চলছে আওয়ামী লীগের জেলা-উপজেলা সম্মেলন

তৃণমূলে উদ্দীপনা

সোমবার, অক্টোবর ২৮, ২০১৯

ঢাকা: ক্যাসিনো বিরোধী শুদ্ধি অভিযানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতারা যখন ভীতি-আতঙ্কে; তখন জাতীয় কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে তৃর্ণমূলের নেতাদের মধ্যে চলছে উৎসাহ-উদ্দীপনা। ২১-২২ ডিসেম্বরের জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে জেলা উপজেলা পর্যায়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যেই কয়েকটি জেলা সম্মেলন হয়ে গেছে। শীর্ষ নেতৃত্ব ঘোষণা দিয়েছেন দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, দখলবাজ, ক্যাসিনো বয়, ইয়াবাম্যান, বিতর্কিত, হাইব্রীড, কাউয়া নেতৃত্বে রাখা হবে না। এতে করে পরীক্ষিত ও অবহেলিত নেতারা সামনে আসছেন। আওয়ামী লীগের মতো সারাদেশের যুবলীগ, কৃষকলীগ, শ্রমিক লীগে অভিন্ন চিত্র। কোথাও কোথাও সম্মেলনে নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, তৃর্ণমূলের নেতাকর্মীরা হাইব্রীজ এবং মন্ত্রী-এমপিদের আত্মীয়-স্বজনদের কারণে কোনঠাসা ছিলেন। শীর্ষ নেতৃত্বের পরিচ্ছন্ন দল গঠনের বার্তা পেয়ে সবাই জেলা উপজেলা কাউন্সিলে সক্রিয় হচ্ছেন। এতে করে কোথাও কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ বলেন, সম্মেলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের প্রতিটি স্তরে ফ্রেশ ব্লাড সরবরাহ করা হবে। বিতর্কিত, হাউব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দিয়ে ত্যাগীদের স্থান করে দেয়া হবে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী লীগের তৃণমূলে সম্মেলন আসলেই যেখানে হাইব্রিড নেতাদের উৎপাতে কোণঠাসা থাকতেন, ত্যাগী ও দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ নেতারা সেখানে চলমান শুদ্ধি অভিযানের কারণে তৃণমূলের সম্মেলনে এবার ভিন্ন চিত্র দৃশ্যমান। বিতর্কিত, অনুপ্রবেশকারী ও হাইব্রিড নেতাদের নেই কোন প্রচারণা এবং পদ পাওয়ার দৌড়ঝাপ। সেসব এমপি ও নেতারা বিতর্কিত, হাইব্রিডদের আশ্রয় দিয়েছেন বা দিচ্ছেন তারাও এবার চাপে পড়েছেন। নিজেদের পদ রক্ষা করা নিয়েই চিন্তিত তারা। সর্বত্র দলের নিবেদিত নেতাকর্মীদের উচ্ছাসে মূখর হয়ে উঠছে আওয়ামী লীগ। যেখানে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীরা সম্মেলনে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছেন সেখানেই ত্যাগী নেতারা বিতর্কিতদের রুখে দাঁড়াচ্ছেন। গত কয়েক দিনে রংপুর, লালমনিরহাট, ঝিনাইদহসহ কয়েকটি জেলায় এ নিয়ে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। দলের দীর্ঘদিনের কোণঠাসা নিবেদিত কর্মীরা মনে করছেন, এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে তাদের মূল্যায়ন করবেন, কোন নেতাকে তৃণমূলের নেতা তৈরী করার লিজ দেননি।

ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, সেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগের আসন্ন সম্মেলন নিয়ে উদ্দীপনা বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগের জেলা ও উপজেলা সম্মেলনেও ত্যাগী, পরিশ্রমি নেতারা এখন পদপ্রত্যাশী হিসেবে সামনের কাতারে। বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের রুখে দাড়াতে প্রস্তুত তৃণমূলের আওয়ামী লীগ নেতারা। এ নিয়ে রংপুর, লালমনিরহাট, নড়াইল, পটুয়াখালীর কয়েক উপজেলা সম্মেলনে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে প্রশ্ন করায় মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এদিকে তৃণমূলে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের পদ না দিতে শনিবার সকল মহানগর, জেলা ও উপজেলা সংগঠনকে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার বলেন, আগে সম্মেলন আসলে হাইব্রিড নেতারা বেশি সক্রিয় হতো, তাদের ভীড়ে ত্যাগী নেতারা কোণঠাসা থাকতেন। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ত্যাগী নেতারা এবার খুব উচ্ছসিত। বিতর্কিত, হাইব্রিড, নদী-নালা দখলকারী, টেন্ডারবাজদের সম্মেলনে দেখা যাচ্ছে না। তারা গ্রেফতার আতঙ্কে থাকায় পদ পাবার জন্য কেউ আমাদের কাছে তদবির করতেও আসছে না। ত্যাগী নেতারা বিশ্বাস করেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা এবার সংগঠনের প্রতিটি স্তরে ত্যাগী ও দক্ষ নেতাদের মূল্যায়ন করবেন।

নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র বোস বলেন, ত্যাগী নেতাদের দিয়ে আমরা কমিটি গঠন করছি। গত শনিবার লোহাগড়া উপজেলার সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছেন মুন্সী আলাউদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মশিউর রহমান। তারা উভয় দলের জন্য নিবেদিত ও ত্যাগী। তাদের কোন ধরণের নেতিবাচক অভিযোগ নেই। আশা করি সর্বক্ষেত্রে ত্যাগী নেতারাই সামনে এগিয়ে আসবে।

ময়মনসিংহ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মহিতুর রহমান শান্ত বলেন, আমরা মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে টিম করেছি যেন বাছাইয়ের মাধ্যমে দলের নিবেদিত কর্মীদের এগিয়ে আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ মতো সংগঠনকে সচ্ছ করার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করবো। তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাদের দোষ থাকতে পারে কিন্তু কর্মীরা নিবেদিত। তারা কোন কিছুর আশা করে না, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে ভালবেসে আওয়ামী লীগ করে। আমরা চেষ্টা করবো নিবেদিত প্রাণ কর্মীদের সামনের সারিতে এগিয়ে আনার।

গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন সবুজ বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ইউনিয়নের সম্মেলন শেষ করেছি। ত্যাগী ও নিবেদিত কর্মীদের মূল্যায়ন করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করে যাচ্ছি।

চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ বলেন, এমপি লীগের দৌড়াত্মের বাহিরে সংগঠনকে নিয়ে আসতে হবে। এতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ শক্ত ভূমিকা পালন না করলে তা কখনো সম্ভবন না।
তৃণমূলের অনেক নেতার শঙ্কা এমপি লীগ, হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের ছত্রছায়া থেকে তৃণমূল সংগঠনকে মুক্ত করা অনেক কঠিন। কারণ ক্ষমতার গত ১১ বছরে সে সকল নেতা তৈরী হয়েছে তারা কেউই এমপি বা জেলা নেতাদের আওতার বাইরে নন। তাদের ছত্রছায়ায় নেতা হয়েছেন সকলে। এবারও সম্মেলন এমপি ও জেলা নেতাদের মাধ্যমে নেতৃত্ব বাছাই করা হবে। এতে করে সচ্ছ ভাবমূর্তির ত্যাগী নিবেদিত কর্মীদের দায়িত্ব পাওয়া অনেক কঠিন। প্রধানমন্ত্রী যদি সকল উপজেলায় সরাসরি হস্তক্ষেপ না করেন তাহলে সংগঠন স্বচ্ছ হবে না।

চলমান শুদ্ধি অভিযানে অনেক নেতা আত্মগোপনে থাকলেও সম্মেলনে ত্যাগী ও নিবেদিত নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণে উদ্দিপনা বিরাজ করছে। নেতৃত্বের প্রতিযোগীতায় ঘটছে সংঘর্ষও। আবার অনুপ্রবেশকারী ও বিতর্কিতদের এবার ছাড় দিতে নারাজ ত্যাগীরা। সম্মেলনের মধ্যে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে অনেকে বক্তব্যও দিচ্ছেন। এ নিয়ে ২৬ অক্টোবর রংপুরে মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করাকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে ৫ জন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের উপস্থিতিতে মহানগর আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক শাহাদাত হোসেনকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে বক্তব্য দেন

শ্রম বিষয়ক সম্পাদক আবদুল মজিদ। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। একই দিন লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় স্লোগান

দেয়াকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ৫ জন আহত হন। অনুষ্ঠানে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয়

নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ২৬ অক্টোবর নড়াইলের নড়াগাতি থানা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের

ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৩ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে নড়াইল-১ আসনে বিভক্ত দু’টি গ্রুপের মধ্যেই এ

সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে পহরডাঙ্গা বাজার থেকে স্থানীয় যুবলীগ নেতা সেলিম-মফিজ শেখের সমর্থকরা মিছিল করে সম্মেলনস্থল কাচারিবাড়ী

প্রাঙ্গণে যাচ্ছিলেন। এ সময় সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী বিএনপি থেকে আসা পহরডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান আহসান আলী সিকদার লাবুর

সমর্থক সাদ্দাম তাদের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে। এতে কথাকাটাকাটি থেকে হাতাহাতি হয়। এ সময় দিদার মোল্লার মোটরসাইকেল কে বা কারা ভেঙে

ড্রেনে ফেলে দেয়। এতে দুই গ্রুপে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

২৫ অক্টোবর পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় আওয়ামীলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে মারামারি হয়েছে। সম্মেলনে ছাত্রলীগ কর্মী তানজিল ইসলাম

অভি ও আলআমিন তোহ’র মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটলেও কাউন্সিলের মাধ্যমে কাছিপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের নাম ঘোষণা করা

হয়েছে। সম্মেলনে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ আকন ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন নিরব গনপতি। এর আগে ৩ অক্টোবর কুমিল্লার

চৌদ্দগ্রামে আওয়ামী লীগের সম্মেলন চলাকালে আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে নাজিম উদ্দিন নামে এক ছাত্রলীগ নেতাকে গুলি করা হয়।

উপজেলার গুনবতী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলন চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। নাজিম উদ্দিন গুনবতী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক।