অস্থির স্বর্ণের বাজার : দুই মাসে ভরিতে বেড়েছে ৮ হাজার

শনিবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৯

ঢাকা : অস্থিরতা চলছে দেশের স্বর্ণের বাজারে। গত দুই মাসে কয়েক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে দাম। জুলাই থেকে আগষ্ট, দুই মাসেই প্রতি ভরিতে বেড়েছে ৮ হাজার টাকা। ফলে ক্রেতা শূণ্য হয়ে পড়েছে মূল্যবান এ ধাতুর মার্কেট। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে দেশেও দাম বাড়াতে হয়েছে। যা আগামীতে অব্যাহত থাকবে।

স্বর্ণ নীতিমালা অনুযায়ী আমদানির সহজ পথ তৈরি করা হলেও দেশে এখনো আমদানি শুরু হয়নি। সেই সঙ্গে এখনো ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে সোনার মূল্যবৃদ্ধি মোটেও থেমে নেই। দুই দিন পর পরই বাড়ছে মূল্যবান এ ধাতুর দাম।

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে গত মাসেই তিনবার সোনার দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি (বাজুস)। প্রতিবারই বিভিন্ন ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম এক হাজার ১৬৬ টাকা করে বেড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে আসলেই কি আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে স্থানীয় বাজারে মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা থাকে কি না।

বাজুসের তথ্যানুযায়ী, প্রতি ভরি সোনার মূল্যবৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারের দরকে মূল্যায়ন করা হয়। বাজুসের নেতারা দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যতটা মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশে ততটা দাম বাড়ানো হচ্ছে না।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ক্যারেটের প্রকারভেদে দেশে চার ধরনের সোনা বিক্রি হয়। এর মধ্যে ২২ ক্যারেটের (৯২ শতাংশ খাঁটি) সোনা বেশি বিক্রি হয়। বর্তমানে দেশে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ৫৮ হাজার ২৬ টাকা। তার সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাটসহ মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬১ হাজার টাকা।

এছাড়াও সব ধরনের স্বর্ণের ভরিতে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি হিসাব করলে প্রতি ভরির দাম পড়ে ৬৪ হাজার টাকা।

অথচ চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি গ্রাম ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল ৪৮ ডলার। প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় প্রতি ভরির দাম পড়ে প্রায় ৪৮ হাজার টাকা। বাংলাদেশের সঙ্গে ওই বাজারের ভরিতে পার্থক্য ১০ হাজার টাকারও বেশি।

সোনার আন্তর্জাতিক বাজারের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ দুবাইয়েও প্রতি গ্রাম সোনার দাম ছিল ৪৮ ডলার। এ হিসাবে প্রতি ভরির দাম পড়ে ৪৮ হাজার টাকা।

এদিকে দাম বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের বিক্রি অনেক কমে গেছে। যদিও ক্রেতা কমে যাওয়ায় বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ভ্যাট ছাড়াই স্বর্ণ বিক্রি করছেন। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হচ্ছে না। সবাই অপেক্ষায় আছে দাম কমার।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির (বাজুস) সভাপতি গঙ্গাচরন মালাকার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতসহ বড় দেশগুলোর অর্থনীতিতে মন্দার প্রভাব পড়েছে সোনার দামে। এসব দেশ তাদের মুদ্রার মানও কমিয়েছে। কমেছে ঋণের সুদের হারও। ফলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণে বিনিয়োগ করছে। স্বর্ণের এই বাড়তি চাহিদার কারণে প্রভাব পড়ছে দামে।’

যদিও ভরিতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারের ১০ হাজার টাকা পার্থক্য মানতে চাচ্ছেন না তিনি।

তিনি বলছেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্ববাজারের পার্থক্য ২ হাজার টাকার বেশি নয়। বর্তমানে বিদেশ থেকে কেউ এলে ব্যাগেজ রোলে ২শ’ গ্রাম (১৭ ভরি) পর্যন্ত স্বর্ণ নিয়ে আসতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতি ভরিতে ৩ হাজার করে শুল্ক দিতে হয়। তবে শুল্ক ছাড়াই ১০০ গ্রাম পর্যন্ত গহনা নিয়ে আসা যায়।’

বাজুসের সাবেক সভাপতি দিলীপ রায় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বারবার সোনার দাম বাড়ানো নিয়ে আমরাও অস্বস্তিতে পড়েছি। কারণ বিক্রি কমে গেছে। আর আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে দাম বাড়ছে তাতে করে শিগগিরই দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই।’

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর দেশে সোনার চাহিদা প্রায় ২১ টন। কিন্তু বৈধভাবে গত ১০ বছরে এক তোলা সোনাও আমদানি হয়নি। অর্থাৎ সোনার ব্যবসার প্রায় পুরোটাই অবৈধ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর ফলে দুই ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। প্রথম হুন্ডির মাধ্যমে দেশের বাইরে অর্থ পাচার হচ্ছে।

অপরদিকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

জুয়েলারি সমিতির নেতারা বলছেন, স্বর্ণে শুল্ক অত্যন্ত বেশি। এ কারণে আমদানি হয় না। তবে তাদের দাবি, বিদেশ থেকে বাংলাদেশিরা যে সব স্বর্ণ নিয়ে আসছে সেগুলোই তারা কিনছেন। কিন্তু এই হার মোট চাহিদার ৫ শতাংশেরও কম।

সূত্র বলছে, প্রতি বছর বিভিন্ন সংস্থা যে পরিমাণ সোনা আটক করছে, অবৈধপথে তার ১০ গুণের বেশি সোনা ঢুকছে দেশে। এর একটি অংশ বাংলাদেশে থাকছে। বাকি সোনা বিভিন্ন পথে পাচার হচ্ছে ভারতসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশে।

সূত্রমতে, দেশে অবৈধ পথে আসা সোনার যৎসামান্য দেশে থাকলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সোনা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সোনা পাচার হচ্ছে ভারতে। অভিযোগ রয়েছে- সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ কাস্টমস, শুল্ক ও গোয়েন্দা, থানা পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশে সোনা পাচারের ঘটনা ঘটছে।

এদিকে চোরাইপথে সোনা আসা রোধ করতে ‘স্বর্ণ নীতিমালা ২০১৮’ প্রণয়ন করা হয়েছে। নীতিমালায় আমদানি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আগ্রহীরা অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন শুরু করেছেন বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। গত ১৯ মার্চ থেকে আবেদনপত্র বিতরণ শুরু হলেও তা আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। ১৯ আগস্ট পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ আবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পৌঁছেনি বলে জানা গেছে। এ সময়ে একটি মাত্র আবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এলেও তাতে প্রয়োজনীয় কাজগপত্রের ঘাটতি থাকায় তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশের ব্যবসায়ীরা তাদের কাছে থাকা সোনার মজুদের ওপর কর প্রদান করে। প্রতি ভরি অবৈধ সোনা এক হাজার টাকা কর দিয়ে বৈধ করে নেয়। তবুও এতে বাজারের উপর কোন প্রভাব পড়েনি। বরং আরও অস্থির হয়ে উঠেছে স্বর্ণের বাজার।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে সেই ধারাবাহিকতা যদি আরও কিছুদিন চলতে থাকে তাহলে দেশের বাজারে এ ব্যবসাটি বড় ধরণের ধাক্কা খাবে এমনটাই মনে করছেন সবাই।