সিন্ডিকেট ও আঞ্চলিক ভোট ফ্যাক্টর হবে

শনিবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৯

ঢাকা: ছাত্রদলের দুই শীর্ষ নেতা নির্বাচন ১৪ সেপ্টেম্বর। এজন্য প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। কাউন্সিলরদের (ভোটার) দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন তারা, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতিও। দীর্ঘ ২৭ বছর পর সরাসরি ভোট হতে যাওয়া এ নির্বাচন নিয়ে কাউন্সিলরদের মধ্যেও উৎসবের আমেজ।

সিন্ডিকেটমুক্ত এ নির্বাচনে কে সংগঠনের নেতৃত্বে আসবেন- তা নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে চলছে নানা হিসেব-নিকেশ। তবে অঞ্চলভিত্তিক ভোটই এবার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে জয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে মূল ফ্যাক্টর বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কাউন্সিল সম্পর্কে জানতে চাইলে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান খায়রুল কবির খোকন বলেন, নির্বাচন সফল করতে পরিচালনা, আপিল ও বাছাই কমিটি যৌথভাবে কাজ করছে। প্রয়োজনে আরও স্বেচ্ছাসেবক নেব।

নির্বাচন পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, আধুনিক পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন হবে। জাতীয় নির্বাচনের মতোই সিস্টেম। বুথ থাকবে, ব্যালট বাক্স থাকবে, ভোটার লিস্টসহ আনুষঙ্গিক সব কিছুই থাকবে।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, কাউন্সিলের ভেন্যু এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন, নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় বা চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ের যে কোনো একটিতে আমরা কাউন্সিল করার চিন্তা করছি।

নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, ছাত্রদলের প্রতিটি শাখার শীর্ষ পাঁচজন নেতা ভোট দিতে পারবেন। সংগঠনটির ১০টি সাংগঠনিক বিভাগের ১১৬ শাখায় মোট ৫৬৬ জন ভোটার রয়েছেন।

এর মধ্যে বরিশাল বিভাগের ৯ শাখায় ৪৫ ভোট, ঢাকা বিভাগের ২৯ শাখায় ১৩৮ ভোট, চট্টগ্রাম বিভাগের ১২ শাখায় ৫৮ ভোট, কুমিল্লা বিভাগের ৬ শাখায় ৩০ ভোট, খুলনা বিভাগের ১৪ শাখায় ৭০ ভোট, ময়মনসিংহ বিভাগের ৯ শাখায় ৪৫ ভোট, রাজশাহী বিভাগের ১১ শাখায় ৫২ ভোট, সিলেট বিভাগের ৭ শাখায় ৩৫ ভোট, রংপুর বিভাগের ১৩ শাখায় ৬৩ ভোট ও ফরিদপুর বিভাগের ৬ শাখায় ৩০ ভোট রয়েছে।

একাধিক কাউন্সিলর জানিয়েছেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, আবার সশরীরেও উপস্থিত হয়ে ভোট চাইছেন। তবে এখনও কাকে ভোট দেবেন সেই সিদ্ধান্ত নেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলার ছাত্রদলের সভাপতি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে অন্য জেলার কাউন্সিলরদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আমরা চাই যোগ্য ও পরীক্ষিতদের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে। এজন্য আমরা বেশ কয়েকটি জেলার কাউন্সিলর একসঙ্গে নিজেরা ঠিক করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে ভোট দিতে যাব। আমরা চাই শীর্ষ দুটি পদ দুই বিভাগ থেকে আসুক। তার অঞ্চল থেকে দুই শীর্ষ পদের মধ্যে একটি পদে জয়ী হবে বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি আসাদুজ্জামান পলাশ মনে করেন, শীর্ষ দুই পদে জয়ী হতে মূল ফ্যাক্টর হবে অঞ্চলভিত্তিক ভোট। চট্টগ্রাম বিভাগে প্রার্থী আছে। তিনি চাইবেন অন্য বিভাগের ভোট কীভাবে পাওয়া যায়। আবার খুলনা বিভাগেও প্রার্থী আছে, সেখানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট। এই বিভাগের প্রার্থী মনে করবে এসব আমাদের নিজেদের ভোট, অন্য বিভাগের ভোট কীভাবে আনা যায়। তবে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে যারা জয়ী হবেন তাকে ঢাকা বিভাগের ভোটের ওপর নির্ভর করতে হবে। কারণ এ বিভাগের ভোট সবচেয়ে বেশি।

নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রার্থী ৮ জন। এর মধ্যে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক বৃত্তি ও ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ফজলুর রহমান খোকন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহসভাপতি সাজিদ হাসান বাবু।

যশোরের সন্তান কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ বলেন, ছাত্রদলের ইউনিটগুলোতে সফরের সময় কাউন্সিলরদের একটি কথাই বলছি- আমি আপনাদের কাছে রক্তের উত্তরাধিকার হিসেবে আসিনি, আমি এসেছি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শের উত্তরাধিকারি হিসাবে। সবাই আমার ব্যাপারে জানে। আমার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেন ও ২০১৪ সালের আন্দোলনসহ সব আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতিত হয়েছি, জেলে গিয়েছি। আমি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

বাগেরহাটের সন্তান হাফিজুর রহমান বলেন, ইতিমধ্যে প্রতিটি ইউনিট সফর শেষ করেছি। নিয়মিত কাউন্সিলরদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। সব বিবেচনায় আমাকে কাউন্সিলররা ভোট দেবেন বলে আশা করছি।

এছাড়া বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের একমাত্র সভাপতি প্রার্থী বগুড়ার সন্তান ফজলুর রহমান খোকন। হেভিওয়েট এই প্রার্থীও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

জামালপুরের সন্তান সাজিদ হাসান বাবুও প্রচারে থেমে নেই। প্রত্যেক জেলা সফর করে ভোট চাইছেন। বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় এই নেতাকে নিয়ে আশাবাদী তার অনুসারীরা।

সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী ১৯ জন। এর মধ্যে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহসভাপতি আমিনুর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, তানজিল হাসান, শাহনেওয়াজ, ইকবাল হোসেন শ্যামল ও সাংগঠনিক সম্পাদক আবু তাহের।

সাতক্ষীরার সন্তান আমিনুর রহমান বলেন, ওয়ান-ইলেভেনসহ পরবর্তী সব আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ছিলাম এবং আগামী দিনেও থাকব। এখন উত্তরাঞ্চল সফর করছি। কাউন্সিলররা একটি বিষয়ে নিশ্চয়তা চাচ্ছেন, তা হল গণতন্ত্রের মা খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন। জয়ী হলে মায়ের মুক্তি আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করার বিষয়ে আমি তাদের আশ্বস্ত করেছি।

বরিশালের সন্তান জুয়েল হাওলাদার বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে থেকে আমি বারবার কারান্তরীণ হয়েছি। আর তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে উঠে এসেছি। ২০০৩ সালে ওয়ার্ডের নির্বাচিত সভাপতি ছিলাম। সব ইউনিটেই সম্মানিত কাউন্সিলরদের সঙ্গে আলোচনা করেছি, তারা আশ্বস্ত করেছেন- যোগ্যতার ভিত্তিতে সব বলয়মুক্ত থেকে নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন। এজন্যই আমি শতভাগ আশাবাদী।

পটুয়াখালীর সন্তান তানজিল হাসান বলেন, আমি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কারণে আটটি রাজনৈতিক মামলার শিকার। কয়েকবার কারাবরণ করেছি। ছাত্রলীগের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছি। কাউন্সিলে নিজের জয় নিয়ে তিনিও আশাবাদী।

নোয়াখালীর শাহনেওয়াজ বলেন, আমার বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। একাধিকবার কারাবরণ করেছি। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের সময়ও হাতিয়ায় আওয়ামী লীগের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছি। চূড়ান্ত বিচারের ভার আমি কাউন্সিলরদের ওপর ছেড়ে দিলাম।

যশোরের সন্তান আবু তাহের বলেন, ওয়ান-ইলভেনের সময় দুটি মামলাসহ আমার রিরুদ্ধে ৮টি মামলা রয়েছে। কারাবরণ করেছি। ছাত্রদলের সিন্ডিকেটমুক্ত কমিটি চাই। তা না হলে ছাত্রদল কখনই কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে- দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং দেশনায়ক তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন একই সূত্রে গাঁথা।