জ্ঞান-বুদ্ধি-অর্থ এবং ক্ষমতার বদহজম!

শনিবার, মে ২৫, ২০১৯

গোলাম মাওলা রনি
বাংলা ভাষা এবং বাঙালির জীবনে বদহজম খুবই সুপরিচিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে জনপ্রিয় শব্দও বটে। বাঙালির স্বভাব ও বদহজমের বৈশিষ্ট্য একে অপরের সাথে আম-দুধের মতো মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। ফলে কোনো বাঙালির শরীর বদহজমজনিত অজীর্ণতা থেকে একেবারে মুক্ত এমন বদনাম কোনো রায় বাহাদুর অথবা খান বাহাদুর উপাধিধারী ডাক্তার-কবিরাজ অথব্য পীর-ফকির-বৈদ্য মহোদয়গণ দিতে পারবেন না। বাঙালির শরীর ছাড়াও তাদের মন-মানসিকতা এবং মস্তিষ্কেরও প্রায়ই বদহজমের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কখনো আবার এজাতীয় পঞ্চইন্দ্রিয়ের কার্যক্রমে অজীর্ণতার প্রভাবে বাহারি বিপত্তি ঘটতে থাকে। লোভ-লালসা-ক্ষুধাজনিত অতি ভোজন, শরীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব এবং মশা-মাছি-তেলাপোকা প্রভৃতি পতঙ্গ সৃষ্ট দূষিতকরণের কারণে বদহজম হওয়া ছাড়াও বাঙালির স্বভাব চরিত্রের কারণেও বদহজমের বিপত্তি ঘটে থাকে।

বদহজমের কারণে প্রকৃতি ও পরিবেশে কী কী বিপত্তি ঘটে, তার বিশদ বিবরণ দিতে গেলে রীতিমতো মহাভারত রচনা করা যাবে। কাজেই আজকের আলোচনায় আমরা সেদিকে না গিয়ে বরং শিরোনাম নিয়ে কার্যক্রম শুরু করি। জ্ঞান-বুদ্ধি-অর্থ এবং ক্ষমতা হলো আল্লাহর দেয়া সর্বোত্তম নেয়ামতগুলোর মধ্যে প্রধানতম, যা কেবল মানুষকেই দেয়া হয়। কোনো বন্যপশু, কীটপতঙ্গ অথবা জিন-পরী-দৈত্যদানব কিংবা শয়তানকে মানুষের মতো জ্ঞান-বুদ্ধি, অর্থ ও ক্ষমতা অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা দেয়া হয় না। কাজেই আল্লাহপ্রদত্ত এ চারটি নেয়ামতের উত্তম কার্যকারণের জন্য মনুষ্য চরিত্রেও কতগুলো উত্তম গুণাবলি থাকা দরকার। মানুষের মধ্যে যদি পর্যাপ্ত গুণাগুণের সমাবেশ না ঘটে এবং সেসব গুণ যদি অনুসরণ ও বাস্তবায়নের জন্য চারিত্রিক দৃঢ়তা না থাকে তবে জ্ঞান-বুদ্ধি-অর্থ এবং ক্ষমতার বদহজম শুরু হয়ে যায়। চরিত্রহীন ও লম্পটের হাতে যদি অর্থ ও ক্ষমতা চলে আসে, তবে তা এমনভাবে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে যার সাথে কোনো বর্জ্যজাত দুর্গন্ধের তুলনা চলে না। এসব কারণে বিদ্যাহীন বুদ্ধিমান অথবা বুদ্ধিহীন বিদ্বান কিংবা চরিত্রহীন বিদ্যাবুদ্ধির মানুষ নিকৃষ্টতায় শয়তান-পশু ও পতঙ্গকে অতিক্রম করে যায়।

জ্ঞান-বুদ্ধি-অর্থ এবং ক্ষমতার মধ্যে জ্ঞানার্জন হলো সবচেয়ে শ্রমসাধ্য এবং জ্ঞানকে সংরক্ষণ করা সত্যিকার অর্থেই কঠিন ও দুঃসাধ্য বিষয়। অন্য দিকে, অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা মানবচরিত্রের সর্বোচ্চ স্তর। ফলে আমাদের সমাজে সঙ্গত কারণেই জ্ঞানীর সংখ্যা যেমন কম, তেমনি জ্ঞানভিত্তিক জীবন যাপন করা লোকের সংখ্যা আরো কম। জ্ঞানীদের মতো না হলেও বুদ্ধিমান লোকের সংখ্যাও কিন্তু খুব বেশি নয়। বুদ্ধি হলো মানুষের একটি মৌলিক গুণ, যা জন্মগতভাবে মানুষ বিধাতার কাছ থেকে পায়। জ্ঞান ছাড়া বুদ্ধির কোনো গুরুত্ব নেই। আবার বুদ্ধি ছাড়া কোনো জ্ঞানই পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। এ কারণে জ্ঞান ও বুদ্ধিকে সাধারণত একে-অপরের পরিপূরক বলা হয়ে থাকে। বুদ্ধি যেমন জ্ঞানকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে, তেমনি বুদ্ধির যদি বদহজম হয় তবে বুদ্ধিমান মানুষ জ্ঞানগরিমা থেকে দূরে থেকে নিজেকে জমিনের জন্য ভয়ঙ্কর বানিয়ে ফেলে। একইভাবে কম বুদ্ধির লোক যদি দৈবক্রমে অধিক জ্ঞানার্জন করে ফেলে, তবে সেই জ্ঞান সংশ্লিষ্ট লোকের মন-মস্তিষ্কে বদহজমের প্রতিক্রিয়া ঘটাতে থাকে।

জ্ঞান-বুদ্ধির মতো অর্থ এবং ক্ষমতাও একে অপরের পরিপূরক। অর্থ ও ক্ষমতার মধ্যে সাধারণত অর্থ উপার্জনের জন্য যে পরিমাণ শ্রম ও জ্ঞান-বুদ্ধি দরকার পড়ে সে তুলনায় ক্ষমতা লাভের জন্য এত কিছু লাগে না। মানুষের রাষ্ট্রক্ষমতা লাভ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বংশগত কারণ, দলীয় বা গোত্রীয় কারণে হয়ে থাকে। কেউ কেউ আবার কোনো দৈবাৎ দুর্ঘটনা, ঘটনা অথবা পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে হঠাৎ করে ক্ষমতা লাভ করে ফেলেন। ফলে বেশির ভাগ মানুষের ক্ষমতা লাভের সাথে বিদ্যা-বুদ্ধি এবং অর্থজাত প্রভাব থাকে না। তবে ক্ষমতা পরিচালনার জন্য বিদ্যা-বুদ্ধি-অর্থ অতীব জরুরি, অত্যাবশ্যক উপকরণ এবং সেগুলো যদি ক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবেই ক্ষমতার মারাত্মক বদহজম শুরু হয়ে যায়। উত্তরাধিকার নীতির কারণে পাগল-শিশু অথবা বিকলাঙ্গ যেমন অনায়াসে ক্ষমতার সিংহাসনে বসতে পারে, তেমনি সেই উত্তরাধিকার নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অযোগ্য ক্ষমতাধরদের ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সর্বগুণে গুণান্বিত মহামানুষের নেতৃত্ব দরকার পড়ে। ক্ষমতাচক্রের একটি নীতিকথা হলো- কোনো অযোগ্য নেতা কখনো অনুরূপ অযোগ্যকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে না। তবে আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে- ইতিহাসে এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে যখন একজন অযোগ্য অথবা নিকৃষ্টতম নেতা দিয়ে যোগ্য এবং উৎকৃষ্টতম নেতার পতন হয়েছে।

জ্ঞান-বুদ্ধি-অর্থ এবং ক্ষমতার বদহজমের কার্যকারণ এবং সেই বদহজম থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় সম্পর্কে আলোচনার আগে আমাদের সমাজের কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরা আবশ্যক। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় অর্থকড়ি এবং টাকা-পয়সাকে সব কিছুর নিয়ামক বলে প্রচার করা হচ্ছে। যারা অর্থকে দ্বিতীয় খোদা অথবা টাকা-পয়সাকে সব সুখ-শান্তি, মান-মর্যাদা পাওয়া বা বেঁচে থাকার একক বলে প্রচার করেন, তারা সবাই অর্থজাত বদহজমের শিকার। অর্থের স্বাভাবিক নিয়ম হলো- এটি মানুষের হাতে এলে মানুষ হালকা অনুভব করে। অর্থের কারণে মানুষের মনে ক্ষণস্থায়ী পুলক সৃষ্টি হয়, যা কালক্রমে দাম্ভিকতায় রূপ নেয়। অর্থ যদি বিনা পরিশ্রমে অথবা অনায়াসে এবং স্বল্পপরিশ্রমে অর্জিত হয় তবে মানুষ বিলাসী, রাগচণ্ডাল ও জেদি হয়ে পড়ে। বিত্ত-বিলাসের কবলে পড়ে এই শ্রেণীর মানুষের বুদ্ধিনাশ ঘটে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চরিত্রহানি হয়ে থাকে। এই শ্রেণীর বিত্তবানেরা এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অনিরাপত্তাজনিত মনোরোগের শিকার হয়ে রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রক্ষমতার পদলেহন করার জন্য উঠেপড়ে লাগে।