বঞ্চিত ভূমিহীনরা

প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে লাখ লাখ একর খাস জমি

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৯

ঢাকা: প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে দেশের লাখ লাখ একর খাস জমি। বিশেষ করে চরাঞ্চলের জমির ওপর তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের। কারণ, চরের জমির ওপর দিয়ারা জরিপ না হওয়ায় তা থেকে যাচ্ছে হিসাবের বাহিরেই। অপর দিকে জেলায় জেলায়, এমনকি মহানগরীগুলোতে প্রভাবশালীরা খাস জমি ভোগ করছেন বছরের পর বছর ধরে। সব সময় ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এ অপকর্মটি হচ্ছে। অথচ উপকূলীয় জেলার বেড়িবাঁধ ও মহনগরীর বস্তিতে লাখ লাখ ভূমিহীন পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সমাজপতিরা সরকারি জমি দখলে রাখার সঙ্গে ভূমি প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিবিড় সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিষয়টি ভূমি প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিবিড় তদারকির অভাবে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারি স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছেন। ফলে একদিকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ হানি হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ তার ন্যায্য পুনর্বাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জানা যায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৫৮ লাখ ভূমিহীন ব্যক্তি কিংবা পরিবার রয়েছেন। অপর দিকে খাসজমি রয়েছে ২০ লাখ ৭৩ হাজার ৮৮১ একর। তার মধ্যে বন্দোবস্তযোগ্য খাস জমির পরিমাণ ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪৭ একর।

এ বিষয়ে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, খাস জমির তুলনায় ভূমিহীন ব্যক্তি পরিবার অনেক বেশি। যে কারণে সবাইকে ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া কঠিন। তবে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা একই স্থানে একাধিক ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছি। এ প্রকল্প চলমান আছে। তিনি জানান, খাস জমির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ পূর্ণমাত্রায় রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩৭ হাজার ২১৬ জনকে ১৪ হাজার ৩৭৬ দশমিক ১০২ একর, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩২ হাজার ২৭৩ জনকে ১২ হাজার ৮০৬ দশমিক ১৪৮ একর, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩১ হাজার ৪২৫ জনকে ১৮ হাজার ১৭৩ দশমিক ১০০১ একর, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১১ হাজার ৫০৬ জনকে ৫০ হাজার ৭ দশমিক ৩৮৯৮ একর এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ হাজার ২১৩ দশমিক ৫১৯ একর জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বিগত ৫ অর্থবছরে ৯১ হাজার ১৭৩ জন ভূমিহীনকে ৫৭ হাজার ৫৭৬ দশমিক ২৬৩ একর ভূমি বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়েছে। এটি সরকারের বিশাল সাফল্য বলে মনে করছেন মন্ত্রী।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলেন, খাস জমি বন্দোবস্তের নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে; রয়েছে জেলা ও উপজেলা কমিটিও। তা অনুসরণ করে বন্দোবস্ত দেওয়া হচ্ছে। চরাঞ্চলের খাসজমি অনেক সময় সার্ভের বাহিরে থেকে যায়। অনেক সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পরস্পর যোগসাজসে চরের জমি নিয়ে আদালতে ভিত্তিহীন মামলা করেন। এতে বছরের পর বছর ধরে ওই মামলা চলতে থাকে। আর চরের জমি স্থানীয় ভূমি প্রশাসনের সহায়তায় ভোগ করেন ওই সব জনপ্রতিনিধরা। এতে সরকার কিংবা জনসাধারণ কোনোভাবেই উপকৃত হন না।

মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, খাস জমি ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ, উদ্ধার, রক্ষাণাবেক্ষণ এবং তা নিয়ে নতুন করে কিছু ভাবার কাজটি আমলারা করতে পারেন না। সরকারি সিদ্ধান্ত ও সদিচ্ছ না থাকলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কী করতে পারেন। এছাড়া খাস জমি নিয়ন্ত্রণে না থাকায় সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে বলে স্বীকার করেন তারা। এছাড়া প্রতি মাসেই বিভাগীয় কমিশনারদের জবরদখলে থাকা খাস জমি উদ্ধারের জন্য তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এর চেয়ে বেশি কিছু করতে হলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে কৃষি খাস জমির পরিমাণ ২০ লাখ ৭৩ হাজার ৮১১ একর। বন্দোবস্তযোগ্য খাস জমির পরিমাণ ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪৭ একর। অকৃষি খাস জমির পরিমাণ ৩৬ লাখ ৭১ হাজার ৫৫৭ একর এবং বন্দোবস্তযোগ্য অকৃষি খাসজমির পরিমাণ ১০ লাখ ৭৪ হাজার ১২৩ একর। এ বিশাল সরকারি সম্পত্তির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষকে যেমন ভূমিহীন করে রাখা হয়েছে, তেমনি সরকারি সম্পত্তি ভোগের একক সুযোগ পাওয়ায় এক শ্রেণির মানুষ রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার একর অকৃষি খাস জমি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। সরকারি কর্মকর্তাদের যথাযথ ভূমিকার অভাবে মামলায় সরকার হেরে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভূমি প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সরকারের চেয়ে প্রভাবশালীদের স্বার্থ দেখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।