হাসপাতালের টেবিল ক্রয় ২২০০ টাকায়, ভাউচার ২৫০০০ টাকার

বুধবার, নভেম্বর ১৩, ২০১৯

দিনাজপুর : দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টেবিল কেনায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি টেবিল দুই হাজার ২০০ টাকা দরে কেনা হলেও বিল ভাউচারে ২৫ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। একইসঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ডেঙ্গুর কিট ক্রয় এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ বরাদ্দকৃত অর্থসহ অন্যান্য খাতে ব্যয়ের জন্য সাত লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের পাঁচটি ছোট টেবিল, চারটি পাদানি ও একটি বড় টেবিল কেনার জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে প্রতিটি টেবিল ২৫ হাজার টাকা এবং একটি সেক্রেটারি টেবিল ৭৫ হাজার টাকায় কেনার হিসাব দেখিয়ে হাকিমপুর উপজেলার মেসার্স বিদ্যুৎ ট্রেডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভাউচার জমা দিয়ে দুই লাখ টাকা তুলে নেন ডা. খায়রুল ইসলাম।

বিলে দেখানো ফার্নিচার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনও ধরনের আসবাবপত্র সরবরাহ করেননি। তবে হাসপাতালের সামনের বেলাল ফার্নিচারের স্বত্বাধিকারী বেলাল হোসেন জানান, নবাবগঞ্জ উপজেলা ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম এ বছরের ১৯ অক্টোবর মেহগনি কাঠের ৩ ফুট ৮ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, ২ ফুট ৫ ইঞ্চি প্রস্থ এবং ২ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার ৫টি টেবিল আমার কাছ থেকে কিনেছেন। প্রতিটি টেবিলের মূল্য নিয়েছি দুই হাজার ২০০ টাকা করে এবং প্রতিটি পাদানির মূল্য ছিল এক হাজার ২০০ টাকা।

এদিকে সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিলে অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুই লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও ডেঙ্গুর কিট ও চিকিৎসাসামগ্রী কিনতে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ পায়।

জমা দেওয়া বিল ও ভাউচারে দুই লাখ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ৩০ হাজার টাকা ভ্যাট এবং ৪ হাজার টাকা আয়কর জমা দিয়ে ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালের ভাউচারে ১ সেপ্টেম্বর ২৪ হাজার ৭৮০ টাকার ৮৪ প্যাকেট, ৪ সেপ্টেম্বর ২৪ হাজার ৭৮০ টাকার ৮৪ প্যাকেট, ৫ সেপ্টেম্বর একই মূল্যের ৮৪ প্যাকেট ডেঙ্গু কিট কেনার হিসাব দেখানো হয়।

এছাড়া আরও ৬টি ভাউচারে অন্যান্য ওষুধ ক্রয় দেখিয়ে এক লাখ ৬৬ হাজার টাকার বিল ভাউচার জমা দিয়ে টাকা উত্তোলন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. খায়রুল ইসলাম।

ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালের স্থানীয় বিপণন কর্মকর্তা গৌরাঙ্গ রায় জানান, আমাদের কোম্পানির কোনও ডেঙ্গু কিট নেই বা উৎপাদন করে না। তাই আমাদের কোম্পানির ডেঙ্গুর কিট সরবরাহের কোনও প্রশ্নই আসে না। তিনি নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুটি ভাউচারে ৯৭ হাজার টাকার নাপা জাতীয় বড়ি এবং স্যালাইন সরবরাহ করেছিলেন। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিল উত্তোলনের প্রয়োজনের কথা বলে আরও অতিরিক্ত সাতটি ফাঁকা ভাউচারে আমার থেকে স্বাক্ষর নিয়েছিলেন।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নবাবগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচ দফায় হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ মোট ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ আসে। এরমধ্যে, ৭৮ হাজার টাকা ভ্যাট এবং ১০ হাজার ৪০০ টাকা আয়কর প্রদান করা হয়। হাসপাতাল পরিষ্কার ও কাপড় ধোয়ার জন্য ঠিকাদারের বিল দেওয়া হয় ৬৮ হাজার টাকা। ডেঙ্গুর প্রকোপের সময় আগস্ট মাসে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ১৮ হাজার টাকা এবং একটি ট্যাংক পরিষ্কার বাবদ দেওয়া হয় ৩ হাজার টাকা। এছাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় থেকে শ্রমিক দিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। এ খাতে আর কোনও খরচ হয়নি।

তবে ডা. খায়রুল ইসলাম ভুয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে বরাদ্দের চার লাখ ৩১ হাজার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন।

নবাবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. রেফাউল আজম জানান, উপজেলা পরিষদ, থানা এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিষ্কারে একটি প্রকল্প ছিল। সেই প্রকল্পের আওতায় ৪০ দিনের কর্মসূচির শ্রমিক দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছিল।

এছাড়া জমা দেওয়া বিল ভাউচারে দেখা গেছে গত ৫ আগস্ট উপজেলার আফতাবগঞ্জ, ভাদুরিয়া এবং দাউদপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ প্রতিটিতে ১৫ হাজার করে টাকা বরাদ্দ দেন ডা. খায়রুল ইসলাম।

তবে উপজেলার আফতাবগঞ্জ উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার তোজাম্মেল হক, দাউদপুরের দিলবার হোসেন এবং আফতাবগঞ্জের শ্রী প্রাণনাথ তরফদার জানান, তাদের কাউকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ কোনও টাকা দেননি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. খায়রুল ইসলাম।

এদিকে ৭ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি ক্রয়ের জন্য ৭২ হাজার টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়। ডা. খায়রুল ইসলাম পাশের বিরামপুর উপজলার রুবিনা ফার্মেসি অ্যান্ড মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের তিনটি ভাউচারে ১২০টি বিপি মেশিন ক্রয় দেখিয়ে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করে নেন।

সরেজমিন ঘুরে বিরামপুরের রুবিনা ফার্মেসি অ্যান্ড মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট নামের কোনও প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এ বছরের ২১ মে অধিদফতর থেকে সাব সেন্টার ও উপজেলার রোগীদের জন্য ওষুধ কিনতে এক লাখ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ আসে। ডা. খায়রুল ইসলাম উপজেলার তিনটি সাব সেন্টার এবং তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রতিটির অনুকূলে ২৪ হাজার ৯৪৫ টাকা ওষুধ ক্রয়ের ভাউচার জমা দিয়ে বরাদ্দের অর্থ তুলে নেন।

তবে আফতাবগঞ্জ উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার মো. তোজাম্মেল হক, দাউদপুরের দিলবার হোসেন জানান, তাদের কোনও ওষুধ দেওয়া হয়নি। সাদা কাগজে ওষুধ বুঝে পাওয়ার স্বাক্ষর দিতে চাপ দেন ডা. খায়রুল। কিন্তু তারা সাদা কাগজে স্বাক্ষর দেননি।

অন্যদিকে মালারপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার বুলবুল আহম্মেদ, কাঁচদহ কমিউনিটি ক্লিনিকের সাইফুল আলম এবং কচুয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কামরুজ্জামান জানান, তাদের কোনও ওষুধ দেওয়া হয়নি। নগদ ১০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. খায়রুল ইসলামের পরামর্শে তারা প্রত্যেকে ২৪ হাজার ৯৯৫ টাকার ভুয়া বিল ভাউচার জমা দিতে বাধ্য হয়েছেন।

এদিকে ডা. খায়রুল ইসলাম নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন গতবছরের ৪ সেপ্টেম্বর। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে তিনি হাসপাতালের কোয়ার্টারের একটি বাসায় বসবাস করছেন। তার ঘরে লাগানো রয়েছে একটি এসি। বিধি অনুযায়ী তাকে বাড়ি ভাড়া বাবদ ১৩ হাজার ৮০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা। তবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে তিনি এ বছর সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুধুমাত্র একটি সিটের ভাড়া বাবদ মাত্র এক হাজার ৩৮০ টাকা জমা দিচ্ছেন।

নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র নার্স নিগার সুলতানা, ফিরোজা বেগমসহ কয়েকজন অভিযোগ করেন, ডা. খায়রুল ইসলাম হাসপাতালে যোগদানের পর থেকেই নার্সদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন। সিনিয়র নার্সদের তাচ্ছিল্য করে ‘ওল্ড এজেজ’ বলে মন্তব্য করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেন, ডা. খায়রুল ইসলামের অনিয়ম-দুর্নীতিতে সায় না দিলে তিনি বিভিন্নভাবে হুমকি দেন।

নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত স্টোর কিপার নূরে আলম সিদ্দিক এবং মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট মাহমুদ শরীফ অভিযোগ করেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. খায়রুল ইসলাম ডেঙ্গুর কিট, বিপি মেশিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জমা দেননি। চাকরির ভয় দেখিয়ে জোর করে তাদের কাছ থেকে স্টক লেজারে জমা দেখিয়ে স্বাক্ষর নিয়েছেন তিনি।

নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. খায়রুল ইসলাম জানান, আমি কর্মস্থলে একেবারেই নতুন, মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষকতা পেশা থেকে এখানে এসেছি। আমি কখনও কোনও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করিনি, যার কারণে এ বিষয়ে পূর্বের কোনও অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। এ কারণেই আমি যা কিছু করেছি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস সহকারী সমর কুমার দেবের পরামর্শে করেছি।

এসময় ডেঙ্গুর কিট এবং সেক্রেটারি টেবিল দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। পাশাপাশি দুই হাজার ২০০ টাকার টেবিল কিনে ২৫ হাজার টাকার ভুয়া ভাউচার দাখিলের কোনও সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।

তবে সংসদ সদস্য, ইউএনওকে কটূক্তির কথা স্বীকার করে তিনি জানান, এ ঘটনায় তিনি তাদের কাছে ক্ষমা

নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস সহকারী সমর কুমার দেব জানান, তিনি কখনও অবৈধ কোনও কাজের পরামর্শ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে দেননি। বরং তাকে অবৈধ কাজ করতে চাপ দিতেন ডা. খায়রুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ডা. খায়রুল আমাকে বলেছিলেন বিল তৈরি করে জমা দিলে বিল ক্যাশ হবে। তখন ওষুধ কেনা যাবে, তারপর ওষুধ বিলি করবো। পরে বিল ক্যাশ হলে তিনি ওষুধ কিনেছেন কিনা এটি আমার জানা নেই।

অভিযোগের বিষয়ে দিনাজপুরের সিভিল সার্জন ড. আব্দুল কুদ্দুস জানান, নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. খায়রুলের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত কমিটি করা হবে। তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।