ছাত্রদলের জন্মকথা, অতঃপর যখন যেভাবে যা হলো

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯

ঢাকা: মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় কমিটি ভেঙে দিয়ে গত ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিলের দিন ধার্য করা হয়েছিল। দীর্ঘ ২৭ বছর পর সরাসরি ভোটে কাউন্সিলকে ঘিরে সারা দেশে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দেয়। সংগঠনটিতে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হয়।

সব প্রস্তুতি যখন শেষ, যখন রাত পোহালেই ভোট, ঠিক তার দুদিন আগে ১২ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের সাবেক কমিটির সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আমান উল্লাহর দায়ের করা মামলায় কাউন্সিলের ওপর স্থগিতাদেশ দেন ঢাকার চতুর্থ জজ আদালত। একইসঙ্গে একইসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ১০ নেতাকে পরবর্তী ৭ দিনের মধ্যে কাউন্সিলের ব্যাপারে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেয়া হয়েছে।

ভোটের দু’দিন আগে হটাৎ এমন স্থগিতাদেশকে ‘অযৌক্তিক ও সরকারের গভীর ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। আদালতের হঠাৎ স্থগিতাদেশে আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে ছাত্রদলের কাউন্সিল। নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দেয় হতাশা আর ক্ষোভ।

এরইমধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে গুলশা‌নে বিএন‌পি চেয়ারপারস‌নের রাজ‌নৈ‌তিক কার্যাল‌য়ে আদালতের নির্দেশে স্থগিত ছাত্রদলের কাউন্সিল নিয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে বৈঠকে বসেন কাউন্সিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। বৈঠকে লন্ডন থে‌কে স্কাইপে যোগ দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তা‌রেক রহমান। ওই বৈঠকেই আদালতের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ছাত্রদলের কাউন্সিল অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় ও পরবর্তী দিন ঠিক করা হয়।

মঙ্গলবার পর্যন্ত ছাত্রদল নেতাকর্মীদের মধ্যে গুঞ্জন ছিল- যেকোনও সময় ছাত্রদলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে কাউন্সিল অনুষ্ঠানে যে খুব বেশি বিলম্ব হবে না সেরকমই ইঙ্গিত ছিল নেতাকর্মীদের। মঙ্গলবার রাতের গুলশানের বৈঠ‌কের পর রাতেই ফোন ক‌রে সারা দে‌শের কাউন্সিলরদের বুধবার বিকেল ৪টার মধ্যে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। তাতে করে কাউন্সিল নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে যায়। বলাবলি শুরু হয়, আজই (বুধবার) হয়তো কাউন্সিল হয়ে যেতে পারে।

এরইমধ্যে নির্দেশনা মোতাবেক সারা দেশ থেকে কাউন্সিলররা বুধবার বিকেলের মধ্যে নয়াপল্টনে এসে জড়ো হতে থাকে। বিকেলে সাবেক ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে আরও এক দফা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে স্কাইপে যুক্ত হন তারেক রহমান। ওই বৈঠক শেষে তারেক রহমান ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী এবং কাউন্সিলরদের সঙ্গে স্কাইপের মাধ্যমে মতবিনিময় করেন।

বৈঠক ও মতবিনিময় শেষে ভোটের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত হলে রাত ৯টার দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের শাহজাহানপুরের বাসায় শুরু হয় কাউন্সিলের ভোটগ্রহণ। ওই কাউন্সিলে সারা দেশে ছাত্রদলের ১১৭টি ইউনিটের ৪৯০ জন কাউন্সিলর তাদের ভোট প্রদান করেন। বিরতিহীনভাবে ভোট চলে রাত সোয়া ১২টা পর্যন্ত। এর পর রাত ১টা থেকে শুরু হয় ভোট গণনা।

বৃহস্পতিবার ভোরে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত ফলাফলে ছাত্রদলের নতুন সভাপতি নির্বাচিত হন ফজলুর রহমান খোকন ও সাধারণ সম্পাদক পদে জয়লাভ করেন ইকবাল হোসেন শ্যামল। ১৮৬ ভোট পেয়ে বগুড়ার সন্তান ফজলুর রহমান খোকন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কাজী রওনুক ইসলাম শ্রাবণ পান ১৭৮ ভোট। অন্যদিকে ১৩৯ ভোট পেয়ে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন নরসিংদীর ইকবাল হোসেন শ্যামল। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাকিরুল ইসলাম জাকির পান ৭৭ ভোট।

নির্বাচনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে মোট প্রার্থী ছিলেন ২৮ জন। এর মধ্যে সভাপতি পদে ৯ জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১৯ জন।

এবার ছাত্রদলের কাউন্সিলে সভাপতি পদে প্রার্থী ছিলেন, কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, হাফিজুর রহমান, রিয়াদ মো. তানভীর রেজা রুবেল, মো. এরশাদ খান, মো. ফজলুর রহমান খোকন, এসএম সাজিদ হাসান বাবু, এবিএম মাহমুদ আলম সরদার, মাহমুদুল হাসান বাপ্পি,ও মোহাম্মদ মামুন বিল্লাহ।

আর সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন- মো. আমিনুর রহমান আমিন, শাহ নাওয়াজ, জাকিরুল ইসলাম জাকির, মোহাম্মদ কারিমুল হাই (নাঈম), মাজেদুল ইসলাম রুমন, ডালিয়া রহমান, শেখ আবু তাহের, সাদিকুর রহমান, কেএম সাখাওয়াত হোসাইন, সিরাজুল ইসলাম, মো. ইকবাল হোসেন শ্যামল, মো. জুয়েল হাওলাদার (সাইফ মাহমুদ জুয়েল), মো. হাসান (তানজিল হাসান), মুন্সি আনিসুর রহমান, মো. মিজানুর রহমান শরিফ, শেখমো. মশিউর রহমান রনি, মোস্তাফিজুর রহমান, সোহেল রানা ও কাজী মাজহারুল ইসলাম।

ফলাফল ঘোষণার পরই বৃহস্পতিবার সকালে গণমাধ্যমের সামনে আসেন ছাত্রদলের নতুন সভাপতি ও সম্পাদক। শুরুতেই তারা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়াই হবে নতুন নেতৃত্বের মূল চ্যালেঞ্জ।

সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় ছাত্রদলের নতুন সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন বলেন, ‘ছাত্রদলের প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করা। আর তাঁর মুক্তির মধ্য দিয়েই আমরা বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠা করবো। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবো।’

এসময় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা জানেন, ডাকসু নির্বাচনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। আমরা ছাত্রদের অধিকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনের কার্যাবলি সুনিশ্চিত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ শুরু করবো।’

১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি ‘শিক্ষা ঐক্য প্রগতি’- এই শ্লোগানকে ধারণ করে বাংলাদেশ জাতীয়বাদী ছাত্রদলের পথচলা শুরু হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ভবিষ্যত নেতৃত্ব তৈরি করার জন্য একটি ছাত্র সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাজী আসাদকে আহ্বায়ক করে ছাত্রদলের প্রথম কমিটি প্রকাশ করা হয়। তখনকার সময়ের জিয়ার জনপ্রিয়তায় অনেক তরুণ-তরুণী অনুপ্রাণিত হয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগদান করতে থাকেন।

শুরুতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের গ্রুমিং গ্রাউন্ডে ছিল ৩টি ছাত্র সংগঠন। ন্যাপ (ভাসানী) ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রদল, ইউনাইটেড পিপলস পার্টি (ইউপিপি) ছাত্রসংগঠন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) ছাত্রসংগঠন জাগ ছাত্রদল। জিয়াউর রহমান ও তাঁর তৎকালীন ছাত্র-বিষয়ক উপদেষ্টা মুস্তাফিজুর রহমানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই তিন ছাত্র সংগঠনের রসায়নে গঠিত হয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। শুরুতে কাজী আসাদকে আহ্বায়ক করা হলে শেষ পর্যন্ত ছাত্রদলের প্রথম সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন এনামুল করিম শহীদ। পরবর্তী আহ্বায়ক ও সভাপতি ছিলেন গোলাম সারোয়ার মিলন। এই দু’জনই ভাসানী ন্যাপের ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রদল থেকে এসেছিলেন।

সবশেষ ১৯৯২ সালে সরাসরি ভোটে ছাত্রদলের কাউন্সিল হয়েছিল। সেবার সরাসরি ভোটে রুহুল কবির রিজভী (বিএনপির বর্তমান সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব) সভাপতি ও এম ইলিয়াস আলী (বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমানে নিখোঁজ) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর দীর্ঘ ২৭ বছর পর বুধবার রাতে ভোটের মধ্য দিয়ে ছাত্রদলের নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পেলো দেশের অন্যতম বৃহৎ এই ছাত্র সংগঠনটি।