‘ফুড রহিম’ ধরাছোঁয়ার বাইরে: চাকরিচ্যুতির আদেশ কার্যকর হয়নি

মঙ্গলবার, অক্টোবর ১, ২০১৯

ঢাকা: খাদ্য বিভাগের পরিদর্শক আবদুর রহিমের (ফুড রহিম) বিপুল অবৈধ সম্পদ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রাজশাহী মহানগরীসহ আশপাশের জেলার বিভিন্ন জায়গায়। অভিযোগ রয়েছে খাদ্য বিভাগে দুর্নীতি অনিয়মের মাধ্যমে রহিম বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।

কিন্তু দুই বছরের বেশি অনুসন্ধানেও তার অবৈধ সম্পদ শনাক্ত করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সম্প্রতি রহিমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান বন্ধ করে তার অভিযোগের ফাইলটি বন্ধ করেছেন রাজশাহী দুদক অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এ নিয়ে দুদকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। উল্লেখ্য, খাদ্য কর্মকর্তা আবদুর রহিম রাজশাহীতে ফুড রহিম নামেই সমধিক খ্যাতি পেয়েছেন।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য কর্মকর্তা আবদুর রহিম বলেন, তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ষড়যন্ত্রের অংশ। রাজশাহীতে যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে তা তার স্ত্রী আরিফা সুলতানার নামে। আরিফা পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি কাজে লাগিয়ে ও ব্যবসা করে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। জমি, হোটেল, দোকানপাট, মার্কেট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবকিছুর মালিক আরিফা।

অপরদিকে খাদ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, দেশের খাদ্য বিভাগে রহিম একটি বহুল আলোচিত নাম। তার অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বিবরণ খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুখে মুখে। মন্ত্রণালয় ও খাদ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও একনামে রহিমকে চেনেন তার বিপুল অবৈধ সম্পদ ও দুর্বিনীত আচরণের কারণে।

শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ২২ জানুয়ারি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব তাকে চাকরিচ্যুতির সুপারিশ করেছিলেন। তারপরও অজ্ঞাত খুঁটির জোরে রহিম এখনও রাজশাহী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসেই আছেন রেশন মনিটরিংয়ের দায়িত্বে। দুই মাস আগে তাকে গোদাগাড়ীতে বদলি করা হলেও রহিম বরাবরের মতোই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ উপেক্ষা করে রাজশাহীতেই আছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজশাহী সমন্বিত দুদক অঞ্চলের সহকারী পরিচালক ও রহিমের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেছেন, দীর্ঘ অনুসন্ধানে খাদ্য কর্মকর্তা আবদুর রহিমের কোথায় কী সম্পদ রয়েছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগকারীদেরও পাওয়া যায়নি। ফলে তার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় নথিজাত করা হয়েছে। যদিও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেছেন, দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা রহস্যজনক কারণে রহিমের বিরুদ্ধে ঠিকমতো তদন্ত না করেই ফাইল নথিজাত করেছেন।

তবে রাজশাহী দুদকের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রহিমের দুর্নীতির ফাইলটি বন্ধ করা হয়নি। তার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগের নিষ্পত্তি হলেও উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ দুদকের হাতে এলে ফের অনুসন্ধান শুরু হতে পারে।

এদিকে দুদকে দাখিল করা অভিযোগসূত্রে জানা গেছে, ফুড রহিম নগরীর প্রাণকেন্দ্র সিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকার গোধূলী মার্কেটের তিনতলায় গড়ে তুলেছেন ২২ হাজার বর্গফুটের বিলাসবহুল হোটেল আনজুম ইন্টারন্যাশনাল। সজ্জিতকরণ ও ফার্নিচারসহ হোটেলটির মূল্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। ঢাকা বাস টার্মিনালের হানিফ কাউন্টারের ওপর গড়ে তুলেছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আনজুম ফ্যাশন। একই এলাকায় রয়েছে রহিমের আনজুম নামের একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টও। সিরোইল মোল্লা মিলের দুই নম্বর গলিতে রয়েছে তিন কাঠা জমির ওপর একটি বাড়ি যেখানে রহিম পরিবার নিয়ে থাকেন।

এই গলিতে রয়েছে রহিমের আড়াই কাঠা আয়তনের আরেকটি প্লট। অন্যদিকে রাজশাহী রেশম কারখানার পূর্ব পাশে রয়েছে রহিমের ৬ কাঠার কোটি টাকা মূল্যের প্লট। সম্প্রতি নগরীর ভাটাপাড়া এলাকায় একটি বিশাল আয়তনের পুকুর ভরাট করে সেটি স্ত্রী আরিফা সুলতানার নামে রেজিস্ট্রি করেছেন। পুকুরটির মূল্য প্রায় কোটি টাকা বলে জানা গেছে।

এদিকে এই খাদ্য কর্মকর্তার নওগাঁ শহরের দয়ালের মোড়ে রয়েছে একটি বাড়ি। নীলফামারীর সৈয়দপুরে রয়েছে একটি জুট মিল যেখানে বস্তা তৈরি হয় এবং এসব বস্তা খাদ্য বিভাগেই সরবরাহ করা হয়। এছাড়া নাটোরের গোপালপুরে শ্বশুরবাড়ি এলাকায় সাত বিঘা জমি ও একটি বাড়ি কিনেছেন রহিম, যার মূল্য দেড় কোটি টাকার বেশি। জানা গেছে, রহিমের নিজের বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদীর লোকোশেড এলাকায়। সেখানে নতুন আরেকটি বাড়ি করেছেন। ঈশ্বরদীতেও রয়েছে বিপুল সম্পদ।

অন্যদিকে রাজশাহী মহানগরীর নওদাপাড়ায় বাস-ট্রাক টার্মিনাল এলাকায় রহিমের ৫০টির বেশি দোকান রয়েছে, যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা। নগরীর শালবাগানে আটতলা নির্মাণাধীন শালবন সুপার মার্কেটটি তার স্ত্রী আরিফা সুলতানার নামে। লক্ষ্মীপুরে জনৈক গোলামের চার কাঠা জমির ওপর বাড়ি দখল করেছেন বলে অভিযোগ ওই বাড়ি মালিকের। ব্যবসার অংশীদার হিসেবে কোটি টাকা রহিম আত্মসাৎ করেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন গোলাম। এ নিয়ে আদালতে মামলা চলছে।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, নির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়ে ২০১৬ সালের অক্টোবরে রহিমের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অভিযোগকারী খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, ১৯৯১ সালে রহিম খাদ্য পরিদর্শক পদে যোগ দেন। এরপর ঘুরেফিরে রাজশাহী ও আশপাশের জেলাগুলোতেই কর্মরত রয়েছেন। খাদ্য বিভাগে ধান চাল গম ক্রয়ে মিলারদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে তিন দশকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ বিপুল সম্পদ গড়েছেন।