দীর্ঘজীবন পেতে যেসব খাবার খেতে হবে

শুক্রবার, জুলাই ১৯, ২০১৯

প্রতিটি মানুষই অনাদি-অনন্তকাল বেঁচে থাকতে চায়।তবে,অসুস্থ হয়ে অনাদি-অনন্তকাল বেঁচে থাকার চাইতে সুস্থভাবে বেঁচে স্বাভাবিক জীবন নিয়ে বেঁচে থাকাটা অনেক জরুরি।আর,দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের জানতে হবে কোন খাবারগুলো আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। তবে,শুধু পুষ্টিকর খাবার খেলে সুস্থ থাকা বা দীর্ঘজীবী হওয়া সম্ভব নয়। নিয়মিত,শারীরিক পরিশ্রম,পুষ্টিকর খাবার গ্রহন,অতিরিক্ত চিন্তা পরিহার করা,পর্যাপ্ত বিশ্রাম এই ব্যাপার গুলোকে ও সমন্বয় সাধন করতে হবে।
সুস্থ এবং নীরোগ থাকতে হলে নিচের খাবার গুলো নিয়মিত আপনার খাদ্যতালিকায় রাখুন:

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার

যারা দীর্ঘজীবন পেতে চান তাদের উচিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এজন্য গুরুত্বপূর্ণ যে,তারা ফ্রি র‍্যাডিকেল কে নিষ্ক্রিয় করে আমাদের দেহকে বিপদমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। দেহে,অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের অভাব হলে ফ্রি র‍্যাডিকাল আমাদের দেহের কোষকে আক্রমন করে।ফলে নির্দিষ্ট কিছু রোগ যেমন: ক্যান্সার এবং আমাদের বয়স বাড়ার প্রক্রিয়া দ্রুত হয়ে যায়।এজন্য,আমাদের প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমানে বিভিন্ন রঙের শাকসবজি এবং ফলমূল খেতে হবে যেন আমাদের দেহে ফ্রি র‍্যাডিকালকে প্রতিরোধ করার মত অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কোন অভাব না হয়।

বেরি

বেরিতে থাকা পুষ্টি উপাদান আমাদের বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে। পাশাপাশি,ক্যান্সার এবং ব্রেইনের নানা রোগকে প্রতিরোধ করে।সুতরাং,দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে চাইলে সারা বছর বিভিন্ন ধরণের বেরি খাবেন।

অলিভ অয়েল

অলিভ অয়েল হল হেলদি ফ্যাট যাতে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং এন্টি-ইনফ্লামেটরি প্রোপার্টিস।উচ্চ কোলেস্টেরল কমাতে এই তেল বেশ উপকারী। আমাদের, দেশে সাধারণত সয়াবিন তেলে রান্না করা হয়।দীর্ঘমেয়াদে যা স্বাস্থ্যের জন্য ভাল না।সুতরাং,দীর্ঘজীবন পেতে যেন কোলেস্টরেল বাঁধা না হয়ে দাঁড়ায় সেজন্য,অলিভ অয়েল যোগ করুন আপনার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায়।তবে,রান্নায় তেলের পরিমাণ অবশ্যই কম হতে হবে।সারাদিনে মাথাপিছু ৩-৪ চা চামচ তেল যথেষ্ট।
মাছ

অনেকে আছেন যারা,মাছ খেতে চান না।অথচ খাদ্য তালিকায় মাছ না থাকা মানে হল অনেক বড় কিছু মিসিং।মাছকে বলা হয় ব্রেইন ফুড। কারণ হল মাছে থাকা ফ্যাটি এসিড ডিএইচএ বা ডেকোসা হেক্সোনয়িক এসিড এবং ইপিএ বা ইকোসা পেন্টোনয়িক এসিড।এই দুটি ফ্যাটি এসিড এজন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ যে,তারা ব্রেইনকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে যেভাবে তার কাজ করা উচিত।সপ্তাহে মাত্র দুইদিন মাছ খেলে ডিমেনশিয়া হবার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।এছাড়া,তৈলাক্ত মাছে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড,খারাপ কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কমিয়ে দিতে পারে।এছাড়া,ধমনীতে প্লাক বা এথেরোস্কেলরোসিস প্রতিরোধের জন্য ভীষণ কার্যকরী।সুতরাং,সবকিছু ঠিক-ঠাক রাখতে বিভিন্ন রকম মাছ রাখুন খাদ্য তালিকায়।

বিন জাতীয় খাবার

বিন জাতীয় খাবার হল অনেকটা নিউট্রেশন পাওয়ার হাউজের মত। বিনে থাকা ফাইবার আমাদের হজম প্রক্রিয়াকে ভাল রাখতে সাহায্য করে।পাশাপাশি,ওবেসিটি,ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।সপ্তাহে,২-৩ দিন আপনার খাদ্য তালিকায় রাখুন বিন জাতীয় খাবার।

শাকসবজি

শাকসবজি মানেই হল ফাইবার,অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট,ভিটামিন এবং মিনারেলস।অর্থাৎ,শরীরের জন্য দরকারি সব পুষ্টি উপাদান আছে শাকসবজিতে।গাড় সবুজ রঙের শাকসবজিতে রয়েছে ভিটামিন- কে যা হাড়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাজর এবং মিষ্টি আলুতে রয়েছে ভিটামিন-এ যা চোখের সুরক্ষা এবং ইনফেকশন প্রতিরোধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর,প্রতিদিনের২৫-৩৫ গ্রাম ফাইবারের চাহিদা পূরণের জন্য শাকসবজি গ্রহণের বিকল্প নেই।

প্রতিদিন এক মুঠো বাদাম

সুস্থ এবং নীরোগ থাকতে প্রতিদিন কিছুটা হলেও বাদাম খাওয়া উচিত।তবে,এক রকম বাদাম না খেয়ে মিক্স বাদাম খাওয়া ভাল। কারণ,এক এক ধরনের বাদাম এক এক গুনে অনন্য। কাঠ বাদামে রয়েছে প্রোটিন,ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন-ই,ব্রাজিল নাটে রয়েছে ফাইবার এবং সেলেনিয়াম।সারাদিনে মাত্র ২ টি ব্রাজিল বাদামে পূরণ হবে ১০০%আর ডি আই অব সেলেনিয়াম। কাজুবাদামে রয়েছে নন হিম আয়রন,আখরোটে রয়েছে আলফা লিনোলিক এসিড,প্লান্ট ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।বুঝতেই পারছেন বাদাম থেকে একাধারে-ভিটামিন,মিনারেরলস,ফ্যাট,প্রোটিন,অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যাবে।তবে,সারা দিনে ৩০ গ্রামের বেশি বাদাম গ্রহণ নয়।

ডেইরি প্রোডাক্টস

দুধ এবং দুগ্ধজাত পন্য মানেই ভিটামিন-ডি এবং ক্যালসিয়াম। যা আমাদের হাড়ের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।এছাড়া,অন্যান্য পুষ্টি উপাদান তো আছেই। তাই,সুস্থ থাকতে প্রতিদিন দুধ,দই,লাচ্ছি,সপ্তাহে ১-২ দিন কিছুটা পনির,বাটার বা অন্য কোন দুধের তৈরি আইটেম গ্রহণ করা উচিত।

গোটা শস্য

আমাদের খাবার প্লেটের অধিকাংশ জায়গা দখল করে নিয়েছে নানা রকম প্রসেসড ফুড।চাল থেকে শুরু করে আটা,ময়দা এমন কোন খাবার নেই যা বর্তমানে প্রসেস করা হয়না।আর প্রসেস করা খাবার মানেই হল জরুরি পুষ্টি উপাদানের অনুপস্থিতি।তাই,যারা সুস্থ থাকতে চান তাদেরকে অবশ্যয় প্রসেসড ফুডের পরিবর্তে বেঁছে নিতে হবে গোটা শস্য।সাদা ভাত বা রুটির পরিবর্তে চাল চালের ভাত বা লাল আটার রুটি।এছাড়া,শস্য জাতীয় যে খাবারটি খেতে চান সেটা গোটা শস্য বা হোল গ্রেন কি না জেনে বুঝে গ্রহণ করুন। গোটা শস্য দৈনিক খাবারে যোগ করা মানেই হল-ডায়াবেটিস,উচ্চ রক্তচাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য,ডাইভার্টিকুলার ডিজিস সহ আরো অনেক জটিল রোগের ঝুঁকি কমে যাওয়া।

গ্রিকদের মত খেতে হবে

অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে,ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের খাবারের ধরণ কিছুটা ভিন্ন।আর,এই ধরণের খাবার হার্টের জন্য ভালো।গ্রিকদের খাদ্য তালিকাতে শস্য,মাছ,অলিভ অয়েল,শাকসবজিএবং লবণের পরিবর্তে স্বাদের জন্য তারা নানা রকম হার্বস ব্যবহার করে। যা,একাধারে পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু।এই ধরণের খাবার মেমরি ঠিক রাখতে,ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং হৃদরোগের জটিলতা দূর করতে সাহায্য করে।

সুতরাং,মাঝে মাঝে বাঙ্গালিয়ানা খাদ্যাভ্যাস বদলে গ্রীকদের মত খেতে পারেন।স্বাদে ভিন্নতা এবং সুস্থতা উভয়ই অর্জন হবে।

লেখক: পুষ্টিবিদ, বেক্সিমকো ফার্মা লিমিটেড