চট্টগ্রাম নগর যুবলীগের কমিটি ৬ বছরেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি

রবিবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯

চট্টগ্রাম: তিন মাসের জন্য গঠিত চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের কমিটির বয়স চলছে ৬ বছর। এই ৬ বছরে নগরীর ৪৩ সাংগঠনিক ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ৫টিতে সম্মেলন হয়েছে। সেগুলো নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বাকি ওয়ার্ডগুলোর সম্মেলনও করতে পারেনি মহানগর যুবলীগ।

এ অবস্থায় ৬ বছর ধরে যুবলীগের নতুন নেতৃত্ব যেমন গড়ে ওঠেনি, তেমনি সাংগঠনিক কার্যক্রমও ঝিমিয়ে পড়েছে। সাধারণ নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, নগর যুবলীগের আহ্বায়কসহ গুরুত্বপূর্ণ পদধারী ৩ নেতা ব্যস্ত রয়েছেন ব্যবসা-বাণিজ্যে। তাই তারা সংগঠন নিয়ে ভাববার সময় পান না। এ কারণেই ৩ মাসের কমিটি ৬ বছরেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। হয়নি সম্মেলন। ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না তারা।

এদিকে মহানগর যুবলীগের সম্মেলনের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ২৫ জন করে কাউন্সিলর বানানোর নির্দেশনা দিয়েছেন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। সম্প্রতি দেয়া নির্দেশনায় তিনি সংশ্লিষ্ট আসনের এমপি-মন্ত্রীদের মতামতের ভিত্তিতে কাউন্সিলর নির্বাচন করতে বলেছেন। তার নির্দেশনা চট্টগ্রামে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

এ নির্দেশনাটিও অসাংগঠনিক ও অবিবেচনা প্রসূত বলে মনে করছেন সাধারণ নেতাকর্মীরা। আগামী মাসের শেষের দিকে সম্মেলন করার নির্দেশনাও দিয়েছেন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। এই নির্দেশনার পর চট্টগ্রামে নতুন কমিটি নিয়ে আশাবাদী অনেকেই। কমিটিতে স্থান পেতে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে তৎপরতা। বিশেষ করে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও বর্তমান নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারীরা তদবির-লবিং করছেন নানাভাবে। ঢাকায় যুবলীগ নেতাদের ক্যাসিনো বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মের বিষয় সামনে চলে আসার পর চট্টগ্রাম নগর যুবলীগ কোন পথে- সে বিষয়টিও অনুধাবনের চেষ্টা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সভাপতি পদে বর্তমান নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু, যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন খোকা, দিদারুল আলম, ফরিদ মাহমুদ, নগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এমআর আজিম, কেন্দ্রীয় যুবলীগের উপ-অর্থ সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর প্রার্থী হতে চান। এরা সবাই মহিউদ্দিন চৌধুরী তথা তার ছেলে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

এই পদে আ জ ম নাছিরের অনুসারী কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক সদস্য আবদুল মান্নান ফেরদৌস, ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লবসহ আরও কয়েকজন প্রার্থী রয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে নওফেলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত মহানগর যুবলীগের সদস্য নুরুল আনোয়ার, নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন, আ জ ম নাছিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী আবু মো. মহিউদ্দিন, আইন কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস সুমন দেবনাথের নাম আলোচনায় আছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, যদি ভোটের মাধ্যমে কমিটি হয় সে ক্ষেত্রে হবে একরকম। আর ব্যালেন্স বা সিলেক্টিভ কমিটি দেয়া হলে সে ক্ষেত্রে হবে অন্য রকম। অর্থাৎ সিলেক্টেড কমিটি হলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে দুই গ্রুপ থেকে দু’জনকে দেয়া হতে পারে।

২০১৩ সালের ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের ১০১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয় কেন্দ্র থেকে। ওই কমিটিতে মহিউদ্দিন বাচ্চুকে আহ্বায়ক ও দেলোয়ার হোসেন খোকা, দিদারুল আলম, ফরিদ মাহমুদ ও মাহবুবুল হক সুমনকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। এই পাঁচজনই মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন। ১০১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী ৮ জনকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়।
ওই আহ্বায়ক কমিটিতে ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ও ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ড থেকেই ৩১ জনকে রাখা হয়। ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী, ৩৯ নম্বর মধ্যম হালিশহর ও ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ওয়ার্ড থেকে কোনো নেতাই স্থান পাননি। এ নিয়ে নানা হতাশা থাকলেও কিছুই করার ছিল না।

সূত্র জানায়, নির্দেশনা ছিল এই কমিটি তিন মাসের মধ্যে সম্মেলন করে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবে। কিন্তু ৬ বছরে মাত্র ৫টি ওয়ার্ডে সম্মেলন করতে পেরেছে নগর যুবলীগ। পূর্ণাঙ্গ কমিটি আর হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগর যুবলীগের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ নেতার মধ্যে তিনজনই ব্যবসায়ী। আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু ও যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ মাহমুদ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিলবোর্ড ব্যবসার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক ছিলেন। আ জ ম নাছির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নগরীকে বিলবোর্ডের জঞ্জালমুক্ত করেন। এ নিয়ে অনেক ঝড়-ঝাপ্টাও সইতে হয়েছে মেয়রকে। বর্তমানে বাচ্চু ও ফরিদ রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। দেলোয়ার হোসেন খোকারও রয়েছে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা। একইভাবে নগর যুবলীগের সভাপতি পদে বর্তমানে প্রার্থী হতে চাওয়া হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিআরবিতে সংঘটিত ডাবল মার্ডার মামলার আসামি হন। এ কারণে তিনি কেন্দ্রীয় যুবলীগ থেকে বহিষ্কারও হন।

সূত্র জানায়, নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর নগর যুবলীগের কার্যক্রম একেবারেই ঝিমিয়ে পড়েছে। দায়সারাভাবে পালন করা হচ্ছে সাংগঠনিক কর্মসূচি।

৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গি বাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর, কমার্স কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি হাসান মুরাদ বিপ্লব বলেন, ‘নগর যুবলীগের বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নিলেও কমিটির নেতারা সে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেননি। তিন মাসের স্থলে ৬ বছর সময় পেয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে চাইলে সংগঠনকে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে অনেক শক্তিশালী ও মজবুত করতে পারতেন। সংগঠনের চেয়ে তাদের মনোযোগ বেশি ছিল ব্যবসায়। এটা দুর্ভাগ্য।’

নগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী সুমন দেবনাথ বলেন, ৬ বছর ধরে কমিটি না হওয়ায় নেতৃত্ব উঠে আসেনি। যুবলীগের সাংগঠনকি কর্মকাণ্ডও স্থবির। নেতারা ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন বেশি। তাই তারা সংগঠনের দিকে নজর দেননি। এসব কিছু সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা প্রকৌশলী আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘সম্মেলনের জন্য এমপি-মন্ত্রীদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ২৫ জন করে কাউন্সিলর নির্বাচনের যে নির্দেশনা চেয়ারম্যান দিয়েছেন সেটি অযৌক্তিক। কারণ সব মন্ত্রী-এমপি দলীয় নয়। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পদস্থ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই বরং কাউন্সিলর নির্বাচন করা যেতে পারে। নগর যুবলীগ জাতীয় শোক দিবসসহ বড় কিছু কর্মসূচি পালন করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ। পদস্থ নেতারা বিলবোর্ড ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন।’

তিন মাসের আহ্বায়ক কমিটি ৬ বছরেও পূর্ণাঙ্গ করতে না পারার ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু। তবে তিনি এ ব্যর্থতার দায় এককভাবে নিতে নারাজ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগসহ মুরব্বি ও সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয়টা ঠিকমতো হয়ে ওঠেনি। ৫টি ওয়ার্ডে কমিটি করতে গিয়েও নানা ঝামেলায় পড়েছি। তবে আগামী মাসের শেষের দিকে নগর যুবলীগের সম্মেলন করার জন্য চেয়ারম্যান সময় বেঁধে দিয়েছেন। কাউন্সিলর নির্বাচনের জন্যও একটি নির্দেশনা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী কাজ চলছে। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হলেও সাংগঠনিক কার্যক্রম কখনোই থমকে থাকেনি বলে দাবি করেন তিনি।

সাংগঠনিক কাজের চেয়েও ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন যুবলীগ নেতারা- এমন অভিযোগের জবাবে নগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, ‘এটা ঠিক যে যুবলীগের যারা নেতৃত্বে আছেন তাদের সবাই আর্থিকভাবে সলভেন্ট। সবাই ব্যবসা-বাণিজ্য করে। দল করেন বলে তো আর তারা বেকার থাকতে পারেন না। ব্যবসা করাটাতো অপরাধ নয়। কোথাও কোনো অপকর্ম করছে কিনা সেটা হচ্ছে বড় বিষয়। জঙ্গিবিরোধী আন্দোলন, জাতীয় নির্বাচন ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলের পক্ষে কাজ করাসহ নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনার কারণেই যুবলীগের ওয়ার্ড কমিটিগুলো করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ‘এখন যেহেতু নগর যুবলীগের সম্মেলন করার জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে কেন্দ্র থেকে, তাই যথাসময়ে সম্মেলন হয়ে যাবে বলে আশা করছি।’