ক্লাব চলে জুয়ার টাকায় এটা সবাই জানে: ওসি মতিঝিল

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯

ঢাকা : হঠাৎ করেই জানা গেল ঢাকায় ৬০টির মতো ক্যাসিনো আছে৷ আর তার নিয়ন্ত্রণ করেন যুবলীগ নেতারা৷ অভিযানও হলো৷ এই ক্যাসিনোগুলো তো আর রাতারাতি গজিয়ে ওঠেনি৷ তাই প্রশ্ন উঠেছে পুলিশ আর সাংবাদিকরা তাহলে কি করেছেন?

ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে বুধবার রাতভর অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব, পুলিশ নয়৷ তারা অভিযান চালিয়ে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবসহ চারটি ক্লাব সিল করে দিয়েছে৷ আর খালেদকে আটক করেছে অভিযান শুরুর আগে তার গুলশানের বাসা থেকে৷ চারটি ক্লাবের মধ্যে একটি বনানীর ‘গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ’৷ আর বাকিগুলো মতিঝিল থানা এলাকায় এবং থানার কয়েকশ’ গজের মধ্যে৷ ফকিরেরপুলের- ‘ইয়ংমেন্স ক্লাব’, গুলিস্তানের ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র’ এবং আরামবাগের ‘ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব’ ৷

র‌্যাব অভিযান চালালো পুলিশ কেন ব্যবস্থা নেয়নি জানতে চাইলে মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) ওমর ফারুক ডয়চে ভেলেকে বলেন,‘‘মতিঝিল এলাকা ক্লাব পাড়া, এখানে জুয়া খেলা হয় আমরা জানি৷ এটা সবাই জানে ৷ ক্লাব চলে জুয়ার টাকায়৷ ক্যাসিনো-ম্যাসিনো কী আমি বুঝি না৷ ক্যাসিনোর খবর আমাদের জানা নেই৷”
জুয়া বৈধ কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘‘জুয়া অবৈধ৷ তারপরওতো চলে৷”

তবে তিনি দাবী করেন, ‘‘পুলিশও মাঝে মধ্যে অভিযান চালায় ৷ আবার কয়েকদিন পর শুরু হয়৷”
‘এখানে জুয়া খেলা হয় এটা সবাই জানে’ অভিযান চালালে কোনো চাপ আসে কিনা? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘‘না চাপ নাই৷”

আর বনানীর ‘গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ’ প্রসঙ্গে ওই জোনের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন,‘‘এই এলাকায় একটিই ক্যাসিনো ছিলো৷ আমরা এটাকে ১৬ অক্টোবরই অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দিই৷ র‌্যাব বুধবার রাতে গিয়ে সিল করে দিয়েছে৷ আমরাই আগে বন্ধ করেছি৷”এই ক্যাসিনো ক্লাবটি দুই বছর ধরে চলে আসছিলো৷

নান সূত্রে কথা বলে জানা গেছে আগে ঢাকায় এই ক্যাসিনো জুয়ার মূল নিয়ন্ত্রক ছিলো ধানমন্ডি এলকার একটি ক্লাব৷ আর গুলশানে একটি বাণিজ্যিক এন্টারটেইনমেন্ট ক্লাবেও ক্যাসিনো চালু হয় কয়েক বছর আগে৷ যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ধানমন্ডির ওই ক্লাবটিতে জুয়া খেলতে গিয়ে ক্যাসিনো ব্যবসার প্রতি আকৃষ্ট হন৷ তিনি এবং খালেদ মাহমুদ সিংগাপুরের ক্যাসিনোতে গিয়েও জুয়া খেলতেন৷ তিন বছর আগে তারাই ঢাকায় এই ক্যাসিনোর বিস্তৃতি ঘটায়৷ এর প্রধান কেন্দ্র হয় মতিঝিল, গুলশান ও বনানী এলাকা৷ ওইসব এলাকার ক্লাবগুলোতে তারা প্রভাব বিস্তার করে ক্যাসিনো ব্যবসা চালু করে৷ তবে এর উপরে আরো প্রভাবশালী নেতা আছেন যারা নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক৷ এই ক্যাসিনো ব্যবসার টাকা ঠিকমত ভাগ করার জন্য যুবলীগে একজন ক্যাশিয়ারও আছেন৷ এই ক্যাসিনো ব্যবসা যুবলীগের একটি চেইনের মাধ্যমে চলে৷ এটাই যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা থেকে শুরু করে অনেকের আয়ের উৎস৷ এটার জন্য তারা থানা পুলিশ থেকে শুরু করে সব সেক্টরকেই ম্যানেজ করে চলেন৷
‘২০১৬ সাল থেকেই এই ক্যাসিনো নিয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে’

এদিকে প্রশ্ন উঠেছে এইসব ক্যাসিনো নিয়ে সংবাদ মাধ্যম কি পর্যাপ্ত প্রতিবেদন করেছে৷ খোজঁ নিয়ে জানাগেছে কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা এবং অনলাইন ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে ছবিসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন হয়েছে৷ কিন্তু সেটা খুব বেশি নয়৷ ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিভিশনের একজন সাংবাদিক জানান,‘‘২০১৭ সালে আমি এই ক্যাসিনো নিয়ে ফুটেজ এবং বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম৷ কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠান তা প্রচার করতে দেয়নি৷”

বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদ দীপু সারোয়ার বলেন, ‘‘অবৈধ জুয়া ও ক্যাসিনো নিয়ে প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়া আগেই অনেক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে৷ সে তুলনায় ব্রডকাস্ট মিডিয়ায় রিপোর্ট কম হয়েছে ৷ জুয়ার আসরগুলো নিয়ে ব্রডকাস্ট মিডিয়ায় আরও অনেক কিছু করার ছিলো৷”

আর বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন,‘‘২০১৬ সাল থেকেই এই ক্যাসিনো নিয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে৷ তিনি নিজের পত্রিকাসহ আরো কয়েকটি পত্রিকার প্রতিবেদনের তারিখ উল্লেখ করে বলেন পুলিশের দায়িত্ব ছিলো ব্যবস্থা নেয়ার৷ কিন্তু তারা নেয়নি৷ ক্যাসিনোর নানা সরঞ্জামতো আমদানি করা হয়েছে৷ এগুলো কিভাবে আমদানি করা হলো?”
সূত্র: ডয়েচে ভেলে