বিমানে ভয়াবহ টিকিট দুর্নীতি: বিচারের মুখোমুখি মূল হোতা আশরাফুল

রবিবার, নভেম্বর ২৪, ২০১৯

ঢাকা: অবশেষে বহিষ্কার হলেন বিমানের সেই চাঞ্চল্যকর টিকিট কেলেঙ্কারির হোতা পরিচালক মার্কেটিং আশরাফুল আলম। তদন্তে ভয়াবহ সব অনিয়ম-দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিভাগীয় মামলা করে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে রোববার। এ তালিকায় আরও কয়েকজন রাঘববোয়ালও ফেঁসে যেতে পারেন।

সূত্রগুলো সেরকম আভাস দিয়েছে। এখন পর্যন্ত তদন্তে যেসব দুর্নীতি ও ক্ষমতা অপব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে তাতে শুধু চাকরিচ্যুতির মধ্য দিয়েই এর পরিসমাপ্তি ঘটবে না, নির্ঘাত ফৌজদারি মামলাও হবে।
এদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, বিমানে দুর্নীতিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও পরামর্শে শক্ত হাতে পরিচালিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সাহস না জোগালে এ দুর্বৃত্ত চক্রের বিরুদ্ধে সফল হওয়া কঠিন ছিল। তবে যে কোনো মূল্যে প্রধানমন্ত্রী বিমানের সব স্তরের দুর্নীতি উপড়ে ফেলতে চান। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের পতাকাবাহী বিমান দুর্নাম ঘুঁচিয়ে সুনাম অর্জনের সারথি হওয়ার কাতারে শামিল হতে পেরেছে। এরফলে ৬ মাসের ব্যবধানে বিমান ৪৬০ কোটি টাকার অভাবনীয় লাভের মুখ দেখতে সক্ষম হয়েছে।

বিমানের এমডি মোকাব্বির হোসেন বুধবার রাতে বলেন, আশরাফুল আলমের বিষয়ে তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করাসহ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রজু করা হয়েছে।

বিভাগীয় মামলায় যা বলা হয়েছে : বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সাব-কমিটি কর্তৃক গঠিত তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এতে বলা হয়, সাবেক পরিচালক মার্কেটিং আশরাফুল আলম একটি সিন্ডিকেট গঠন করে বিমানের টিকিট ব্লক করে কালোবাজারে বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পকেটস্থ করেছেন। তিনি একই সঙ্গে একাধিক পদে অবৈধভাবে দায়িত্ব পালন করলেও ১৯ মার্চ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় জিজ্ঞাসাবাদে অসত্যের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দাফতরিক রীতি না মেনে এবং অব্যাহতিপত্র জমা না দিয়েও এমনকি কাউকে দায়িত্ব হস্তান্তর না করে জিএম সেলস ও জিএম মার্কেটিং পদে যোগদান করেন। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বিপণন ও বিক্রয় বিভাগের পরিচালকের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বসহ এক সঙ্গে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ পদের মাধ্যমে সর্বময় ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। এভাবে তিনি নিজের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সামান্য কিছু টিকিট অনলাইনে সচল রেখে বাকি টিকিট ব্লক করে রাখতেন। এ কারণে অনেক সময় বহু সিট খালি রেখে বিমান যাত্রা করত। প্রতিদিন বিমানের বিভিন্ন ফ্লাইটে প্রায় ৮ হাজার টিকিট থাকে। আশরাফুলের নেতৃত্বে চক্রটি টার্গেট অনুযায়ী সর্বনিম্ন দামের কয়েকশ’ টিকিট ব্লক করে রাখে। যেগুলো বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে বেশি মূল্যে বিক্রি করে। এভাবে তারা প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পকেটস্থ করে।

আরও বলা হয়, এ সিন্ডিকেট যোগসাজশ এবং অসম চুক্তির ফায়দা নিয়ে অ্যামাডিউস, অ্যাবাকাস, গ্যালিলিও ও সাবরি নামের ৪টি জিডিএস কোম্পানির মাধ্যমে বছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এদের সঙ্গে ছিল বিমানেরই তালিকাভুক্ত তিন শতাধিক ট্রাভেল এজেন্ট। এ টাকারও ভাগ পেয়েছে আশরাফুল সিন্ডিকেট।

২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শুধু ১০ মাসে টিকিট বুকিং বাতিলের জন্য ৪টি জিডিএসকে অবৈধভাবে ৯৩ কোটি ৯৩ লাখ ৯ হাজার ৮৮৮ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। যার বেশির ভাগ বুকিং ছিল ভুয়া ও উদ্দেশ্যমূলক। বিমানের রেভিনিউ ইন্ট্রিগ্রিটি শাখার মাধ্যমে টিকিট বুকিং, ব্লক, ডুপ্লিকেট বুকিং মনিটরিং করার কথা। কিন্তু বাস্তবে কখনোই এ কার্যক্রম সমন্বিতভাবে করা হয়নি। টিকিট বুকিং দেয়ার জন্য জিডিএস কোম্পানির সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, তা বিমানের স্বার্থবিরোধী। ৩০০ আসনের একটি ফ্লাইটের ২ থেকে ৩ হাজার টিকিট বুকিং রহস্যজনক। বেশির ভাগ বুকিং ভুয়া। যে কারণে এসব বুকিং বাতিলও হয়ে যায়।

প্রতিটি বুকিং ও বাতিলের জন্য জিডিএস কোম্পানিকে বিল গুনতে হয় বিমানকে। শুধু জিডিএসের বিল বাড়াতে কিছু ট্রাভেল এজেন্সি প্রচুর টিকিট বুকিং দেয়, আবার তা বাতিলও করে। যার বিনিময়ে ওইসব এজেন্সি জিডিএস কোম্পানির কাছ থেকে কমিশন পায়।

এছাড়া অনলাইনে টিকিট বিক্রির জন্য বিমান ২০১৩ সালে ‘জেপ ওয়েস’ নামে একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু তাদের সফটওয়্যারের মাধ্যমে মাত্র ৫ শতাংশ টিকিটি বিক্রি করা হয়। অথচ এ সামান্য টিকিট বিক্রির জন্য প্রতি মাসে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ২৭ হাজার মার্কিন ডলার পরিশোধ করতেন আশরাফুল আলম। এছাড়া তাদের সফটওয়্যার আপডেট বাবদ এ পর্যন্ত ১২ লাখ ২০ হাজার ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। তাদের সফটওয়্যারের মাধ্যমে শুধু ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করা যায়। এছাড়া বিক্রি করা টিকিট পরিবর্তন কিংবা তারিখ সংশোধন করা যায় না। তাদের অদক্ষতার কারণে এসআইটিএর মাধ্যমে কিছুদিন টিকিট বিক্রি করা হয়। ফলে বিমানের ৬-৭ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। জেপ ওয়েস থেকে যাত্রীদের খুদে বার্তা দেয়ার কথা থাকলেও তারা দেয় না। কিন্তু এজন্য প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা পায়। চুক্তিবদ্ধ এ কোম্পানির কাছে বিমানের এ যাবৎকালের সব ডাটা সংরক্ষিত আছে। কিন্তু এসব তথ্য পেতে হলে তাদের ৫০ হাজার ডলার দিতে হয়। অনুসন্ধান টিম মনে করে, ইচ্ছাকৃতভাবে অসম চুক্তি করায় এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।

এছাড়া আশরাফুল আলম কিছু সংখ্যক ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূত টিকিট বুকিং দিয়ে অর্থ ভাগাভাগি করতেন। মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগের মাধ্যমে অযাচিতভাবে টিকিট ব্লক করে রাখতেন। কিছু কর্মচারী তাদের কাছে থাকা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে বিমানের লন্ডন ও মধ্যপ্রাচ্যের ফ্লাইটগুলোয় সিট ব্লক করতেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটে ২৫ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব টিকিট ব্লক করে সাদিয়া ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে বিক্রি করা হয়। এছাড়া রয়েল, স্টার, ভার্সেটাইল, ভিক্টোরি নামে কতিপয় ট্রাভেল এজেন্সিও বিমানের টিকিট নিয়ে এ অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ৩০০ আসনের একটি ফ্লাইটে ২ থেকে ৩ হাজার বুকিংও হয় অনেক সময়। যার অধিকাংশ বুকিং বাতিল হয় বা যাত্রী যাত্রার তারিখ বদল করেন। প্রতিটি বুকিং ও বাতিলের জন্য জিডিএস কোম্পানিকে একটি মাশুল দিতে হয় বিমানকে। সম্প্রতি এক মাসে জিডিএস কোম্পানির বিল ছিল ১৪ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা)। কিন্তু বুকিং বাতিল করে এ বিল ২২ লাখ ডলারও হয়েছে কোনো কোনো মাসে। অভিযোগ আছে, শুধু জিডিএসের বিল বাড়াতে কিছু ট্রাভেল এজেন্সি প্রচুর টিকিট বুকিং দিয়ে ফের বাতিল করে দেয়। যার বিনিময়ে ওইসব এজেন্সি জিডিএস কোম্পানি থেকে কমিশন পায়।

বিমানে টিকিটিং দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র প্রথমে বেরিয়ে আসে বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হকের নিজস্ব অনুসন্ধানে। তিনি তার একটি চৌকস টিম দিয়ে গোপনে অনুসন্ধানের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হন। এরপর বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়কে অবহিত করা হয়। সেখান থেকে কাউকে ছাড় না দেয়ার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা পেয়ে দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়। মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে বিমান বোর্ড ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির পক্ষ থেকে সম্প্রতি বিশদ তথ্য জমা দেয়।

লাভের পথে বিমান : ৬ মাসের তুলনামূলক ব্যবধানে বিমান লাভ করেছে ৪৬০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের মে থেকে নভেম্বরে বিমানের যা লাভ হয়, তার চেয়ে চলতি বছরের একই সময়ে বিমান উল্লিখিত লভ্যাংশ অর্জন করে।যুগান্তর