প্রতিশ্রুতি দিয়ে তরুণীকে মাসের পর মাস ধর্ষণ করতেন ওসি!

সোমবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯

ঢাকা : ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে মোবাইলে কথোপকথন শুরু। এরপর চাকরি দেয়ার কথা বলে ডেকে হোটেলে নিয়ে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে প্রথম ধর্ষণ, এরপর বিয়ে করার আশ্বাস দিয়ে মাসের পর মাস শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন। একপর্যায়ে অন্তঃস্বত্ত্বা হয়ে পড়লে বিয়ের শর্তে গর্ভপাত।

সবশেষ হুমকি ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ঘটনার এমন ধারাবাহিকতায় একজন ছাত্রীর জীবন বিপন্ন করে তুলেছেন রাজধানীর পল্টন মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হক।

নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগী মেয়েটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়ে সুষ্ঠু বিচার চাইলে শুরু হয় তদন্ত। তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পরেও ওসি মাহমুদুল হক বহাল তবিয়তে থাকায় বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে। ধর্ষিতা এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা উভয়েই সাংবাদিকদের কাছে এ নিয়ে মুখ খুলেছেন।

ওই তরুণীর অভিযোগ, তিনি অন্তঃস্বত্ত্বা হয়ে পড়লে ওসি মাহমুদুল গর্ভপাতের শর্তে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিলে তিনি গর্ভপাত করান। তবে এরপর মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি আর বিয়ে করেননি। একপর্যায়ে ওই তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগই বন্ধ করে দেন ওসি মাহমুদুল। তদন্তে মেয়েটির অভিযোগের সত্যতা মিলেছে, জমা পড়েছে তদন্ত প্রতিবেদনও।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একাধিক সূত্র, মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগের তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগী ওই তরুণীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

তরুণীর লিখিত অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ওসি মাহমুদুলের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। মেয়েটির বাড়িও উত্তরবঙ্গে। প্রথমে চাকরির কথা বলে তাকে ঢাকায় ডাকেন তিনি। ছোট বোন পরিচয়ে পল্টনের হোটেল ক্যাপিটালে ওঠান মেয়েটিকে। খাবারের সঙ্গে নেশাজাতীয় কিছু খাইয়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেন ওসি।

এ নিয়ে মেয়েটির সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। ওসি তাকে আশ্বস্ত করেন, তাকে ভালোবাসেন তিনি। স্ত্রী থাকলেও বিয়ে করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর থেকে প্রায়ই ওই হোটেলের ৩১৫ ও ৫১৭ নম্বর কক্ষে নিয়ে লিপ্ত হয়েছেন শারীরিক সম্পর্কে।

ওই তরুণীর অভিযোগ, এরপর প্রতি সপ্তাহেই ওই তরুণীকে ঢাকায় ডেকে এনে একই হোটেলে নিয়ে যেতেন মাহমুদুল হক। গত বছরের অক্টোবর মাসে তিনি বুঝতে পারেন, অন্তঃস্বত্ত্বা হয়ে পড়েছেন। এ কথা মাহমুদুল হককে জানালে তিনি ওই তরুণীকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গর্ভপাত করতে বলেন এবং একপর্যায়ে তার কথায় রাজি হয়ে গর্ভপাত করান ওই তরুণী।

দুই জনের সম্মতিতে তাদের মধ্যেকার শারীরিক সম্পর্কের ভিডিও ও ছবিও ধারণ করা হয়েছে, যেগুলো তার কাছে রয়েছে বলে ওই তরুণী জানিয়েছেন।

ওই তরুণী বলেন, ‘মাহমুদুল হক বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও আমাকে বিয়ে করেননি। সবশেষ গত ২ এপ্রিল আমার সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করেন দেন। আমি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছি এসময়।

পরে আমার পরিবার সবকিছু জানতে পারলে তারা মাহমুদুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। এসময় আমার পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়, পল্টন থানার ওসির অনেক ক্ষমতা, বাড়াবাড়ি করলে আমার অনেক ক্ষতি হবে। আমি ঢাকার বাইরে একটি চাকরি করছি। সেখানেও আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছেন মাহমুদুল হক।’

ওই তরুণী বলেন, ‘সবশেষে বাধ্য হয়ে আমি মতিঝিল জোনের এডিসি শিবলী নোমানকে বিষয়টি জানাই। তিনি বিষয়টি মিমাংসা করে দেবেন বলেও জানান। মাহমুদুলের বাবাকেও বিষয়টি জানাই। তবুও কোনো কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত আমি আইজিপি বরাবর লিখিত অভিযোগ করি। মাহমুদুল হক আমাকে বিয়ে না করলে আমি আদালতে মামলা করব।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে ওসি মাহমুদুলের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় সবুজবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোনালিসাকে। তদন্ত শেষ করে তিনি প্রতিবেদন ডিএমপি সদর দফতরে পাঠিয়েও দিয়েছেন। সেখান থেকে গত বুধবার (২৫ সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদনটি পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো হয়েছে।

সবুজবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোনালিসা বলেন, ‘পল্টন থানার ওসি মাহমুদুল ও ভুক্তভোগী মেয়েটির ব্যাপারে তদন্ত শেষ করে ডিএমপি সদর দফতরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। তবে প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে পল্টন মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হকের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, ওসি মাহমুদুল হক ২০০১ সালে এসআই পদে পুলিশে যোগ দেন। তার বাড়ি নওগাঁ জেলায়। চাকরি জীবনে তিনি একটি গুরুদণ্ড-ব্ল্যাক মার্ক এবং ২২টি লঘুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তিনি ২০১৭ সালের ২ জুলাই পল্টন থানার ওসি হিসেবে যোগ দেন। তার স্ত্রী ও এক সন্তান রয়েছে।