জননেতা জিয়াউর: জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত

বৃহস্পতিবার, মে ৩০, ২০১৯

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান  ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম ও শৈশবে তাঁর ডাক নাম ছিলো কমল। পিতা মনসুর রহমান ও মাতা জাহানারা খাতুন ওরফে রানীর সংসারে পাঁচ ভাইয়ের জিয়াউর রহমান ছিলেন দ্বিতীয়। মনসুর রহমান কলকাতায় একটি সরকারি দফতরে রসায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। জিয়াউর রহমানের শৈশবের কিছুটা সময় বগুড়ার গ্রামে ও কিছুকাল কলকাতা শহরে অতিবাহিত হয়।

ভারত ভাগের পর পিতার কর্মস্থল হয় পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি শহরে। সেই সুবাদে সেখানে চলে যান জিয়া। কলকাতার হেয়ার স্কুল ত্যাগ করেন ভর্তি হন করাচি একাডেমী স্কুলে। ওই স্কুল থেকে ১৯৫২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক পাস করে ১৯৫৩ সালে ভর্তি হন করাচির ডি.জে. কলেজে। ওই বছরই কাবুল মিলিটারি একাডেমীতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন।

১৯৮১ সালের এই দিনে (৩০ মে) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থানরত জিয়াউর রহমান এক ব্যর্থ সেনা অভ্যূত্থানে নিহত হন। রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র সংসদ ভবনের পাশে অবস্থিত চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানকে সমাধিস্থ করা হয়। চন্দ্রিমা উদ্যান অনেকেই কাছে জিয়া উদ্যান নামেও পরিচিত।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক এই রাষ্ট্রপতির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি তুলে ধরা হলো:

১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৫৩ সালে কাবুল মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান। ১৯৫৫ সালে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন প্রাপ্ত হন। সামরিক বাহিনীতে তিনি একজন সুদক্ষ প্যারাট্রুপার ও কমান্ডো হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করেন এবং স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স কোর্সে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। করাচীতে দুই বছর চাকুরি করার পর ১৯৫৭ সালে তিনি ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হয়ে আসেন।

১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন।

১৯৬০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দিনাজপুর শহরের মেয়ে খালেদা খানমের (বেগম খালেদা জিয়া) সঙ্গে জিয়াউর রহমান বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে খেমকারান সেক্টরে তিনি অসীম বীরত্বের পরিচয় দেন। যুদ্ধে দুর্ধর্ষ সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য যেসব কোম্পানি সর্বাধিক বীরত্বসূচক পুরস্কার লাভ করে, জিয়াউর রহমানের কোম্পানি ছিল এদের অন্যতম। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য পাকিস্তান সরকার জিয়াউর রহমানকে হিলাল-ই-জুরাত খেতাবে ভূষিত করে। এছাড়াও জিয়াউর রহমানের ইউনিট এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য দুটি সিতারা-ই-জুরাত এবং নয়টি তামঘা-ই-জুরাত পদক লাভ করে।

১৯৬৬ সালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে পেশাদার ইনস্ট্রাক্টর পদে নিয়োগ লাভ করেন। সে বছরই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটার স্টাফ কলেজে কমান্ড কোর্সে যোগ দেন।

১৯৬৯ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হয়ে জয়দেবপুরে সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদের দায়িত্ব লাভ করেন। এডভান্সড মিলিটারি এন্ড কমান্ড ট্রেনিং কোর্সে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তিনি পশ্চিম জার্মানিতে যান এবং কয়েক মাস ব্রিটিশ আর্মির সাথেও কাজ করেন।

১৯৭০ সালে একজন মেজর হিসেবে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রামে নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদের দায়িত্ব লাভ করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে দেশের সঙ্কটময় মুহূর্তে জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। পূর্ব বাংলার জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবের বন্দিদশায় জিয়াউর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়েই আবারও বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামের দিশা খুঁজে পায়।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে স্বাধীনতাযুদ্ধে অবদানের জন্য ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন।

১৯৭২ সালের জুন মাসে তিনি কর্নেল পদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ-অফ-স্টাফ (উপসেনাপ্রধান) নিযুক্ত হন। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি তিনি ব্রিগেডিয়ার পদে ও ১৯৭৩ সালে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৭৫ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে নির্মমভাবে স্বপরিবারে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই বছরই চিফ অব আর্মি স্টাফ নিযুক্ত হন জিয়াউর রহমান। ওই বছরের ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন এবং নিযুক্ত হন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদে।

১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৬ সালের ৮ মার্চ মহিলা পুলিশ গঠন করেন, ১৯৭৬ সালে কলম্বোতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন সম্মেলনে যোগদান করেন এবং বাংলাদেশ ৭ জাতি গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৭৬ সালেই তিনি উলশি যদুনাথপুর থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন উদ্বোধন করেন এবং ওই বছরের ২৯ নভেম্বর জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। একই বছরের ১৯ নভেম্বর তিনি পুনরায় সেনাবাহিনীর চীফ অফ আর্মি স্টাফ পদে দায়িত্বে প্রত্যাবর্তন করেন। ওই বছরই গঠন করেন গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী।

১৯৭৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি একুশের পদক প্রবর্তন করেন জিয়াউর রহমান। এবং রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত সায়েমের উত্তরসূরি হিসেবে ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন জিয়াউর রহমান দেশে আবার গণতন্ত্রায়ণের উদ্যোগ নেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র চালুর সিদ্ধান্ত নেন। দেশের রাজনীতিতে আবারও গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়।

১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে প্রধান করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন। ছয়টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই নির্বাচনে তিনি ৭৬.৬৭% ভোট পেয়ে বিজয়ী হন এবং রাষ্ট্রপতির পদে নিয়োজিত থাকেন।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। অধ্যাপক এ. কিউ. এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী (বর্তমানে বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি এবং যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান) বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন প্রথম মহাসচিব ছিলেন। জিয়াউর রহমানে নবগঠিত বিএনপিতে বাম, ডান ও মধ্যপন্থিসহ সকল স্তরের রাজনীতিকদের অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টায় রমনা রেস্তোরাঁয় এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যাত্রা শুরু করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সামরিক আইন প্রত্যাহার করেন।

সেনাবাহিনীতে অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন জিয়াউর রহমান। ওই সময়ে অনেক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। ১৯৮১ সালের ২৯ মে তিনি চট্টগ্রামে আসেন এবং সেখানে সার্কিট হাউসে অবস্থান নেন। এর একদিন পরই ৩০ মে ভোরে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। চন্দ্রিমা উদ্যানে তাঁর জানাজায় প্রায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ সমবেত হয়।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, উইকিপিডিয়া