খাদের কিনারায় বস্ত্রশিল্প খাত

বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৪, ২০১৯

ঢাকা : ৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে তিলে তিলে গড়ে ওঠা দেশের সম্ভাবনায় বস্ত্রশিল্প খাত এখন চরম হুমকির মুখে। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতা ও কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করায় এসব কারখানায় উৎপাদিত সুতা ও বস্ত্র বিক্রি হচ্ছে না। দেড় হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত পড়ে আছে ৩৫০টি কারখানায়।

ফলে উদ্যোক্তারা তাদের উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেকও কাজে লাগাতে পারছেন না। বেশির ভাগ কারখানায় আংশিক উৎপাদনের পাশাপাাশি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কিছু কারখানা। বড় ধরনের লোকসান থেকে রক্ষা পেতে যেসব উদ্যোক্তা আংশিক উৎপাদন চালু রেখেছেন তারাও ব্যাংক ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছেন না।

শ্রমিকের বেতন এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার পাওনায় বকেয়া বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মূল্যায়ন, সম্ভাবনাময় এ শিল্প খাত এখন খাদের কিনারায় অবস্থান করছে। এমতাবস্থায় বড় বিনিয়োগে গড়ে ওঠা সম্ভাবনাময় এ শিল্প রক্ষায় অবিলম্বে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বস্ত্র খাতে বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) থেকে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে দেয়া এক চিঠিতে জানিয়েছে, শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি হওয়া সুতা বাংলাদেশের খোলাবাজারে ঢুকে পড়ায় মিলগুলোতে উৎপাদিত সুতা বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মাধবদী, নরসিংদী, বাবুরহাট, নারায়ণগঞ্জ ও আড়াইহাজার এলাকার টেক্সটাইল মিলগুলো বিপুল সুতা ও কাপড় উৎপাদন করে বিক্রি করতে পারছে না।

বর্তমানে মিলগুলোতে মজুদ থাকা সুতার বাজারমূল্য প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। কম দরে বিক্রির চেষ্টা করেও মিল মালিকরা তা বিক্রি করতে পারছেন না। এ কারণে মিলগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী সুতা, কাপড় উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ করতে পারছে না। ওয়েভিং ও স্পিনিং মিলগুলো সক্ষমতার ৫০ থেকে ৭০ ভাগের বেশি ব্যবহার করতে পারছে না। ফলে আর্থিক সঙ্কটে পড়া মিলগুলো সময়মতো ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করতে পারছে না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশে বর্তমানে কাঁচামালের দরের চেয়েও কম দামে আমদানি করা সুতা ও কাপড় ব্যাপকভাবে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি কেজি দেশী সুতা বিক্রি হচ্ছে আড়াই ডলার। বিপরীতে আমদানি করা সুতার কেজি ২ দশমিক ৩০ ডলার। যদিও এলসি খোলার সময় তিন ডলার দাম দেখানো হয়।

ফলে দেশের মিলগুলোর সুতা ও কাপড় বিক্রি হচ্ছে না। এতে মিলগুলো আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে। ব্যাংকের ঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা করছেন মিল মালিকরা। তাদের দাবি, গত কয়েক বছরে শ্রমিকের মজুরি এবং গ্যাসের দর বাড়লেও সে অনুপাতে উৎপাদিত কাপড় ও সুতার দর তারা বৃদ্ধি করতে পারেনি। গ্যাসের অভাবে মিলগুলোর সক্ষমতাও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নির্ধারণ করে মিলগুলোর বকেয়া ঋণ পরবর্তী ১০ বছরে পরিশোধ করার সুযোগ চেয়েছে বিটিএমএ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিদিন রাত ১২টার পর অবৈধ কাপড় বোঝাই ট্রাক বিভিন্ন কোম্পানির ওয়্যার হাউজ থেকে সরাসরি ইসলামপুর ও সদরঘাটের বিভিন্ন মার্কেটে চলে আসে। সদরঘাটের বিক্রমপুর সিটি গার্ডেন মার্কেটের প্রায় ৬০ শতাংশ কাপড়ই বন্ডেড সুবিধা নিয়ে আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে।

ইসলামপুরের নূর ম্যানশন, সাউথ প্লাজা, গুলশান আরা সিটি, মনসুর ক্যাসেল, ইসলাম প্লাজা, কে হাবিবুল্লাহ মার্কেটে বিক্রি হয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সুতা ও অবৈধ কাপড়। এর সাথে সরাসরি জড়িত ইপিজেডগুলোর কর্মকর্তারা। কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ী শুল্ক দিয়ে সামান্য পণ্য আমদানি করেন, বাকি পণ্য বন্ড থেকে অপসারিত পণ্যের সাথে মিলিয়ে এক ভ্যাট চালানের রসিদ ব্যবহার করেন। এসব অনিয়ম ও চোরাচালান ঠেকাতে সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর, শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর এবং বন্ড কমিশনারেট।

বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বন্ডেড লাইসেন্সের অপব্যবহার ও আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে সুতা ও কাপড় স্থানীয় বাজারগুলোতে অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে। এ কারণে এক লাখেরও বেশি দেশীয় তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বন্ডযুক্ত গুদামের সুবিধার অধীনে আমদানি হওয়া সুতা, জামাকাপড় এবং বিভিন্ন পোশাকের উপকরণ খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে, বিশেষ করে রাজধানীর ইসলামপুর, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, গোপালদী ও বাবুরহাট এবং সিরাজগঞ্জে। ফলে দেশের ডাইং মিলগুলো ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমিয়েছে এবং সুতা উৎপাদনের পরিমাণও কমছে, যা মূলত টেক্সটাইল খাতকে বন্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

বিভিন্ন পর্যায়ের মিল মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯০-৯১ সালে বস্ত্র খাতে ২৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দিত সরকার। তা কমতে কমতে এখন ৪ শতাংশে নেমেছে। এ ব্যবসায় বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো তাদের মুদ্রামান ব্যাপক হারে কমিয়েছে। ভারত পাঁচ বছরে ১৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ, চীন ১০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পাকিস্তান ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ কমিয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশী টাকার দর কমেছে মাত্র ৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এমতাবস্থায় ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমানোর পাশাপাশি সুতা ও বস্ত্র রফতানিতে নগদ সহায়তা বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করার দাবি জানান তারা।

এ দিকে বন্ড সুবিধায় আমদানি হওয়া সুতা ও কাপড় যাতে খোলাবাজারে যেতে না পারে সে জন্য সরকারকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিটিএমএ দাবি করেছে, বর্তমানে ওভেন ইন্ডাস্ট্রিতে দেশের যে সক্ষমতা আছে, তার পুরোটা ব্যবহার করা গেলে বাংলাদেশ কাপড় আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও কোনো সঙ্কট হবে না। সুতা ও কাপড় আমদানিতে শুল্ককর বসানোর প্রস্তাব করে তারা বলেছে, আমদানি করা সুতা ও কাপড়ের মোড়কে সুস্পষ্টভাবে ‘রফতানি পণ্য তৈরিতে ব্যবহারের জন্য আমদানি, নট ফর সেল’ উল্লেখ করে আমদানির বিধান করতে হবে।

বস্ত্র খাতের দুরবস্থা সম্পর্কে বিটিএমএ সচিব মো: মনসুর আহমেদ বলেন, মিথ্যা ঘোষণায় আসা বিদেশী সুতা বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে। এতে দেশীয় মিলগুলোতে উৎপাদিত সুতা বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। বস্ত্র খাতের দুর্দশা নিয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টার সাথে বৈঠক করেছি। তিনি নিজেও যেহেতু এ খাতের ব্যবসায়ী, তাই সার্বিক পরিস্থিতি তার আগে থেকেই জানা আছে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ করে বস্ত্র খাত টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া। তা না হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের খাতটি টিকে থাকা সম্ভব হবে না। আমরা খুব শিগগিরই অর্থমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে এ খাত রক্ষার অনুরোধ করব।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে দেশের টেক্সটাইল শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে চোরাইপথে বস্ত্র আমদানি বন্ধ করতে হবে বলে জানিয়েছেন পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। তিনি বলেন, গার্মেন্ট শিল্পের বনডেস লাইসেন্স অপব্যবহার ও মিস ডিকলারেশনের মাধ্যমে আমদানি করা বস্ত্র স্থানীয় মোকামগুলোতে অবাধে বিক্রি হচ্ছে। আর এ কারণে এক লাখেরও বেশি দেশীয় তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ডায়িং প্রিন্টিং শিল্পের উৎপাদন এখন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। দেশীয় টেক্সটাইল ডায়িং প্রিন্টিং শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে ভ্যাটসহ নানাবিধ আমদানি কর কমিয়ে আনতে হবে বলেও মনে করেন বস্ত্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সব কিছুই নিয়মের মধ্যে এনে বস্ত্রশিল্পকে আরো এগিয়ে নিতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে শিল্প মালিকদের সর্বাধিক সহযোগিতা করা হবে।