স্কয়ার হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ‘বাণিজ্য’, ২২ ঘণ্টায় বিল প্রায় দুই লাখ

শনিবার, জুলাই ২৭, ২০১৯

ঢাকা : ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তির পর মারা যাওয়া এক রোগীর জন্য অস্বাভাবিক হারে বিল করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মারা যাওয়া ফিরোজ কবির স্বাধীন হাসপাতালটিতে ছিলেন মোট ২২ ঘণ্টা। এই সময়ে এক লাখ ৮৬ হাজার টাকার বিল দেখে লাশ আনতে যাওয়া লোকজন উত্তেজিত হয়ে উঠেন।
এই ঘটনায় স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কাস্টমার কেয়ার বিভাগে একজন বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের আলোচনায় সমাধান হয়েছে। তবে কী সমাধান সেটা তিনি জানেন না।

জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকরা বরাবর বলে আসছেন, ডেঙ্গু জ্বরের তেমন কোনো ওষুধ নেই। ব্যাথা কমাতে প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া রক্তের প্লাটিলেট কমে গেলে রক্ত দিতে হয়। সঙ্গে চলে তরল খাবার।

স্বাধীন হাসপাতালটিতে ছিলেন ২২ ঘণ্টা মাত্র। অথচ এই সময়েই তাকে ৩২ হাজার টাকার ওষুধ দেওয়ার বিল করেছে স্কয়ার হাসপাতাল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের এই ছাত্রকে একবারও রক্ত দিতে হয়নি। অথচ ১১ বার রক্তের ক্রস চেকের বিল করা হয়েছে ১১ হাজার ৫৫০ টাকা। রক্তের প্লাজমা দেওয়ার বিল করা হয়েছে ছয়বার। একবার এক হাজার ৪০০ টাকা করে বিল হয়েছে আট হাজার ৪০০ টাকা।

রক্ত দিতে হলে ক্রস চেক দুই থেকে তিনবার বা কখনো তার চেয়ে বেশি করতে হয়। কিন্তু ১১ বার ক্রস চেক করা একেবারেই বিরল। আর এমনকি কেন করা হলো, সে বিষয়ে হাসপাতালের কোনো চিকিৎসক বা প্রশাসন বিভাগের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্বাধীন ভর্তি ছিলেন চিকিৎসক শিহান মাহমুদ রেদওয়ানুল হকের অধীনে। তার নম্বরটাও দিতে রাজি হয়নি স্কয়ার হাসপাতালের প্রশাসন বিভাগ থেকে।

স্বাধীন মারা যান শুক্রবার রাতে। বৃহস্পতিবার রাতে ভর্তি হন তিনি। আর মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে যান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন, ছাত্রলীগের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা সম্পাদক চিকিৎসক শাহরিয়ার ফেরদাউস হিমেলসহ আরও অনেকে।

স্বাধীনের বিল দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন ছাত্রলীগ নেতা হিমেল, যিনি ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন। তিনি জানান, একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি বুঝেছেন, এই বিল আসা স্বাভাবিক নয়। আর তিনি যতগুলো প্রশ্ন করেছেন, তার কোনোটির সদুত্তর দিতে পারেননি স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

স্বাধীনের মৃত্যুর ঘটনায় শোকাহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই বিলের কপি ফেসবুকে পোস্ট করে নিন্দা জানাচ্ছেন। এরই মধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে বিলটি। আর বাড়তি বিল করার অভিযোগ এনে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন বাণী ইয়াসমীন হাসি নামের একজন। এই হাসপাতালে পায়ের অপারেশন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন এই নারী।

রাজধানীর অভিজাত হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত স্কয়ারের বিরুদ্ধে এর আগেও এমন অভিযোগ উঠেছিল। গত বছরের ৯ এপ্রিল এক শিশুর জন্মের পর আইসিইউতে রেখে তিন দিনে পাঁচ লাখ টাকা বিল করার ঘটনা নিয়ে তুলকালাম ঘটে। এ নিয়ে শিশুর স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হাতাহাতির হয়।

নবজাতকের বাবার অভিযোগ, একজন চিকিৎসক তাদেরকে বলেছিলেন, জন্মের সময়ই বাচ্চাটা মৃত ছিল। পরে একাধিক নার্সও একই কথা বলেন তাকে। পরে র্যাব যাওয়ার পর ওই শিশুর স্বজনদের ডেকে বিল মওকুফের প্রস্তাব দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

ছাত্রলীগের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা সম্পাদক শাহরিয়ার ফেরদাউস হিমেল বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনের মৃত্যুর সংবাদ শুনে স্কয়ারে যাওয়ার পর তার বিলের কাগজটি চেক করতে গিয়ে বেশ কিছু অসঙ্গতি দেখতে পাই। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১১টার দিকে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকের ভাষ্যমতে শুক্রবার রাত নয়টার দিকে সে মারা যায়। প্রায় ২২ ঘণ্টারও কম সময়ে মোট বিল আসছে এক লাখ ৮৬ হাজার টাকা!’

‘দেখা গেছে ১২ হাজার করে দুই দিনের বিল করা হয় ২৪ হাজার টাকা। সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো-ল্যাব চার্জ করা হয়েছে ৭৩ হাজার টাকা। যেখানে রক্তের ম্যাচিং দেখানো হয় ১১ বার। প্রত্যেকবার এক হাজার ৫০ টাকা করে। ছয় মিনিটে ছয়বার ক্রস ম্যাচিংও দেখানো হয়েছে। তবে শুরু থেকে আইসিইউতে থাকা ফিরোজকে একবারও রক্ত পুশ করা হয়নি।’

‘বিলের কাগজে দেখা গেছে রক্তের প্লাজমা দেয়ার বিল করা হয়েছে ছয় বারের। প্রত্যেকবার এক হাজার ৪৫০ টাকা করে বিল হলেও প্লাজমাও দিতে হয়নি। ক্রস ম্যাচিং ও প্লাজমা দেয়ার বিলে প্রায় ২৫ হাজার টাকা বাড়তি বিল নজরে এসেছে। কারণ সর্বোচ্চ দুই তিন ব্যাগের ক্রস ম্যাচিং করে রাখতে পারতেন। কিন্তু এরা বিনা কারণে ১১ বার ক্রস ম্যাচিং করেছে।’

বিষয়টি নিয়ে ডা. হিমেল হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, একটি টেস্ট আছে যেটা একসঙ্গে ছয়বার করতে হয়। যে কারণে ছয় মিনিটে ছয়বার ক্রস ম্যাচিং দেখানো হয়েছে।

‘হাসপাতালের লোকদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম কেন ১১ বার ক্রস ম্যাচিং করা হলো, কেন ছয়বার প্লাজমা দেয়ার বিল করা হয়েছে তারা উত্তর দিতে পারেনি’- বলেন চিকিৎসক হিমেল।

ডেঙ্গু রোগীকে ২২ ঘণ্টায় কী এমন ওষুধ দেওয়া হলো যে ৩২ হাজার টাকা বিল আসবে-সেটাও বুঝতে পারছেন না চিকিৎসক হিমেল। এ বিষয়ে কাস্টমার কেয়ার বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ কর হলে মো. শিপন নামে একজন বলেন, স্কয়ারে বিল বিভাগ পুরোপুরি আলাদা হওয়ায় চিকিৎসকরা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। তবে এ বিষয়ে কে কথা বলতে পারবেন, সে প্রশ্ন এবং তার নম্বর চাইলে শিপন তা দিতে অপারগতা জানান।
ছাত্রলীগ নেতা ও চিকিৎসক হিমেল জানান, তিনি এই বিষয়টি নিয়ে চাপ দিলে স্কয়ারের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা তাকে জানান, স্বাধীন মারা যাওয়ার আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

এদিকে স্কয়ারের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি দেয়া বাণী ইয়াসমীন হাসী ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘স্কয়ারের ভুল চিকিৎসায় আমার মা মারা গেছেন। স্কয়ারে ভুলভাবে প্লাস্টার করার কারণে আমার একটা পা শুকিয়ে গেছে। একটু দাঁড়িয়ে থাকলে এখনো পায়ে ব্যথা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ফিরোজের মাত্র ২২ ঘণ্টারও কম সময়ে বিল এসেছে এক লাখ ৮৬ হাজার ৪৭৪ টাকা। আমি স্কয়ার হাসপাতাল এবং মেয়র সাঈদ খোকনের বিরূদ্ধে মামলা করব।’