ত্রাণ চাই না, আমরা বাঁধ চাই

মঙ্গলবার, জুলাই ২৩, ২০১৯

শাহিনুর ইসলাম প্রান্ত, লালমনিরহাট প্রতিনিধি : আমাদের ১৫ কেজি চাল আর চিড়া-মুড়ির (ত্রাণ) দরকার নাই, শরীরে শক্তি আছে কাজ করে খেতে পারি। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই। বাঁচার জন্য তিস্তা নদীর বাঁধ করে দেন। বাঁধ তৈরি করে দিলে জমি-জমা সব ফেরত পাবো, আমরা কাজ করে খাবো।

লালমনিরহাটের ৫ উপজেলার তিস্তার পাড়ের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে এমন আকুতি করেন।

সড়ে জমিনে দেখা যায়, জেলার ৫ উপজেলায় তিস্তা পাড়ের ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো আর ত্রাণ চায় না। বন্যার কবল থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত সময়ের মধ্যে তিস্তা নদীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা। দফায় দফায় বন্যার কবলে তিস্তায় তাদের বসতভিটা বিলীন হয়ে গেছে। একটি বে-সরকারী সংস্থার জপির মতে, তিস্তা নদীর ভাঙ্গনের কারণে গত ১০ বছরে অন্তত ২ লক্ষ পরিবার বসত ভিটা হারিয়েছে। তাদের কেউ বাঁধে, কেউ বা পরিবার নিয়ে জীবন জীবিকার জন্য অন্য স্থানে চলে গেছে। অনেকে বেচে নিয়েছে
ভিক্ষাবৃত্তি।

জানা গেছে, সরকারী হিসেবে জেলায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সংখ্যা ২৩ হাজার ৪ শত ৩৪ টি । ত্রাণ বরাদ্দ এসেছে, ৬ শত ৫০ টন চাল ও নগদ সাড়ে ৯ লক্ষ টাকা। হিসেব বলে, জন প্রতি ১৫ কেজি হিসেবে বরাদ্দকৃর্ত ত্রাণের চাল ৪৩ হাজার ৩ শত ৩৩ টি পরিবারের মাঝে বিতরণ করা সম্ভব। ফলে আপাতত ত্রাণের সংকট নেই বলেই চলে। বন্যার্ত মানুষ গুলোর মাঝে খাবার সংকট না থাকলেও তাদের দুর্ভোগ কমেনি। এক মাত্র বাঁধ তৈরী হলেই তাদের এ দুর্ভোগ কমে যাবে। ফলে অনেকেই ফিরে পাবে তাদের হারিয়ে যাওয়া বসত ভিটা।

হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়নের কিসমত লোহালী এলাকার সহিদুল ইসলাম বলেন, বাপ-দাদার যা সম্পদ ছিলো সবই তিস্তা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। যদি একটি বাঁধ তৈরী করে দেয়া হয়। তাহলে আমরা আমাদের হারিয়ে যাওয়া জমি গুলো ফিরে পাবো। ত্রাণ হিসেবে ১৫ কেজি চাল আর চিড়া-মুড়ি চাই না। ওই ত্রাণের টাকা দিয়ে আমাদের বাঁধ তৈরী করে দিন।

এ দিকে লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বানভাসী মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। বাঁধ ও সড়ক গুলো ভেঙ্গে যাওয়ায় তিস্তা নদীর পানি একটু বাড়লেই সেই পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। মানুষজনের চলাচলের সমস্যাসহ গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যার্ত লোকজনের চিকিৎসা সেবায় মেডিকেল টিম কাজ করলেও গবাদি পশু-পাখির মাঝে বন্যা পরবর্তী বিভিন্ন রোগ দেখা দিয়েছে।

এলাকাগুলোতে প্রাণী সম্পদ বিভাগের লোকজনের দেখা মিলছে না। এ ছাড়া স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙ্গে গেছে। ফলে উন্মুক্ত জায়গায় মলত্যাগ করছে পানিবন্দি লোকজন। নলকূপগুলো বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় সেগুলো ব্যবহারে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পাওয়া যাচ্ছে না।

দেখা গেছে, তিস্তা ও ধরলার চরাঞ্চল ও তীরবর্তী ২০টি ইউনিয়নের বহু রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি এখোনো পানির নীচে রয়েছে। কোথাও কোথাও পাকা ও কাঁচা রাস্তা ভেঙে গেছে ধ্বসে পড়েছে কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচা সড়কের অংশ বিশেষ। ফলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এসব এলাকার

যোগাযোগ। বাঁধের পাশে, রাস্তার ধারে কিংবা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে বন্যা দুর্গত এলাকার অনেকে। এছাড়া বন্ধ হয়ে যায় জেলার অর্ধ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বন্যায় সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাগুলো হলো, সদর উপজেলার মোগলহাট, কুলাঘাট, রাজপুর, খুনিয়াগাছ, আদিতমারী

উপজলার মহিষখোচা, হাতীবান্ধা উপজেলার সিঙ্গিমারী, গড্ডিমারী, সির্ন্দুনা, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী ও সানিয়াজান ইউনিয়ন।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, আমি নিয়মিত বন্যা কবলিত এলাকা ঘুরে দেখেছি। তিস্তা পাড়ের লোকজন ত্রাণ নয়, তারা বাঁধ চায়। তাদের দাবীর সাথে আমরাও একমত। বাধঁ নিমার্ণের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে সরকারগ্রহন করেছেন। আশা রাখছি, খুব তাড়াতাড়ি কাজ শুরু হবে। আমি এ বিষয়ে উচ্চ মহলে যোগাযোগ রাখছি। আর ছোট ছোট বাঁধ গুলোর কাজ ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড শুরু করেছেন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোতাহার হোসেন বলেন, তিস্তা পাড়ের মানুষ দীর্ঘ দিন ধরে বাঁধের দাবী করে আসছে। প্রধানমন্ত্রী এ দাবীর সাথে সহমত পোষণ করছেন। আশা করছি, ডিসেম্বরের মধ্যেই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হবে।