কসবা ট্রেন দুর্ঘটনা চালকের দোষে

বুধবার, নভেম্বর ২০, ২০১৯

ঢাকা : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় দুই ট্রেনের মধ্যে সংঘর্ষে ১৭ জনের প্রাণহানির ঘটনায় তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস ট্রেনের চালক ও তার সহযোগীদের দোষ পেয়েছে রেলওয়ের তিনটি তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদন তুলে ধরতে বুধবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন এতথ্য জানান।

রেলমন্ত্রী বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ট্রেন দুর্ঘটনায় মোট পাঁচটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এসব প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তঃনগর ৭৪১ নম্বর তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস ট্রেনের লোকোমাস্টার, সহকারী লোকোমাস্টার ও গার্ড সিগন্যালগুলো যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ না করে ট্রেন পরিচালনা করেন। এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটে।

তিনি আরও বলেন, সিগন্যাল অমান্য করায় সংঘটিত এ দুর্ঘটনার জন্য কমিটিগুলো তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস ট্রেনের লোকোমাস্টার তাছের উদ্দিন, সহকারী লোকোমাস্টার অপু দে ও গার্ড মো. আব্দুর রহমানকে দায়ী করেছে।

ওই তিনজনের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে আমরা তাদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছি। আমরা এখন রিপোর্ট পেয়েছি, এখন তাদের প্রশাসনিকভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেব। এরপর প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি হবে। তাদের শোকজ করা হবে। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা তাদের বিচার করে প্রশাসনিক শাস্তির ব্যবস্থা করব। এখানে গুরুদণ্ড আছে, লঘুদণ্ড আছে, ছোটদণ্ডও আছে। প্রশাসনিকভাবে এ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে মোট পাঁচটি সুপারিশ করেছে তিন তদন্ত কমিটি। এগুলো হলো-

১. লোকো মাস্টার, সহকারী লোকো মাস্টারের কার্যক্রম তদারকি করার জন্য সিসি ক্যামেরা স্থাপন ২. ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া

৩. ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মচারীদের শূন্যপদ পূরণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া

৪. ট্রেনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় ‘ক্লোজড ইউজার গ্রুপের’ মোবাইল ফোন বা আধুনিক অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা

৫. বাংলাদেশ রেলওয়েতে এটিএস (অটোমেটিক ট্রেন স্টপ) সিস্টেম প্রবর্তন

এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন রেলমন্ত্রী।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের মন্দবাগ স্টেশনের আউটার ক্রসিংয়ে ১২ নভেম্বর রাত পৌনে ৩টার দিকে আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ও আন্তঃনগর তূর্ণা নিশীথার মধ্যে সংঘর্ষে ১৭ জনের প্রাণ যায়, আহত হন অর্ধশতাধিক।

মন্ত্রী বলেন, তিনি বলেন, ‘আমরা কুয়শার শঙ্কা করছিলাম কিন্তু তদন্ত রিপোর্টে সেটা আসেনি। ট্রেনের যাত্রী ও স্টেশন মাস্টার বলছেন, কুয়াশা ছিল না। তারা (লোকোমাস্টার, সহকারী লোকোমাস্টার ও গার্ড) যে অজুহাতগুলো দেখিয়েছিল সেগুলো ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট বলছে, তাদের অবহেলার কারণে এ দুর্ঘটনা হয়েছে। জরুরি ব্রেক করলে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই একটা ট্রেন থামানো সম্ভব। কিন্তু তারা সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

উনারা কি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন- এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তদন্তে ঘুমিয়ে পড়ার কোনো প্রমাণ পায়নি। কারণ ট্রেনটি ৭০ কিলোমিটার বেগে চলছিল। কিন্তু ট্রেনটি যখন ধাক্কা মারে তখন তার গতি ছিল ২৫ কিলোমিটার।’

অপর এক রেলের মহাপরিচালক বলেন, ‘সার্বিকভাবে লোকোমাস্টার সংখ্যা কম রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে লোকোমাস্টারের অভিজ্ঞতা কম ছিল না। আমি ব্যক্তিগতভাবেও খোঁজ নিয়েছি, তার নেশাজাতীয় তেমন কোনো খারাপ অভ্যাসও ছিল না।’

মন্ত্রী বলেন, ‘যদি এখানে দুটা লাইন হতো তাহলে এ দুর্ঘটনা হতো না। কিন্তু আমরা লাইনগুলো ডাবল করতে পারিনি।’

ব্রিটিশ আমলের আইন অনুযায়ী একজন লোকোমাস্টার রেল অ্যাক্সিডেন্ট করলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাকরি থেকে অব্যাহতি, তারপরও এক্ষেত্রে আইনটি প্রয়োগ করে একজনকেও শাস্তি দেয়া হয়নি। এখন সড়ক আইন সংস্কার হয়েছে, আপনারা কি আইনটির সংস্কার করবেন- এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, আইন সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমান আইনেও অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

এক্ষেত্রে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেয়া হবে কি-না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করার সুযোগ নেই। এটা তার চাকরি, অবহেলার দায়ে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে।’

সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী আরও বলেন, আপনারা জানেন, গত সোমবার (১১ নভেম্বর) দিবাগত রাত ৩টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনের লুপলাইনের মুখে সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেন এবং চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেসের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আমরা আগে জানিয়েছিলাম, এ ঘটনায় ১৬ জন নিহত হয়েছে। কিন্তু একজনের নাম দুবার চলে এসেছিল। আসলে তখন নিহত হয়েছিল ১৫ জন। এরপর আরও দুজন মারা যায়। ফলে এ ঘটনায় সর্বমোট ১৭ জন নিহত হন।