স্বাস্থ্য-শিক্ষা বিচারালয় কোথাও দুর্নীতির জন্য যাওয়া যায় না : ফখরুল

সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯

ঢাকা: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অধিকতর উন্নয়নে বরাদ্দ দেয়া মেগা প্রজেক্টের অর্থ কেলেঙ্কারি তথা ঘুষ লেনদেন দুর্নীতির দায়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের এই মুহূর্তে পদত্যাগ করা উচিত অথবা তাকে পদচ্যুত করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে তিনি এসব কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকে আমার কাছে একটি নতুন খবর আছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের কাছে ঘুষ চাওয়ার অপরাধে ছাত্রলীগের যে দুই শীর্ষ নেতাকে পদচ্যুত করা হয়েছে এটাকে আবার নতুন নাম দিয়েছে তারা। কী নাম দিয়েছে বলুন তো? নাম দিয়েছে ‘ফেয়ার শেয়ার’। ৫ অথবা ১০ শতাংশ ঘুষ যে নেবে এটা হলো ‘ফেয়ার শেয়ার’। এই ফেয়ার শেয়ারের মধ্যে আবার এখন ভাইস-চ্যান্সেলরের নামও চলে এসেছে। উনি নাকি ইতোমধ্যে ১ কোটি টাকা দিয়ে দিয়েছেন। এমতাবস্থায় দ্রুত ভিসির পদত্যাগ করা উচিত, না হয় তাকে অব্যাহতি দেয়া দরকার।’

সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি চলছে। ছাত্রলীগের দুই নেতাকে বের করে দিয়ে সরকার স্বীকার করেছেন যে ‘করাপশন চলছে’। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে হাজার চেষ্টা করেও থলের বিড়াল ঢেকে রাখা যাচ্ছে না। কালো বিড়ালের মতো বের হয়ে আসছে এবং এগুলো এখন জনগণের কাছে পুরোপুরি চলে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছাত্র ভর্তি করছে রাতের বেলা। কোথায় আছে দুর্নীতিমুক্ত জায়গা? আজ স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারালয় কোথাও দুর্নীতির জন্য যাওয়া যায় না।’

ফখরুল বলেন, ‘কালকে আমাদের পুলিশ কমিশনার ভালো ভালো কথা বলেছেন। তার একটা কথা আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘যদি কেউ কোনও কাজ না করে এবং সেবার বিনিময়ে যদি কোনও অর্থ দাবি করে তাহলে আমাদেরকে জানাবেন। আমরাই গিয়ে সেখানে বসবো’।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘যারা মিথ্যা বলে জনগণের সাথে প্রতারণা করে জোর করে ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় বসে থাকে তাদের ক্ষমতায় থাকার কোনও অধিকার নেই। এটা সরকার অবৈধ এই পার্লামেন্ট অবৈধ। সুতরাং অবিলম্বে পার্লামেন্ট বাতিল করে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে একটি নতুন নির্বাচন দিতে হবে এবং সে নির্বাচনে নতুন সরকার নতুন পার্লামেন্ট গঠন হবে। এই হচ্ছে জনগণের দাবি আজকে।’

তিনি বলেন, ‘অবিলম্বে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। কারণ জনগণের প্রতীক গণতন্ত্রের প্রতীক দেশনেত্রী আইনসম্মতভাবে যে জামিন পান সেই জামিন নিশ্চিত করতে হবে।’

সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘কেন বেগম জিয়াকে আটকে রেখেছেন? এত ভয় পান কেন? ছাত্রদলের কাউন্সিল নিয়ে নাটক করলেন কেন? বাধা দিলেন কেন? তাহলে গণতন্ত্রকে আপনারা চলতে দিতে চান না। যারা গণতান্ত্রিকভাবে কাজ করতে চায় তাদেরকে আপনারা কাজ করতে দিতে চান না। তাদের পথকে আপনারা বন্ধ করে দিতে চান।’

আসামের নাগরিকপঞ্জি ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘জনাব ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আমরা ভারত সরকারকে বিশ্বাস করতে চাই’। আমরা উদ্বিগ্ন। ধিক্কার জানাই এই নতজানু পররাষ্ট্রনীতিকে, ধিক্কার জানাই ভারতপ্রীতির এই মানসিকতাকে। আমার দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব যদি একবিন্দু ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলার মানুষ কোনদিন তা মেনে নেবে না। মুক্তিযুদ্ধ করেছে ১৯৭১ সালে। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য দরকার হলে আমরা আরও বড় যুদ্ধে অবতীর্ণ হবো।’

ফখরুল বলেন, ‘বাংলাদেশে দশ লাখ রোহিঙ্গা ঢুকেছে। একজনকেও তাদের দেশে ফেরাতে পারেননি সরকার। ভারত-চীন নাকি আমাদের বড় বন্ধু। তাহলে বিষয়টা কী হলো। এদিকে আসামে এনআরসি প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে ১৯ লাখ লোককে বাদ দেয়া হয়েছে। আসামের মন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা বলেছেন- এদেরকে বাংলাদেশে পাঠানো হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকে এই সরকার সুপরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যার হাতে গণতন্ত্র স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিরাপদ থাকে, তাকে হত্যা করার জন্য এইভাবে কারাগারে আটকে রেখেছে। যে মামলায় তাকে আটক করে রাখা হয়েছে, সাজা দেয়া হয়েছে এরকম মামলাতেই আওয়ামী লীগের বহু নেতা জামিন নিয়ে বাহিরে আছেন। অথচ দেশনেত্রীকে জামিন দেয়া হচ্ছে না। কারণ দেশনেত্রী যদি বের হয়ে আসেন তাহলে জনগণকে সংগঠিত করে এই অপশাসন, অন্যায়- অত্যাচার, গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে নিজের প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। তা মোকাবেলা করার মত ক্ষমতা অবৈধ সরকারের নেই। তাই তাঁকে জেলখানায় বন্দি করে রাখা হয়েছে।’

ফখরুল বলেন, ‘এই সরকারের জনগণের সাথে কোনও সম্পর্ক নেই। এই সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন বলেই শুধুমাত্র রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ভোটের আগের রাতে ভোট ডাকাতি করে তাদেরকে ক্ষমতায় ফিরে আসতে হয় এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে হয়। তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যই দমন-পীড়ন ও নিপীড়নের পথ বেছে নেয়।’

তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে ভৌতিক মামলা দেয়া হয়েছে এবং এসব মামলা কাজে লাগিয়ে সরকার নির্বাচনের আগে নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতার করছে ও বাড়িঘরছাড়া করেছে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এই সরকার বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর এক লক্ষ মামলা দিয়েছে। যে সকল মামলায় আসামি ২৬ লক্ষ। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে এরকম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে আমার জানা নেই।’

তিনি বলেন, ‘আজকে এই সরকার সুপরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের ভীতটাকেই নষ্ট করছে। সরকার গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে, সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে এবং বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা প্রশাসনকে সম্পূর্ণ দলীয়করণ করে ফেলেছে। আজকে গণতন্ত্রের প্রধান বিবেক যাকে বলা হয় সেই মিডিয়াকে তারা দলীয়করণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তারা অনেকটা সফলও হয়েছেন।’

ফখরুল বলেন, ‘আজকে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না। কীসের ভয়, ফ্যাসিবাদের ভয়। কথা বললেই তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, কথা বললেই মামলা হবে। যারা আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবী আছেন, অধ্যাপক আছেন কথা বলেন বিভিন্ন জায়গায় যান তারাও আজকে কথা বলার কোনো সাহস পাচ্ছেন না। কারণ তাদের কখন রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে তারা নিজেরাও জানেন না। এটি একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র, এই রাষ্ট্রকে শুধু স্বৈরাচারের সাথে তুলনা দেয়া চলে। অন্য কিছুর সাথে নয়।’

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সহ-সভাপতি  মিজানুর রহমান (বীর প্রতীক) সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান এর সঞ্চলনায় মানববন্ধনে আরও উপস্থিত ছিলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বিএনপির মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক জয়নুল আবেদীন, বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানা প্রমুখ।