর্টের সামনে আন্দোলনের রুপ
হঠাৎ করেই খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ২৬ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা দল ও বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে অঙ্গ-সংগঠনের নেতকার্মীরা হাইকোর্টের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে। এতে পুলিশ বাধা দিলে নেতাকর্মীরা তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ে মারে। এসময় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে। বহুদিন এটিই ছিলো বিএনপির আন্দোলনের বড় দৃশ্য। এ ঘটনায় অনেকের নামে মামলা হয়।

বিএনপি পুনর্গঠনের পক্ষে মত
খালেদা জিয়াকে মুক্তি ও গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনের আগে বিএনপিকে পুনর্গঠন করার পক্ষে মত দিয়েছেন দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা। তারা বলেছেন, বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। নির্বাচনে পরীক্ষিতদের সামনে আনতে হবে। এরপর আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনতে হবে।

১৮ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে জিয়াউর রহমানের ৮৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় দলটির নেতারা এসব কথা বলেন। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হলে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। যারা প্রার্থী ছিলেন, নিজ নিজ এলাকার নেতাকর্মীদের মামলা থেকে পরিত্রাণ ও জেল থেকে মুক্ত করাতে হবে। যেসব এলাকায় আমাদের প্রার্থী ছিল না, সেখানে দলের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করতে হবে। কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। নির্বাচনে পরীক্ষিতদের সামনে আনতে হবে।’

পুনর্গঠনে অর্ধশত ইউনিটে নতুন কমিটি
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আন্দোলনের আগে দলকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয় বিএনপি। আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তৃণমূল থেকেই বিএনপির পুনর্গঠন শুরু করে দেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এতোমধ্যেই সমস্যায় জর্জিত অন্তত ৩০টির বেশি জেলায় নতুন কমিটি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০টির অধিক জেলায় আহবায়ক কমিটি ও ১০টিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হয়েছে।

জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছাড়াও কৃষক দল, মৎস্যজীবী দল, ওলামা দল ও তাঁতী দলের আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। দল সমর্থিত বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনকেও নতুন করে সাজানো হচ্ছে। এর মধ্যে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাবের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছে। এছাড়াও দল, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশনা দিয়েছে বিএনপি হাইকমান্ড।

২৮ বছর পর ভোটে ছাত্রদলের নয়ামুখ খোকন-শ্যামল
আদালতের আচমকা নিষেধাজ্ঞাসহ নানা বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে প্রায় ২৮ বছর পর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত করা হয়েছে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব। সংগঠনের ষষ্ঠ কাউন্সিলে অধিক ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন ফজলুর রহমান খোকন। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন ইকবাল হোসেন শ্যামল। ১৯ সেপ্টেম্বর ভোর ৫টার দিকে ভোট গণনা শেষে এই ফল ঘোষণা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তার শাহজাহানপুরের বাড়িতেই রাতভর ভোটগ্রহণ ও গণনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কৃষক দলের নতুন কমিটি
দীর্ঘ ২০ বছর পর বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের আহয়ায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি বিকালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। নবগঠিত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান দুদুকে আর সদস্য সচিব করা হয় কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন। এ ছাড়া ১২ জন যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ১৩৯ জন সদস্য আছেন এই কমিটিতে।

পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে অঙ্গ-সহযোহী সংগঠনের মধ্যে প্রথম ভোটে নির্ধারিত হয়ে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাব’র নেতৃত্ব। দীর্ঘ ১৮ বছর পর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনে অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ সভাপতি এবং অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুস সালাম মহাসচিব নির্বাচিত হন।

বিদেশ বিষয়ক কমিটি পুনর্গঠন
দলের বিদেশ নীতি বিষয়ক ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি (বিদেশ বিষয়ক কমিটি) ভেঙে দিয়েছে বিএনপি। গত ১৭ জানুয়ারি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে কমিটির সদস্যদের বিষয়টি অবহিত করা হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বিএনপির বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটি নির্দেশক্রমে বিলুপ্ত করা হয়েছে।

পরে ১৫ ফেব্রুয়ারি বিদেশ বিষয়ক কমিটি পুনর্গঠন করে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ২১ সদস্যের এ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

১০ বছর পর আইনজীবী ফোরামের কমিটি
প্রায় ১০ বছর পর জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারকে প্রধান করে ৩১ জানুয়ারি এই কমিটি করা হয়। এরপর ৪ অক্টোবর দলের সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ১৭৯ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন করে বিএনপি। দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনকে আহ্বায়ক ও অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমানকে সদস্য সচিব করা হয়েছে এই কমিটির।

উপজেলা-ইউপি নির্বাচন ও বহিষ্কার
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করার পর বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনও নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দেয় বিএনপি। দলটি কয়েকটি ধাপের উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বর্জন করে। তবে দলীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে এতে অংশ নেন কিছু তৃণমূল নেতারা। ফলে তাদের বহিষ্কারও করে কেন্দ্র। এই তালিকায় স্থান হয় কয়েকশত নেতার।

জোট শরিক অলির ‘জাতীয় মুক্তিমঞ্চ’
নতুন করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ ১৮ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ নামে নতুন সংগঠনের ঘোষণা দেন ২০ দলীয় জোটের শরীক এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব) অলি আহমদ। ২৭ জুন বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। ঘোষণার সময় জামায়াত নেতাদের দেখা না গেলেও জোটের পরবর্তী মিটিংগুলোতে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি দেখা গেছে। ২০ দলীয় জোট থাকতেই অনুমতি ছাড়াই পৃথক জোট করার প্রয়োজনীয়তা ও সংশয় নিয়ে নিয়ে ক্ষুব্ধ ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপি।

স্থায়ী কমিটির সদস্য হলেন টুকু ও সেলিমা
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হান্নান শাহ, এম কে আনোয়ার ও তরিকুল ইসলাম মারা যাওয়ায় কয়েকটি পদ শূন্য হয়। শূন্য পদ পূরণের অংশ হিসেবে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও সেলিমা রহমানকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে। ভাইস-চেয়ারম্যান থেকে তাদের এই পদোন্নতি দেয়া হলো। ১৯ জুন দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর নয়পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

শপথ নিয়ে বিএনপির ইউটার্ন
ব্যাপক কারচুপি ও জালিয়াতের নির্বাচন অ্যাখ্যা দিয়ে একাদশ জাতীয় নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি। প্রথমে তারা সংসদের তাদের নির্বাচিত ৬ এমপির শপথও বর্জন করে। পরে নানা নাটকীয়তায় শপথ গ্রহণের মেয়াদের শেষ দিন ২৯ এপ্রিল হঠাৎ করেই ইউটার্ন নেয় বিএনপি। সব বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ওইদিন বিকেলে দলীয় সিদ্ধান্তেই শপথ নেন বিএনপির মোশাররফ হোসেন (বগুড়া-৪), মো. আমিনুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২), হারুন উর রশিদ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩) এবং উকিল আবদুস সাত্তার (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২)।

তবে বগুড়া-৬ (সদর) আসনে খালেদা জিয়ার পরিবর্তে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার পরও তিনি শপথ নেননি। মির্জা ফখরুল শপথ না নেয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। পরে সেখান থেকে বিএনপির গোলাম মোহাম্মাদ সিরাজ নির্বাচিত হয়ে ১১ জুলাই শপথ নেন।

অবশ্য তাদের মতে, কৌশলগত কারণেই দল ও জোটের নির্বাচিত এমপিরা শপথ নিয়ে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চলমান রয়েছে। দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিএনপির সমর্থন
নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের দেশ অচলের কর্মসূচিতে সমর্থন দেয় বিএনপি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ২০ মার্চ একটি অনুস্থান থেকে বলেন, ‘এই আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি আমরা।’

কূটনীতিকদের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক
কূটনীতিকদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে ঐক্যফ্রন্ট। ২৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের বাসায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গুলশান-২ এর ৩৬ নম্বর রোডের বাসায় অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ভিবিন্ন দেশের কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাচনের ‘অনিয়ম’ নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের গণশুনানি
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ‘অনিয়ম’ নিয়ে গণশুনানি করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এই গণশুনানি করা হয়।

স্কাইপে তারেকের বৈঠক, ট্রাইব্যুনালে মামলা
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে সারা দেশের ৬৪ জেলা থেকে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য মামলা না করার বিষয়ে অবস্থান নিলেও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তা আমলে নেননি।

১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সবগুলো জেলার প্রতিনিধিদের হাইকোর্টে মামলা করতে বলা হয়েছে। ৯ ফেব্রুয়ারি দুই পর্বে প্রায় ৪০টি জেলার প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়। এরপর ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগে এবং নির্বাচিত প্রার্থীর বিজয় চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করে বিএনপির সাতজন প্রার্থী।

কূটনীতিকদের কাছে নির্বাচনের ‘অনিয়ম’ তুলে ধরে ঐক্যফ্রন্ট
বিএনপির তত্বাবধানে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের কাছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট নিয়ে নানা ‘অনিয়ম’তুলে ধরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। তিনি জানিয়েছেন , আরেকটা ‘ভালো’ নির্বাচন দিতে সরকারকে বোঝাতে কূটনীতিকদের অনুরোধ করা হয়েছে। ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে কূটনীতিকদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন এ কথা জানান। গুলশানের একটি হোটেলে বিকাল ৪টা থেকে দেড় ঘণ্টা স্থায়ী এই বৈঠকে ড. কামালের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা অংশ নেন।

প্রার্থীদের ঢাকায় ডাকে বিএনপি
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে অংশ নেয়া দলীয় প্রার্থীদের ঢাকা আসতে নির্দেশ দেয় বিএনপি। ১ জানুয়ারি বিএনপি প্রার্থীদের ৩ জানুয়ারি সকাল ১০টায় গুলশানে দলটির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। দেয়া হয় দলীয় প্রার্থীদের একটি চিঠিও। তাতে ভোটে অনিয়ম কারচুপির প্রমাণ, প্রতিটি কেন্দ্রের অস্বাভাবিক ভোটের হিসাব, গ্রেফতার হওয়া এজেন্ট ও নেতাকর্মীদের তালিকা, সহিংসতায় আহত ও নিহতদের তালিকাসহ ৮টি বিষয়ের তথ্য সম্বলিত একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। ভোট কারচুপির ভিডিও থাকলে তাও প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে বলা হয়।

একজন খোকার বিদায়
গত ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। তাঁকে ঢাকায় আনার পর পুরো ঢাকাবাসী তাঁকে স্মরণ করলো। জানাজায় অংশ নেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।

আরও যাদের হারিয়েছে বিএনপি
ঢাকার গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ এপ্রিল মারা যান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আমিনুল হক। রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক এই মন্ত্রীর নয়াপল্টনে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ এপ্রিল বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক কাজী আসাদুজ্জামান আসাদ মারা যান। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও জিয়া পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান কবীর মুরাদ গত ১৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

১ সেপ্টেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক, মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি, রংপুর মহানগর সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর হোসেন ইন্তেকাল করেন।

এছাড়াও বিএনপিপন্থি বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ (৬৯)। গত বছরের শেষ দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে লিখেন- ‘বেগম খালেদা জিয়া: হার লাইফ হার স্টোরি’।

দল ছাড়লেন যারা
এবছর বিএনপি ত্যাগ করে আলোচনায় আসেন ভাইস-চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান। চট্টগ্রামের এই সাবেক সাংসদ গত ৫ নভেম্বর বিএনপি মহাসচিব বরাবর লোক মারফত পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন তিনি।

এছাড়াও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য আলী আসগর লবি, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-অর্থ বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সহ-সভাপতি মো. সাহাব উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম এবং নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শোকরানা দলত্যাগ করেন।

এব্যাপারে বিএনপি নেতারা বলেন, ‘এখন স্বৈরশাসন চলছে। এ শাসনের অত্যাচার নির্যাতন অনেকে সইতে পারছেন না। সেজন্য অনেকে রাজনীতি থেকে সরে যেতে চাচ্ছেন। অনেকের মামলা আছে সেগুলোর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত। সেজন্য দল ছাড়ছেন। আবার যারা দলে এসে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন, ব্যবসায় সফল হয়েছেন, তাদের অর্থবিত্ত ও ব্যবসা টিকে রাখতে যারা দল ছাড়ছেন, যেতে পারেন, তাতে দলে কোনও প্রভাব পড়বে না। বিএনপি একটি বিশাল সমুদ্রের মতো, এখান থেকে কিছু পানি গড়িয়ে পড়লে দলের ক্ষতি হবে না।’

খালেদা জিয়ার সম্মানে ৩০ টাকার ইফতার
রমজান মাসে কারাবিধি হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ইফতারে বরাদ্দ মাত্র ৩০ টাকা। এই টাকা দিয়ে পাওয়া খাবার দিয়েই প্রতিদিন ইফতার করতে হয় তাকে। দলীয় চেয়ারপারসনের এই কষ্টকর অভিজ্ঞতায় ব্যথিত বিএনপি তার প্রতি সম্মান জানাতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদেরও ২৮ মে সন্ধ্যায় ইস্কাটন লেডিস ক্লাবে ৩০ টাকার সমমূল্যের খাবার দিয়ে ইফতার করান।

গুরুতর অসুস্থ ওবায়দুল কাদেরের পাশে বিএনপি
গুরুতর অসুস্থ মুমূর্ষুধীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে দেখতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) এসেছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ও ড. মঈন খানও সঙ্গে ছিলেন। ১৭ মার্চ রাতে তারা আসলে ভেতরে নিয়ে যান আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া।

অন্তঃপ্রাণ রিজভীর মৃত্যু
বিএনপির অন্তঃপ্রাণ কর্মী রিজভী হাওলাদার ২৩ নভেম্বর রাত ১১টার দিকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচে অসুস্থ হয়ে মারা যান। রিজভী বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে ‘দল-পাগল রিজভী’ নামে পরিচিত ছিলেন। ওইদিন রাতে দলীয় কার্যালয়ের তার জানা হয়। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সব সময় নানান শ্লোগান নিয়ে সাদা কাপনের কাপড়ে দেখা যেতো তাঁকে। তার মৃত্যুতে একটি সমাবেশে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও স্মরণ করেন।