হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি: রাজধানীসহ সারাদেশে ৯ জনের প্রাণহানি

শুক্রবার, মে ১৭, ২০১৯

ঢাকা: সারাদেশে ঝড় ও বজ্রপাতে নয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকায় ঝড়ের কবলে পড়ে চারজনের মৃত্যু হয়। শুক্রবার (১৭ মে) সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানীতে ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি শুরু হয়।

হঠাৎ ঝড় শুরু হলে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের জন্য করা প্যান্ডেল ভেঙে পড়ে। এতে আটকা পড়েন প্রায় অর্ধশত মুসল্লি। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট ঘটনাস্থলে উদ্ধার কাজ শুরু করে। এ ঘটনায় আহত ২৭ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজনকে মৃত ঘোষণা করেন জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক। মৃত ব্যক্তি হলেন, শফিকুল ইসলাম (৪৭)। তার বাবার নাম মৃত জনাব আলী।

শফিকুলের শ্যালক সাইফুল ইসলাম জানান, তারা রাজধানীর কদমতলী পোস্তগোলা এলাকার একটি টায়ার কারখানায় কাজ করেন এবং সেখানেই থাকেন। এদিন তারা বায়তুল মোকাররম মসজিদে ইফতার শেষে মাগরিবের নামাজে দাঁড়ান। সে সময় ঝড় শুরু হলে প্যান্ডেলটি ভেঙে পড়ে। এতে তারা দুজনই আহত হন।

আহতরা হলেন, পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শরিফুল(৩০), হেলাল(৪৫), জহিরুল,(২৩) বিপ্লব (২৭) আব্দুর রহমান (২০), বিলাশ(১৭), মনিরুল (২০), সবুজ (৩০),শাকিল (১৯), আওয়াল (৩০), জহির (১৮), বাবুল (২৪), আরিফুল (২৫), শরিফুল (২৮), আকাশ (২৮), হেলাল (২৮), ইব্রাহিম (২৫), মজিদ (৪৫), জালাল (৫০), সিরাজ (৪৫), রুবেল(২৯), মাসুদ (২৮), আফজাল (৫৮), হৃদয় (১৮), তারেক (৩৫), আলামিন (১৯) ও জানে আলম(২২)।

ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন মো. আলাউদ্দিন জানান, এ দুর্ঘটনায় এক জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকিদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের কারো অবস্থা আশঙ্কাজনক নয়।

পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হক জানান, বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটে একটা অস্থায়ী প্যান্ডেল তৈরি করা হয়েছিল। ঝড়ো সেটি ভেঙে পড়লে আটকা পড়েন প্রায় ৫০ জন মুসল্লি। এদের মধ্যে ১৯ জনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। উদ্ধার কাজ চালাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

এদিকে বায়তুল মোকাররম মসজিদে আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছেন ধর্মমন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনিসুর রহমান ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সচিব কাজী নুরুল ইসলাম। আনিসুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, প্রতি বছরই রমজান মাসে মুসল্লিরা যেন জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারে, সেই জন্য প্যান্ডেল করা হয়। আজকের এই ঘটনা খুবই দুঃখজনক। নিহত ব্যক্তির দাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।

বাড্ডায় দেয়াল চাপায় তিন জনের মৃত্যু
রাজধানীর বাড্ডা এলাকার প্রগতি সরণিতে দেয়াল চাপা পড়ে বুলবুল বিশ্বাস (২৪) ও আনুমানিক ২৮ বছর বয়সী অজ্ঞাত পরিচয় এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। বুলবুলের সহকর্মী মামুন শেখ জানান, ইফতারের পরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের করপোরেট অফিসের গাড়ি পাকিংয়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বুলবুল। হঠাৎ ঝড় শুরু হলে পাকিংয়ের দেয়াল ধসে পড়ে। সে সময় চাপা পড়ে বুলবুল ও এক পথচারীর মৃত্যু হয়।

মামুন শেখ গাবতলী- ডেমরা স্টাফ কোয়াটার রুটে চলাচল করা নূর- এ মক্কা পরিবহন বাসের ওয়ে বিল চেকার। বুলবুলের মামা রাজিব হোসেন জানান, অছিম পরিবহনের ওয়ে বিল চেকার হিসেবে খণ্ডকালীন চাকরি করতেন বুলবুল। তিনি আরও জানান, বুলবুল সরকারি বাঙলা কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র।

বাড্ডা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গোলাম মোস্তফা দুইজনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তিনি জানিয়েছেন, ওই ঘটনায় আহত আরেক যুবক জাতীয় অর্থোপেডিক ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুস সোবহান সরকার (৬৫) ঝড়ের কবলে পড়ে মারা গেছেন।

পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিল আহমেদ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঝড়ের সময় আব্দুস সোবহান মুড়ির আড়তে বসেছিলেন। একটি ইট তার মাথায় এসে পড়লে গুরুতর আহত হন তিনি। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে পাশেই একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ফসলের মাঠে বজ্রপাতে চার শ্রমিকের মৃত্যু
ধান কাটার সময় বজ্রপাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় চার শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এদিন বিকেলে চাঁপাই সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামে ধানকাটার সময় মারা যান মোশাররফ হোসেন (৩৫) ও রেজাবুল হক (৪০)। তাদের দু’জনের বাড়ি শ্রীরামপুর গ্রামে। মোশাররফের বাবার নাম মোতালেব হোসেন এবং রেজাবুলের বাবার নাম মৃত হযরত আলী।

বালিয়াডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলাম জানান, শ্রীরামপুর এলাকায় কয়েকজন শ্রমিক জমিতে ধান কাটছিলো। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে হটাৎ করে ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়। এসময় বজ্রপাতে ঘটনাস্থলে শ্রমিক মোশাররফ হোসেন ও রেজাবুল হক মারা যায়। এছাড়া হজরত আলী নামে আরও একজন আহত হয়েছেন। তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

অন্যদিকে নওগাঁর পোরশা উপজেলার গানোইর বিলে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে হাসান (৩০) ও শফিনূর (২৮) নামে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১৭ মে) বিকেলে সোয়া ৫টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

মৃত হাসান পোরশা উপজেলার গানোইর গ্রামের মতিউর রহমানের ছেলে এবং শফিনুর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বিটলীটোলা গ্রামের আজাদ হোসেনের ছেলে।

পোরশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুর রহমান তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, বিকেলে মাঠে অন্যান্য শ্রমিকদের সঙ্গে হাসান ও শফিনুর ধান কাট ছিলেন। এ সময় হঠাৎ ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়। ঝড় বৃষ্টির সময় বজ্রপাতে একই সঙ্গে তাদের দুজনের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর পুলিশ হাসান ও শফিনূরের মৃতদেহ উদ্ধার করে।

ঠাকুরগাঁয়ে ঝড়ে ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড
এর আগে ঝড়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় একটি গ্রামের শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। শুক্রবার সকালে উপজেলার শুকানপুকুরী ইউনিয়নের বাংরোড গ্রামের ওপর দিয়ে এ ঝড় বয়ে। চার থেকে পাঁচ মিনিটের ওই ঝড়ে ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। ঝড়ে উপড়ে পড়েছে গ্রামের অসংখ্য গাছপালা; বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বিদ্যুৎসংযোগ। নষ্ট হয়েছে বিভিন্ন ফসল।

ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মনিরুল ইসলাম জানান, হঠাৎ করেই প্রচণ্ড বেগে ঝড় শুরু হয়। ঝড়টি মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়। এতে ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।

এর আগে আবহাওয়া অধিদফতর তাদের সতর্ক বার্তায় জানিয়েছিল। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। একইসঙ্গে আগামী তিনদিন বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও জানায় সংস্থাটি।

এদিকে হঠাৎ করে বৈরী আবহাওয়ার কারণে বিকেল থেকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে সাময়িকভাবে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান জানান, সন্ধ্যা ৭টার রাজধানীতে বয়ে যাওয়া ঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬৫ কি.মি.। ঝড়টির স্থায়ীত্ব ছিল প্রায় ৫ মিনিটের মতো।

তিনি আরও জানান, রাজধানীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের গতিবেগ বেশী ছিল বিমানবন্দর এলাকায়। সেখানে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৯৩ কি. মি.।