আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান, চলছে ডাটাবেজ তৈরির কাজ

শনিবার, মে ১৮, ২০১৯

ঢাকা: আওয়ামী লীগের চলমান সাংগঠনিক সফরে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে দলে অনুপ্রবেশকারী ও সুবিধাবাদীদের ছেঁটে ফেলার বিষয়টি। একই সঙ্গে চলছে দলীয় নেতা-কর্মীদের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির কাজ। এই ডাটাবেজ তৈরির মাধ্যমে দলে অনুপ্রবেশকারী রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরেই দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের অভিযোগ- অনুপ্রবেশকারীরা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। তাদের কারণে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এ সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই দল থেকে অনুপ্রবেশকারীদের ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, সারা দেশে বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের বর্ধিতসভার মধ্য দিয়েই চলছে দলের নেতা-কর্মীদের ডাটাবেজ তৈরির কাজ।

আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ বলছেন, ডাটাবেজ তৈরির মাধ্যমে দলের অনুপ্রবেশকারীদের ছেঁটে ফেলা সম্ভব হবে। এ ডাটাবেজ করার সময়ই অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা তৈরি করা হবে। পরে ওই তালিকার ভিত্তিতে অনুপ্রবেশকারীদের দল ও সংগঠনের সব পদ থেকে বাদ দেয়া হবে। একই সঙ্গে তাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং জনপ্রিয়, ত্যাগী ও সৎ নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হবে। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব নীতিগত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গত ১১ মে (শনিবার) চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়িতে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর জেলা, দক্ষিণ জেলা, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় তথ্যমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেন, সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের ধীরে ধীরে বের করে দিতে হবে। পরপর তিনবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার কারণে সংগঠনের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছে। অনেক সুবিধাবাদীরাও সংগঠনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।

এদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ জানিয়েছেন, দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকেও নিজ নিজ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ডাটাবেজ তৈরি করতে বলা হয়েছে।

চলতি বছরে অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের প্রস্তুতি ও দলকে অনুপ্রবেশকারী মুক্ত করতে এরইমধ্যে জেলায় জেলায় সাংগঠনিক সফর শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে আটটি বিভাগীয় টিম গত ১১ মে (শনিবার) থেকে কার্যক্রম শুরু করেছে।

আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, আসন্ন জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে একটি কাউন্সিলর তালিকা প্রস্তুত করে বর্ধিতসভা হচ্ছে। দলীয় এই সাংগঠনিক সফরের মধ্য দিয়ে দলের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কমিটির সকল সদস্যদের মোবাইলে ফোন নম্বরসহ ঠিকানা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

দলীয় সূত্র মতে, সাংগঠনিক সফরের প্রথম দফায় ৯ সদস্যের টিম গত ১১ মে (শনিবার) থেকে শুরু করে আগামী ২১ মে (মঙ্গলবার) পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় সফর করবে।

সফরে বর্ধিত সভার পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক হবে কেন্দ্রীয় নেতাদের।

খুলনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূল থেকে জেলা পর্যন্ত দলকে সাংগঠনিকভাবে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতে বিভাগের জেলাগুলোতে সাংগঠনিক সফর করছেন। তারা শনিবার (১৮ মে) খুলনা মহানগর, রোববার (১৯ মে) খুলনা জেলা, সোমবার (২০ মে) বাগেরহাট ও মঙ্গলবার (২১ মে) ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিতসভায় অংশ নেবেন।

চুয়াডাঙ্গা জেলা সফরের মধ্য দিয়ে এ সাংগঠনিক সফর শুরু হয়। যে সব জেলায় দীর্ঘদিন দলের সম্মেলন হয় না, সে সব জেলাকে প্রাধান্য দিয়ে সাজানো হয়েছে সফরসূচি।

আওয়ামী লীগের ৮টি বিভাগীয় টিমের লক্ষ্য সারা দেশের বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর সম্মেলন করা, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন এবং বিএনপি-জামাতসহ অন্যান্য দল থেকে দলে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। তবে অন্য দল থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া অনেক নেতার বিষয়ে এরইমধ্যে তদন্ত শুরু করে দিয়েছে দল। কারো কারো বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হলেও কোনো না কোনোভাবে শাস্তির আওতায় আসবেন অনুপ্রবেশকারীরা। তৃণমূল পর্যায় থেকে দলের নেতা-কর্মীদের তথ্যভাণ্ডার তৈরিতেও কাজ চলছে।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, ঈদের পর অনুপ্রবেশকারীদের দল থেকে ছাঁটাইয়ের অভিযান পুরোদমে শুরু হবে। ঈদের পর শুদ্ধি অভিযান শুরু হলেও দলের আসন্ন জাতীয় সম্মেলনের আগেই অভিযান শেষ করার পরিকল্পনা করছেন নেতারা।

আওয়ামী লীগের সভাপতি, বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী দলকে চাঙ্গা করতে চলতি বছরের অক্টোবরেই জাতীয় সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। অক্টোবরে শেষ হচ্ছে আওয়ামী লীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ।

আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা জানান, টানা ১০ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকায় দলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ-বিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-বিরোধী কেউ কেউ দলে ঢুকে পড়েছেন। যারা বিভিন্ন সময়ে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। অনেক সুবিধাবাদী দলে ঢুকেছে আর এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও কথা শীর্ষ নেতারা বারবার বলছেন। অনুপ্রবেশকারীদের যারা দলে জায়গা করে দিয়েছেন, সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে তাদের বিরুদ্ধেও। পাশাপাশি দায়িত্বশীল কেউ জামায়াতিদের সঙ্গে আঁতাত করেছেন বলে প্রমাণ হলে তার বা তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। দলে এসে ঠাঁই নিলেও সাবেক জামায়াতির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জানা গেছে, সম্প্রতি ফেনীতে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির অগ্নিদগ্ধে হত্যার ঘটনায় সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির নাম উঠে আসে। হত্যার ঘটনার সন্দেহভাজন আরও কয়েকজনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা থাকা নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়। দেশের আরও কয়েকটি এলাকায় আওয়ামী লীগের লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে আসে। এ সব ঘটনা সরকার ও আওয়ামী লীগকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। তাই দলে শুদ্ধি অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সে সময় রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেছিলেন, ‘‘বিএনপি-জামায়াত থেকেও ভয়ঙ্কর নব্য আওয়ামী লীগ। এরা সুযোগসন্ধানী। এদের চিনে রাখতে হবে। যাদের কখনও সভা-সমাবেশে দেখিনি তারাও এখন আওয়ামী লীগ করে। এদের থেকে সাবধান ও সতর্ক থাকতে হবে।’’

একইভাবে দলে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার তাগিদ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। সম্প্রতি তিনি এক আলোচনা সভায় বলেন, ‘‘দলে অনুপ্রবেশকারীরা বিশৃঙ্খলা ঘটায়। এদের চিহ্নিত করতে হবে।’’

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, অপরাধী-নাশকতা মামলার আসামিসহ অনেকেই আওয়ামী লীগে যোগ দেয় নিজেদের পিঠ বাঁচাতে। তবে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড সতর্ক থাকলে অনুপ্রবেশকারীদের দ্রুত খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।