দিল্লির মসনদ দখলে দাবার ঘুঁটি যাঁরা

মঙ্গলবার, মে ২১, ২০১৯

ঢাকা: ভারতে সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হবে আগামী বৃহস্পতিবার। বুথফেরত সমীক্ষাগুলো বলছে, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে আবারও দিল্লির মসনদে বসছেন। তবে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কারণ, জরিপের ফল যদি ভুল হয়, তাহলে সরকার গঠন করতে অন্যদের সাহায্য প্রয়োজন হবে মোদির।

সংবিধান অনুসারে ভারতের ৫৪৩টি লোকসভা আসনের মধ্যে কেন্দ্রে সরকার গড়তে হলে যেকোনো দল বা জোটের প্রয়োজন ২৭২টি আসন। এককভাবে নরেন্দ্র মোদি বা যেকোনো দল ২৭২টি আসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলেই তাদের ছুটতে হবে জোট গঠনের দিকে। আর সে ক্ষেত্রে প্রধান হয়ে উঠবে প্রভাবশালী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতারা। তাঁরাই হবেন নতুন সরকার গঠনের মূল দাবার ঘুঁটি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গ ডাকসাইটে ওই সব আঞ্চলিক নেতার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। ২৭২ আসনে জয়লাভ না করলে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে এই নেতাদের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে মূল দলগুলোকে। এই নেতাদের যে কেউই মূল দলগুলোকে সমর্থন বা প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে বদলে দিতে পারেন পুরো দাবা খেলার  ছক।

নবীন পটনায়েক

দিল্লিতে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বিজেপি বা ন্যাশনাল কংগ্রেসের জন্য অন্যতম প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠতে পারেন ওডিশা রাজ্যের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল বিজু জনতা দলের (বিজেডি) কর্তাব্যক্তি নবীন পাটনায়েক। মোদি সরকারের প্রথম শাসনামলে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ ১৮ জন সাংসদ নিয়ে পার্লামেন্টে হাজির ছিল বিজেডি। দলটি ছিল পার্লামেন্টের পঞ্চম বৃহত্তম শক্তি। বুথফেরত জরিপ বলছে, এবারের লোকসভা নির্বাচনে দুই থেকে ১৫টি আসন পেতে যাচ্ছে পাটনায়কের দল।  নিম্নকক্ষে এ রাজ্যের মোট আসন ২১টি।

পাটনায়েকের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারে বেশ যত্নশীল মোদি। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবিলায় এ নেতার ভূমিকার বিশেষ প্রশংসাও করেন প্রধানমন্ত্রী।

মায়াবতী

নতুন সরকার নির্ধারণে বড়সড় ভূমিকা রাখতে পারেন উত্তরপ্রদেশের বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) নেত্রী মায়াবতী। জনসংখ্যার দিক থেকে ভারতের এক-পঞ্চমাংশ জনগোষ্ঠী দলিত ও নিম্নবর্ণের প্রতিনিধিত্ব করে দলটি। এরই মাঝে বিএসপি রাজ্যের অন্য প্রভাবশালী দল সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও রাষ্ট্রীয় লোকদলের সঙ্গে (আরএলডি) এক হয়ে বিজেপিবিরোধী জোট গঠন করেছেন মায়াবতী।

লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের মোট আসন সংখ্যা ৮০টি। বুথফেরত সমীক্ষা বলছে, বিএসপি-এসপি-আরএলডি জোট ২০ থেকে ৪৫টি আসন পেতে পারে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

নয়াদিল্লিতে বিজেপিবিরোধী সরকার গঠনে অন্যতম প্রধান নির্ধারক হতে পারেন পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিম্নকক্ষে পশ্চিমবঙ্গের আসন সংখ্যা ৪২টি। গত নির্বাচনে এর মধ্যে ৩৩টি আসন পেয়ে সংসদের চতুর্থ বৃহত্তম দল হিসেবে হাজির হয় তৃণমূল।  বুথফেরত সমীক্ষা বলছে, এবারের নির্বাচনে আসন সংখ্যা কমে তৃণমূল ২৪ থেকে ২৯টি পেতে পারে। যদিও এসবকে বুজরুকি গল্প বলে উড়িয়ে দিয়েছেন মমতা। কংগ্রেসের পর তৃণমূলই বিজেপির প্রধান বিরোধী।

জগন মোহন রেড্ডি

অন্ধ্রপ্রদেশের জগন মোহন রেড্ডির দল ওয়াইএসআর কংগ্রেস রাজ্যের আরেক প্রধান দল মোদির সাবেক মিত্র চন্দ্রবাবু নাইডুর চেয়েও এবারের নির্বাচনে বেশি আসন পেতে পারে এমন খবরে এরই মধ্যে বিজেপি ও কংগ্রেস তাঁর সমর্থন পাওয়ার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।

এনডিটিভি জানাচ্ছে, আগামী বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে বিরোধীদলীয় নেতাদের এক বৈঠকে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে জগন মোহনকে সম্মত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কংগ্রেস।

অন্যদিকে অন্ধ্রপ্রদেশকে ‘বিশেষ সুবিধা’ দেওয়ার প্রশ্নে জগন মোহনের দাবি-দাওয়া মেনে নিতে বিজেপি প্রস্তুত বলেও বার্তা পৌঁছানো হচ্ছে। লোকসভায় অন্ধ্রপ্রদেশের আসন সংখ্যা ২৫। বুথফেরত সমীক্ষা বলছে, রেড্ডির দল এর মাঝে ২০টি পর্যন্ত আসন পেতে পারে।

এম. কে. স্টালিন

তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক দল দ্রাবিড় মুনেত্র কাঝাঘামের (ডিএমকে) প্রধান এম. কে. স্টালিন হতে পারেন সরকার গঠনের অন্যতম চাবিকাঠি। প্রকাশ্যে তিনি কংগ্রেসকে সমর্থন জানিয়েছেন। কিন্তু স্থানীয় বিজেপি নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে স্টালিন তাঁদের সঙ্গেই ছিলেন। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ৬৬ বছর বয়সী এই নেতা।

বুথফেরত সমীক্ষা বলছে, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করা স্টালিনের দল রাজ্যের ৩৯ আসনের মধ্যে ২৭টি আসনে জয়লাভ করার ক্ষমতা আছে দলটির।

কলভাকুন্তলা চন্দ্রশেখর রাও

ভারতের নবীনতম প্রদেশ তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাও বিজেপি ও কংগ্রেসের বাইরের দলগুলো নিয়ে সরকার গঠনের ব্যাপারে আগ্রহী বলে নানা মাধ্যমে প্রকাশ। পঁয়ষট্টি বছর বয়সী এই রাজনীতিক তামিলনাড়ুর স্টালিনের সঙ্গে জোট বাঁধার চেষ্টা করছেন। তবে মোটাদাগে চন্দ্রশেখরের সমর্থন তুলনামূলকভাবে বিজেপির দিকেই থাকবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। লোকসভায় এ রাজ্যের আসন ১৭টি। গত নির্বাচনে এর মধ্যে ১০টি আসন পেলেও বুথফেরত সমীক্ষামতে এবারে তা বেড়ে ১৩টি পর্যন্ত হতে পারে

অখিলেশ যাদব

ভারতের নতুন সরকার গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন উত্তরপ্রদেশের আরেক নেতা অখিলেশ যাদব। যদিও গতবার তাঁর দল সমাজবাদী পার্টি সাতটি আসন নিয়ে লোকসভায় যায়, এবার রাজ্যের বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেত্রী মায়াবতীর সঙ্গে জোট তাঁকে আরও প্রভাবশালী হিসেবে হাজির করতে পারে। উত্তরপ্রদেশেই লোকসভার আসন সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। অখিলেশ-মায়াবতী জোট বিজেপিবিরোধী অবস্থানে আছে।