বিশেষ সাক্ষাৎকারে মাহাথির মোহাম্মদ

মুসলমানদের ওপর দোষ চাপিয়ে দিতে আন্তর্জাতিক ঐক্য রয়েছে

সোমবার, জুলাই ২৯, ২০১৯

আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রধান রূপকার এবং বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ রাষ্ট্রনায়ক মাহাথির মোহাম্মদ চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে তুরস্কে আসলে রাজধানী আঙ্কারায় তার সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ হয় আমার।

তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির পক্ষ থেকে নেয়া সাক্ষাৎকারে আমার আরও দুজন সহকর্মীও অংশ নেন। ৯৪ বছর বয়সী এই নেতার যেমন আছে দেশের রাজনীতিতে প্রবল প্রতাপ, তেমনই মুসলিম বিশ্বে রয়েছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা।

আনাদোলু এজেন্সির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে, মুসলিম বিশ্বের প্রবীণ এ রাজনীতিবিদ রোহিঙ্গা সংকট, ফিলিস্তিন ইস্যু এবং উইগুর মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ে দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।

সাক্ষাৎকারে ড. মাহাথিরের বক্তব্যের সারাংশ

১. মিয়ানমারে নিজ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা নাগরিকত্ব দেয়া হোক। নয়তো তাদের আলাদা রাষ্ট্র করে দেয়া হোক।

২. দুনিয়ার সব সন্ত্রাসের মূল উৎস ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের অবৈধ জন্ম। সন্ত্রাস বন্ধ করতে চাইলে তার মূলোৎপাটন করতে হবে। ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল করা বন্ধ করে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।

৩. উইঘুর মুসলমানদের অন্য নাগরিকদের মতো সমান অধিকার দেয়ার জন্য চীন সরকারের প্রতি আহবান।

আনাদোলু এজেন্সিকে দেয়া সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

আনাদোলু এজেন্সি: ইসরাইলের বিরুদ্ধে আপনার দৃঢ় অবস্থান এবং ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ রক্ষায় দেয়া আপনার বক্তব্যগুলো মুসলিম বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের নৃশংস নীতির বিরুদ্ধে আপনার পরিকল্পনা কী?

ড. মাহাথির: এটি সম্পর্কে স্পষ্ট একটি সত্য কথা হল মিডিয়া বা টিভিতে ফিলিস্তিন সমস্যা নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণে প্রচার করা হয় না। মনে হচ্ছে যেন ফিলিস্তিনের সমস্যাগুলো তুলে না ধরার জন্য কিছু প্রচার মাধ্যমের মধ্যে যেন কোনো অলিখিত চুক্তি রয়েছে।

১৯৪৮ এর দিকে ইসরাইল রাষ্ট্রটি গঠনের জন্য ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে তাদের জমি কীভাবে জব্দ করা হয়েছিল তার কোন উল্লেখই নেই মিডিয়াতে। পরবর্তীকালে, ইসরাইল আরও ফিলিস্তিনি ভূমি দখলে সব আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করতে থাকে। এসব বিষয় প্রায়ই প্রচার মাধ্যমে উল্লেখ করা হয় না।

আমরা মনে করি এখানে প্রধান বিষয় হচ্ছে সন্ত্রাসবাদের মূল কারণগুলোকে হাইলাইট করা। আজ মুসলমানদের ওপর সন্ত্রাসবাদের দোষ চাপিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ঐক্য রয়েছে।

কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে ইসরাইলের অবৈধভাবে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড জব্দ করা এবং আন্তর্জাতিক আইনের অমান্যের কারণেই তথাকথিত সন্ত্রাসবাদের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সন্ত্রাস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, কেন তারা সন্ত্রাসের দিকে ঝুঁকছে এই কারণ জানতে হবে। আমরা মালয়েশিয়াতে সন্ত্রাসীসহ সব মানুষের হৃদয় ও মন জয় করার পরিকল্পনা করেছিলাম, এবং এভাবে ওখানে সন্ত্রাসবাদ শেষ হয়ে গেছে।

কিন্তু যতক্ষণ না সন্ত্রাসবাদের কারণগুলো বিবেচনা করতে পারবেন, আপনি সন্ত্রাস বন্ধ করতে পারবেন না।

আনাদোলু এজেন্সি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবর্তিত এবং কিছু উপসাগরীয় দেশের সমর্থিত ফিলিস্তিনকে নিয়ে ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ নাম তথাকথিত শান্তি চুক্তির যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে সে বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

ড. মাহাথির: হ্যাঁ, এটি শুধুমাত্র (ফিলিস্তিন) সমস্যাটির তাদের নিজস্ব পক্ষের প্রচারণার জন্য। যদিও এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন, তদুপরি এর মাধ্যমে তারা তাদের পূর্ববর্তী কাজগুলোর ন্যায্যতা দিতে চায়। সর্বোপরি, এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অবজ্ঞা ছাড়া কিছু নয়। ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে ভূমি জব্দ করার সময় কোনো গণভোট বা জনমত যাচাই বাছাই করা হয়নি।

ফিলিস্তিনে বসবাসরত জনগণের চিন্তাভাবনা ও অনুভূতির তোয়াক্কা না করেই জমিগুলো দখল করে নিয়ে ইসরাইলকে দেয়া হয়েছিল।

আনাদোলু এজেন্সি: মালয়েশিয়া ও তুরস্ক কীভাবে এই ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান করতে পারে?

ড. মাহাথির: প্রথমত, অবশ্যই বিষয়টিকে জীবিত রাখতে হবে। প্রচার মাধ্যমগুলোতে ফিলিস্তিন সমস্যাটিকে হত্যা করার একটা প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়, মিডিয়ার ভাবটা এমন যেন সেখানে যেন কিছুই ঘটেছে না।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অবিচার করা হচ্ছে এবং আমরা মনে করি, আমি মনে করি তুরস্ক এবং মালয়েশিয়ার উভয়ই এই সমস্যাটিকে ফুটিয়ে তুলতে চাই, যাতে সারা বিশ্ব ফিলিস্তিনিদের প্রতি অবিচারের বিষয়টি অনুধাবন করতে পারে।

আনাদোলু এজেন্সি: আপনি যেমন বলেছিলেন যে আমাদের ইসরাইল-ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানে সন্ত্রাসবাদের প্রধান উৎসের দিকে নজর দিতে হবে, আমরা কি বলতে পারি যে অবৈধভাবে ইসরাইলের সৃষ্টিই হচ্ছে সন্ত্রাসবাদের মূল কারণ?

ড. মাহাথির: হ্যাঁ, এটিই মূল কারণ। কিন্তু অবশ্যই, এটি এখন একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে ইসরাইল নামে একটি রাষ্ট্র রয়েছে। ইসরাইল রাষ্ট্রটি হয়তো ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের দখলকৃত সম্পত্তি ফিরিয়ে দিয়ে নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেবে, নয়তো দুইটি ভিন্ন রাষ্ট্র গঠন এবং ফিলিস্তিনি অঞ্চলে ইসরাইলি বসতি নির্মাণ থেকে বিরত থাকবে।

আমাদের মতে সমস্যাটি এভাবেই সমাধান করা উচিত। এর পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদের মূল কারণের কথা যদি বলি, আমরা যদি ফিলিস্তিনিদের ওপর এই অবিচার বন্ধে পদক্ষেপ নেই তাহলে আমার মনে হয় সারা পৃথিবীতে সন্ত্রাসবাদ কমে আসবে বা সন্ত্রাসবাদ থাকবে না।

আনাদোলু এজেন্সি: আপনার সরকার মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানেও আগ্রহী। মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারাও মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপের আহ্বান জানিয়েছেন। তাছাড়া, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দীন আব্দুল্লাহ রাখাইন রাজ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের দাবিতে বিবৃতি দিয়েছিলেন। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মালয়েশিয়ার নীতি কী?

ড. মাহাথির: মালয়েশিয়া সাধারণত অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। কিন্তু এই ক্ষেত্রে, বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড বা গণহত্যা জড়িত। আর মালয়েশিয়া গণহত্যার বিরুদ্ধে। এছাড়া মিয়ানমারের ভিন্ন জাতের নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণেরও বিরুদ্ধে।

সুতরাং, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে আমাদের এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে। মিয়ানমার তো এক সময় বিভিন্ন রাজ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা মিয়ানমারকে এক রাষ্ট্র হিসাবে শাসন করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এর ফলে অনেকগুলি উপজাতি বার্মা রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়।

কিন্তু এখন তাদেরকে (রোহিঙ্গাদেরকে) অবশ্যই নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করা উচিত, অথবা নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের জন্য তাদের অঞ্চল তাদেরকে দিয়ে দেয়া উচিত।

আনাদোলু এজেন্সি: রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের (আইসিজে) সাম্প্রতিক নেয়া সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কী?

ড. মাহাথির: কোনো ইস্যুতে উভয় পক্ষ আদালতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সম্মত হলেই আইসিজে শুধুমাত্র কাজ করতে পারে। কিন্তু আইসিজে একতরফা সিদ্ধান্ত নিলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে না। সুতরাং, আইসিজের সিদ্ধান্তকে ফলপ্রসূ মূল্যায়ন করার জন্য আগে আমাদের মিয়ানমার সরকারের মনোভাব জানা দরকার।

আনাদোলু এজেন্সি: চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলমানদের দুর্দশা মোকাবেলায় কী করা যেতে পারে?

ড. মাহাথির: আমাদের চীনকে বলতে হবে যে এই ব্যক্তিদের নাগরিক হিসাবে মূল্যায়ন করুন। তারা একটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে তাদের প্রতি ভিন্ন আচরণ করা উচিত নয়। মালয়েশিয়া একটি বহু-ধর্মীয় দেশের উদাহরণ, এখানে সব ধর্মের লোকদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করা হয়।

যাইহোক, কিন্তু সেখানে যদি সহিংসতা হয়, তাহলে অবশ্যই আপনি চীনাদের হাতকে শক্তিশালী করছেন। তারা দাবি করবে যে এই সহিংসতার কারণে তারা এই লোকদের প্রতি ভিন্ন আচরণ করছে। সুতরাং, আমরা সবসময় আলোচনা, সালিশি বা আইন আদালত মাধ্যমে দ্বন্দ্ব নিষ্পত্তির পক্ষে।

কিন্তু যখন আপনি সহিংসতা অবলম্বন করেন, তখন একটি ভাল উপসংহার খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। কারণ এমন কোনো ঘটনা নেই যেখানে সহিংসতার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। সারওয়ার আলম, চিফ রিপোর্টার-নিউজ পাবলিশার, আনাদলু এজেন্সি, তুরস্ক
সাক্ষাৎকার শেষে ড. মাহাথিরের সঙ্গে লেখক সারওয়ার আলম
সাক্ষাৎকারগ্রহণ শেষে ড. মাহাথিরের সঙ্গে সাংবাদিক সারওয়ার আলম।