পরিবেশ বিনাশী ইট-ভাটা নিয়ন্ত্রণ করুন

শনিবার, নভেম্বর ৯, ২০১৯

গড়ে উঠছে ইট-ভাটা। এর মূলে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিবর্গের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা। ব্যবসায়িক মনোভাবের কারণেই যে এলাকাতে যতটা ইট ভাটার প্রয়োজন নিয়ম ভেঙে তার চেয়েও অনেক বেশি ইট- ভাটা গড়ে উঠেছে। ফলে কৃষি জমি, পরিবেশ ও জীব-জগত্ রয়েছে রীতিমত হুমকির মুখে। ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল বা উপাদান হচ্ছে মাটি। ইট ভাটার মালিকগুলো একে-অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জলের দামে মাটি কিনছেন নিকটস্থ এলাকার জমির মালিকগুলোর কাছ থেকে। আর সামান্য টাকার লোভে জমির মালিকরা না বুঝে কমপক্ষে চার/পাঁচ ফুট গভীরতায় মাটি বিক্রি করে একেকটা কৃষি জমিকে নিচু ভূমিতে পরিণত করে ফেলেছেন। অথচ এটা রীতিমত আইনের পরিপন্থি। প্রায় সারাবছর পানি লেগে থাকার কারণে আগের মত দুই-তিন ফসলের পরিবর্তে এখন ঐসব জমিতে এক ফসলই কোনো রকমে হচ্ছে। তাছাড়া বিক্রিত মাটি বহনকারী ট্রাক্টরগুলো গ্রাম-গঞ্জের ভিতরে গড়ে ওঠা রাস্তা ও থানা শহরের সঙ্গে সংযোগকারী রাস্তার উপর দিয়ে অবাধে ও বেপরোয়াভাবে প্রতিনিয়ত যাওয়া-আসার কারণে একদিকে যেমন রাস্তাগুলো ভেঙে খানাখন্দে পরিণত হচ্ছে অন্যদিকে রাস্তাঘাটে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ, কলেজ, বিদ্যালয়গামী ছাত্র-ছাত্রী তথা জনজীবন রয়েছে হুমকির মুখে। কাজ শেষ হওয়ার পরে মালিকপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া রাস্তাগুলোর মেরামত পর্যন্ত করে না। বর্ষাকালে এইসব রাস্তায় চলাচলকারী মানুষের দুর্ভোগসীমা থাকে চরমে। তাছাড়া ট্রাক্টর চলাচলে সৃষ্ট ধুলাবালি ও কালো ধোঁয়ায় অনেকেই শ্বাসকষ্টসহ নানা রকম অসুখের সম্মুখীন হচ্ছেন। এসব দেখেও যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। পরিবেশ অধিদফতরের আইন অনুযায়ী, ইটের ভাটায় জ্বালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহারের কথা বলা হয়ে থাকলেও অনেক জায়গাতেই প্লাস্টিক বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে। কয়লার দাম বাড়ায় স্থানীয় ভাটা মালিকেরা জ্বালানি খরচ কমিয়ে আনতে কয়লার সঙ্গে বিপুল পরিমাণে বর্জ্য প্লাস্টিক ব্যবহার করছেন। এতে করে সরকারের পরিবেশবান্ধব ইট-ভাটা স্থাপনের পরিকল্পনা একেবারেই ব্যাহত যাচ্ছে। তবে প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্যের আগুন থেকে নির্গত ধোঁয়ায় ক্ষতির পরিমাণ অধিক। ইটের ভাটা থেকে উত্পন্ন কালো ধোঁয়া শিশু এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের ফুসফুসের জন্য অনেক বড় হুমকি। ইটের ভাটার কালোধোঁয়া থেকে ব্যাপক কার্বণ নিঃসরণ হওয়ার ফলে বায়ুমণ্ডলে এক ধরনের গ্যাস সৃষ্টি হচ্ছে। যা মানব সম্পদ ও প্রাকৃতিক জীব ও বৈচিত্র্যর জন্য হুমকিস্বরূপ। তাছাড়া কার্বণ নিঃসরণের কারণে জলবায়ু যে হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে তারও অন্যতম কারণ ইটের ভাটার নির্গত কালোধোঁয়া। বুয়েটের এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে পরিবেশ অধিদফতরের স্থানীয় সূত্র জানায়, দেশের বায়ু দূষণের শতকরা ৩৫ ভাগের জন্য দায়ী ইটভাটাগুলো। কৃষিজমি, পাহাড়, টিলা থেকে মাটি কেটে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকার ইট-ভাটার মালিকরা তাই করছেন এবং পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে গাছ ও ডালপালা ব্যবহার করছেন। যার ফলে সেখানকার পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য রয়েছে হুমকির মুখে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় নীতিমালা লঙ্ঘন করে বাংলা ড্রাম চিমনি ও পাকা চিমনির মাধ্যমে কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে। এমনকি কোনো ধরনের চিমনি ছাড়াও পাজা করেই ইট পোড়ানো হয়। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এ হাইব্রিড হফম্যান, জিগ-জ্যাগ, ভার্টিক্যাল শ্যাফট কিলন অথবা পরীক্ষিত নতুন প্রযুক্তির পরিবেশবান্ধব ইটভাটা করার কথা থাকলেও এই আইন অমান্য করা হচ্ছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, পরিবেশ দূষণ কমিয়ে ইটের চাহিদা পূরণের জন্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে ইট তৈরিতে মাটির ব্যবহার শূন্যের কোটায় নামিয়ে এনে বিকল্প কাঁচামাল ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইট-ভাটা পরিবেশ দূষিত করে এটা যেমন সত্য ঠিক তেমনিভাবেই প্রায় সকল প্রকার নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রেই আমরা ইটের উপর নির্ভরশীল। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ যেমন জরুরি, তেমনি ইটের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যায় না। তাই জীব-জগত্ ও পরিবেশকে অব্যাহত এমন মারাত্মক দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে শুধু আইন তৈরি নয় বরং এর সঠিক প্রয়োগে সরকারকে দ্রুতই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক: আল-আমিন আহমেদ’ জীবন
সাবেক ছাত্র, হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজ