সহকারী হাই কমিশনারের বিরুদ্ধে ভারতীয় তরুণীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ

শনিবার, জুন ১৫, ২০১৯

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সম্প্রতি এক বাংলাদেশি দূতাবাস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভারতীয় এক তরুণীকে যৌন নির্যাতন করার অভিযোগ সামনে উঠে এসেছে। ভারতের আসামে গুয়াহাটির বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত অবস্থায় অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনার কাজী মুনতাসীর মুর্শেদ দূতাবাসে ডেকে নিয়ে ওই তরুণীর শ্লীলতাহানি করেন বলে অভিযোগে বলা হয়।

দিল্লীর বাংলাদেশ হাই কমিশনার সৈয়দ মুয়াজ্জেম আলীর কাছে গত বছরের ২৫ মার্চ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন আসামের গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ওই তরুণী।

অভিযোগপত্রের সাথে অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনার কাজী মুনতাসীর মুর্শেদের সঙ্গে তার বিভিন্ন সময় হওয়া চ্যাটের স্ক্রিনশটও পাঠান অভিযোগকারী ওই তরুণী। অভিযোগের একটি অনুলিপি তিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পাঠিয়েছেন বলে জানা যায়।

অভিযোগকারী ওই তরুণী জানান, ২০১৮ সালে অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনার কাজী মুনতাসীর মুর্শেদের একটি সাক্ষাৎকার দেখে ইনস্টাগ্রামে তার সাথে যুক্ত হন তিনি। দ্রুতই তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠে এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনার কাজী মুনতাসীর মুর্শেদ নিজেই তাকে ফোন নম্বর দেন। এরপর থেকে তাদের মধ্যে কথাবার্তাও হতে থাকে।

এক পর্যায়ে ২০ জানুয়ারি ফোন করে ওই তরুণীকে দূতাবাসে ডেকে পাঠান মুনতাসীর। সেখানেই মুনতাসীর ওই তরুণীকে ‘জামাকাপড় খুলে ফেলতে এবং তার সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে বাধ্য করেন’ বলে অভিযোগ করেন সেই তরুণী।

ওই তরুণী জানান, সেই ঘটনার কথা প্রকাশ পেলে তার সম্মানহানী করার হুমকিও দেন মুনতাসীর। এছাড়াও বাংলাদেশ দূতাবাসের ভিতরে এই ঘটনা ঘটেছে বলে এটা নিয়ে তিনি ভারতীয় পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে পারবেন না বলেও জানান মুনতাসীর।

তরুণীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লীর বাংলাদেশ হাই কমিশনার সৈয়দ মুয়াজ্জেম আলী ডেপুটি হাই কমিশনার রকিবুল হককে আসামে পাঠান সংগঠিত ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করতে। ২০১৮ সালের ১২ থেকে ১৪ এপ্রিল রকিবুল হক আসামে অভিযোগকারী তরুণী ও অভিযুক্ত

অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনার কাজী মুনতাসীর মুর্শেদের সঙ্গে আলাদাভাবে এবং একসঙ্গে কথা বলেন। তার দেয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে দিল্লীর বাংলাদেশ হাই কমিশনার সৈয়দ মুয়াজ্জেম আলী জানান, অভিযোগকারীর শ্লীলতাহানির অভিযোগের প্রমাণ তদন্তসাপেক্ষ হলেও, এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, ওই নারীর সাথে আলাপচারিতায় কাজী মুনতাসীর মুর্শেদের অস্বচ্ছতা ছিল। গুয়াহাটির মতো স্পর্শকাতর সাব-মিশনের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে কাজী মুনতাসীর মুর্শেদের আরো সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিল বলে মনে করেন দিল্লীর বাংলাদেশ হাই কমিশনার। কাজী মুনতাসীর মুর্শেদের আচরণ দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে বলে মনে করেন তিনি।

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনার কাজী মুনতাসীর মুর্শেদকে আসাম দূতাবাস থেকে সরিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

যদিও অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনার কাজী মুনতাসীর মুর্শেদ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, ওই তরুণীর সাথে তার কথাবার্তা হতো তা সত্যি, কিন্তু ঘটনার দিন ওই তরুণী দূতাবাসে এসে তার সাথে দেখা করেন এবং তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। সে প্রস্তাবে রাজি না হলে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনার হুমকি দেন।

অভিযোগকারী তরুণী তার যথাযথ বিচার পাওয়ার আশা ব্যক্ত করেন। এসময় তিনি ডেপুটি হাই কমিশনার রকিবুল হককে ‘বায়াসড’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, উনি ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, ভারতীয় এই তরুণীই প্রথম নন, কাজী মুনতাসীর মুর্শেদের নারী কেলেংকারীর আরো ইতিহাস আছে। তা জানা সত্ত্বেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু ব্যক্তি তার পক্ষ নিচ্ছেন। একজন নারী নির্যাতনকারীর পক্ষ নিয়ে তারা তাকে বাঁচানোর এবং এসব ঘটনা ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দূতাবাসের মতো জায়গায় এধরনের মানুষ থাকলে তা বিভাগের এবং দেশের সম্মান নষ্ট করে বলে মনে করেন তিনি। এদিকে, এর আগেও অভিযুক্ত কাজী মুনতাসীর মুর্শেদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন তার সাবেক স্ত্রী নাসরীন আক্তার নুপূর। ১০ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল বলে মামলায় অভিযোগ করেন নাসরীন। নাসরীনও মুনতাসীরের বিরুদ্ধে বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও অনৈতিক সম্পর্ক চালিয়ে যাবার অভিযোগ করেছিলেন।

এসময় চার বছরের ছেলেসহ নাসরীনকে তালাক দেন মুনতাসীর। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী লেলিয়ে দিয়ে নাসরীন ও তার পরিবারকে মামলা তুলে নেয়ার হুমকি দেয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সেসময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব পদে কর্মরত মুনতাসীর অবশ্য যৌতুক চাওয়ার কথা অস্বীকার করেছিলেন। প্রথম স্ত্রীর সাথে তালাকের পর কাজী মুনতাসীর মুর্শেদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তাকে বিয়ে করেন।

জানা গেছে, অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনার কাজী মুনতাসীর মুর্শেদের বিরুদ্ধে আনীত যৌন নির্যাতনের অভিযোগটি বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘নারী নিপীড়ন কিংবা যৌন নির্যাতন বিরোধী অভিযোগ কমিটি’র তদন্তাধীন।

৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি অভিযোগের প্রমাণ পেলে অভিযুক্ত কাজী মুনতাসীর মুর্শেদের আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে বলে জানিয়েছে সূত্রটি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই অভিযোগ কমিটির হাতে এরকম আরো যৌন নির্যাতনের কেস রয়েছে বলেও জানা গেছে।