অর্থনৈতিক মন্দায় পড়তে পারে বাংলাদেশ!

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৯

ঢাকা: বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিয়ে নতুন করে এক আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশের অর্থনীতি যে পরিমাণে চাপে রয়েছে তাতে অর্থনৈতিক মন্দায় পড়তে পারে বাংলাদেশ। খেলাপি ঋণ, বাণিজ্য ঘাটতিসহ সম্প্রতি প্রবাসী কেন্দ্রীক বৈদেশিক অর্থনীতি ও পেঁয়াজসহ দ্রব্যমূলের মূল্যবৃদ্ধিও অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

অর্থনীতিদরা বলছেন, ‘দেশে এখন রফতানি ও আমদানি বাণিজ্য দুটোই নিম্নমুখী। এছাড়াও আমাদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম উৎস প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ছাড়া অর্থীতির সব সূচকেই এখন নেতিবাচক। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভও চাপের মুখে। কমছে রাজস্ব আদায়ও। মূল্যস্ফীতি উর্ধ্বমুখী। এছাড়াও কমছে বেসরকারি ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি। ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেয়া বাড়ছে। খেলাপি ঋণের সংখ্যাও বাড়ছে।’

এসব পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ‘এখনই কার্যকরি উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। এখনই সতর্ক না হলে মন্দার কবলে পড়তে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি। তা না হলে দেশের অর্থনীতি আরও চাপের মুখে পড়বে।’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি মোটেও ভালো নয়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়তে যাচ্ছে। ২০০৮ সালেও বিশ্বমন্দা এসেছিল। আমরা সেই সময় বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এ কারণে আমাদের কোনও ক্ষতি হয়নি। একইভাবে এখনও আগাম প্রস্তুতি নিয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে আমরা এবারও মন্দার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবো।’

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কমে যাওয়া মানে হলো বিনিয়োগ কমছে। কমছে উৎপাদন। ফলে আমাদের রফতানিও কমছে। ব্যাংকখাতের অবস্থা খুবই খারাপ। খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছে। বিনিয়োগ হচ্ছে না। কাঁচামালের আমদানি কমে গেছে। বেকারত্ব বাড়ছে।’

তবে ব্যাংকিং খাতের এই নাজুক অবস্থা অর্থনীতির স্বাস্থ্যকে ‘দুর্বল’ থেকে ‘দুর্বলতর’ করছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

সরকারি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান-বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘যদি আমাদের শিল্প উৎপাদন বাড়তো, তাহলে তো ভ্যাট বাড়তো। আমাদের রাজস্ব আয় হতাশাব্যঞ্জক। আয়কর খাত থেকেও রাজস্ব বাড়ছে না। সরকার ঋণ করছে। সেই টাকায় যদি শুধু বেতন দেয়া হয় তাহলে তো পরিস্থিতি খারাপ। বড় বড় ঋণ খেলপি ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। আটকে যাচ্ছে মাঝারি এবং ছোট আকারের খেলাপিরা। আমার কথা হলো তাদের সুযোগ দিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখুন, বড়দের ধরুন। তারা আসলে লুটপাটের সাথে জড়িত।’

সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা ব্যাংক খাতে। বাংলাদশের ব্যাংখ খাত নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ একটি রিপোর্ট দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার প্রবণতার শিকড় অত্যন্ত গভীরে। প্রভাবশালী, ওপর মহলে ভালো যোগাযোগ আছে এবং ধনী, এমন কিছু ব্যবসায়ী ঋণ ফেরত দেওয়ার কোনো তাগিদই অনুভব করেন না। এমনকি বাংলাদেশে আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও এখন নিচ্ছেন প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান এসব ঋণগ্রাহকেরা।

গত সেপ্টেম্বর মাস শেষে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ের (২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত) কোনও একক মাসে এত কম প্রবৃদ্ধি ছিল না। এমনকি সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক আমলেও (২০০৮) বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল এখনকার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা, যা মোট তিরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এখন পর্যন্ত ৬৭৫ জন ঋণগ্রহীতা আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে রেখেছেন। ফলে ঋণ খেলাপি হিসেবে তাদের নাম বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোতে (সিআইবি) উল্লেখ করা হয় না। এ রকম ঋণের পরিমাণ এখন ৭৯ হাজার ২৪২ কোটি টাকা।

মন্দার আশঙ্কার অন্যতম কারণ রফতানি কমে যাওয়া। গত অক্টোবরে ৩০৭ কোটি ৩২ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ, অথচ ২০১৮ সালের একই বছরে রফতানি আয় ১৭ দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি ছিল। এছাড়াও গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং সাড়ে ১১ শতাংশ রফতানি আয় কমে যায়। এই পরিস্থিতিকেও খুবই খারাপ বলে মন্তব্য করেন অর্থনীতিবিদরা।

গত জুলাই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৯৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আগস্ট শেষে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৯ কোটি ডলার। আর সেপ্টেম্বর শেষে এটি দাঁড়িয়েছে ৩৭১ কোটি ৭০ লাখ ডলারে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে রাজস্ব আদায় বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় কম ১৭ শতাংশের মতো। অর্থাৎ গত অর্থবছরের মতো চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতির দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

পুঁজিবাজারের অবস্থা আরও করুণ। মূল্যসূচক কমছোই। লেনদেন নেমে এসেছে তলানিতে। ২০১০ সালের ধসের পর নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও বাজার স্বাভাবিক হচ্ছে না। উল্টো দিন যতো যাচ্ছে পরিস্থিতি ততোই খরাপের দিকে যাচ্ছে।

তবে আশার আলোস জাগিয়ে রেখেছে প্রবাসী রেমিটেন্স। এখনও রেমিটেন্সে ইতিবাচক ধরা ধরে রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ। সেপ্টেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাসী আয় বেড়েছে ২৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অক্টোবর মাসে ১৬৪ কোটি ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।