টেন্ডার জালিয়াতির বিজ্ঞাপন কৌশল

রবিবার, মে ১২, ২০১৯

ঢাকা: একটি জাতীয় দৈনিক। তাতে বিজ্ঞাপন আকারে ছাপানো হয়েছে একটি টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি। বিষয় : সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে জনবল নিয়োগ। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চতুর্থ শ্রেণির বেশ কয়েকটি পদে ৪৬৩ জন নিয়োগ করা হবে। একে সরকারি দপ্তরে নিয়োগ, তদুপরি এত সংখ্যক লোক! স্বভাবতই নড়েচড়ে বসলেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।

কিন্তু টেন্ডারবাজির ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় যে ঘটনা ঘটে, এখানেও তা-ই ঘটল। কিছু ঠিকাদার, যাদের ‘বিশেষ যোগাযোগ’ রয়েছে দপ্তরের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে, শুধু তারা টেন্ডার ক্রয় করে, ক্ষেত্রবিশেষে থানাপুলিশের সহায়তা নিয়ে শেষ পর্যন্ত সেটি জমা দিতেও সক্ষম হলেন।

কিন্তু কিছু ঠিকাদার খুবই বিস্মিত হলেন, যখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়ে দেখলেন, বিধি অনুযায়ী টেন্ডারের জন্য নির্ধারিত কোনো মূল্য ধার্য করা হয়নি। এর পর উৎসুক ঠিকাদারদের কেউ কেউ জানতে চাইলেন, কোন দৈনিকে কবে দরপত্রের বিজ্ঞাপনটি ছাপা হয়েছিল। দপ্তর থেকে দৈনিকের নাম, তারিখ ইত্যাদি জানানো হলো এবং দৈনিক থেকে কাটিং করা হয়েছে এমন একটি দরপত্র দেখানো হলো।

সেই দিনক্ষণ ধরে সেই দৈনিকে গিয়ে ঠিকাদাররা জানতে পারলেন, সেদিনের দৈনিকে এমন কোনো দরপত্রই ছাপা হয়নি। এর পর একে একে যেসব তথ্য বেরিয়ে এলো তা রীতিমতো বিস্ময়কর। টেন্ডার আহ্বান, জমাদান, এর বিপরীতে সিকিউরিটি বাবদ জমাকৃত অর্থ, টেন্ডার কমিটি ও তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রমÑ এসব প্রক্রিয়ার প্রায় পুরোটাই স্রেফ জালিয়াতি।

প্রায় দশ কোটি টাকার গায়েবি এ দরপত্র এবং এর গায়েবি কার্যক্রমের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজেদের আখের গোছাতে তৎপর হয়েছিলেন। অনেকটা উৎরেও গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু উৎসুক কিছু ঠিকাদারের কারণে তীরের কাছাকাছি পৌঁছে সম্ভবত ডুবতে যাচ্ছে তাদের তরী। আর এহেন নজিরবিহীন বেআইনি কা- ঘটেছে খোদ আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন অধিদপ্তরে (আইন ও বিচার)।

এ যেন প্রদীপের নিচেই অন্ধকার! এমন বিস্ময়কর অনিয়মের বিষয়াদি উল্লেখ করে গত মঙ্গলবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটে (সিপিটিইউÑবাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ) অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) ইতোমধ্যেই লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে আমাদের সময়ের সঙ্গে কথা হয় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (আইজিআর) খান মো. আবদুল মান্নানের সঙ্গে। তিনিও স্বীকার করেন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগে টেন্ডার জালিয়াতির বিষয়ে অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি। বলেন, আমরা খতিয়ে দেখছি।

অভিযোগের সত্যতা পেলে টেন্ডারটি বাতিল তো করা হবেই, দায়ী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, দপ্তর থেকে স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তারা চাউর করেছেন যে, ঝাড়–দার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে ১০০ জনকে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে নিয়োগের বিষয়ে ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর দৈনিক সংবাদে বিজ্ঞাপন আকারে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

কিন্তু নিবন্ধন অধিদপ্তরের সেসব কর্মকর্তার দেওয়া তারিখ অনুযায়ী দৈনিক সংবাদে সেদিন এমন কোনো টেন্ডারই ছাপা হয়নি। গায়েবি ওই বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে নিবন্ধন অধিদপ্তরের স্মারক নম্বর-১৪৮৬১ (২); আর স্বাক্ষর রয়েছে আইআরও (চট্টগ্রাম বিভাগ) নৃপেন্দ্র নাথ সিকদারের। দপ্তরে কাটিং করে রাখা দৈনিকে ছাপানো যে বিজ্ঞাপনটি রয়েছে, তাতে নির্ধারিত বয়সের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছেÑ ১৮ বছর থেকে অনধিক ৬০ বছর; বেতন ১৪ হাজার ৪৫০ থেকে শুরু করে ১৫ হাজার ৫৫০ টাকা, শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস। এ দরপত্র দাখিলের সময় ২০১৮ সালের ২৯ নভেম্বর দুপুর একটা পর্যন্ত। এই একটি সার্কুলার ভুয়াভাবে তৈরি করা হলেও একই স্মারক নম্বরে- (১৪৮৬১(২)) আরও ৩টি স্মারক নম্বর তৈরি করে নম্বরের পাশের বন্ধনীতে ১, ৩, ৪, ৫ যুক্ত করে চক্রটিÑ ১৪৮৬১ (১) নম্বর স্মারকে নিরাপত্তা/নৈশপ্রহরী ৬৩ জন; ১৪৮৬১ (৩) নম্বর স্মারকে ঝাড়–দার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১০০ জন; ১৪৮৬১ (৪) নম্বর স্মারকে ঝাড়–দার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১০০ জন; ১৪৮৬১ (৫) নম্বর স্মারকেও ঝাড়–দার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১০০ জন। অথচ ওই তারিখে (২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর) এই তিন সার্কুলারের বিষয়ে দৈনিক সংবাদে কোনো বিজ্ঞাপনই প্রকাশ হয়নি।

এদিকে এ টেন্ডারের বিষয়ে অফিসে যোগাযোগ করলে টেন্ডার আহ্বায়ক আইআরও (চট্টগ্রাম বিভাগ) নৃপেন্দ্রনাথ সিকদারের সহযোগিতায় দরপত্রের মূল্য ছাড়াই ঠিকাদারদের দরপত্র প্রদান করা হয়। জানা গেছে, চরম এ জালিয়াতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ৪ কর্মকর্তা জড়িত। টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্র খুলে দরপত্রের কমিশন/সার্ভিস চার্জ পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়েছে তাদের যোগসাজশে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই চার কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে থলে থেকে আরও বিস্ময়কর তথ্য বেরিয়ে আসবে, যাতে উঠে আসবে আরও অনেকের নামও। ঠিকাদারদের অভিযোগনামা ‘নিবন্ধন অধিদপ্তর, আইন ও বিচার বিভাগ আউটসোর্সিং দরপত্র স্মারক নম্বরÑ১৪৮৬১ (১), ১৪৮৬১ (২) ১৪৮৬১ (৩) ১৪৮৬১ (৪) ১৪৮৬১ (৫)’ গ্রহণকৃত দরপত্রের প্রদানকৃত এনওএ, কার্যাদেশ, চুক্তি বাতিল করার বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটে ঠিকাদার কামাল হোসেন লিখিত অভিযোগ করেন গত ৭ মে।

অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেনÑ জনবল সরবরাহের গোপনীয়ভাবে গ্রহণকৃত দরপত্রেÑ সিপিটিইউর পিএসএন ও আদর্শ দরপত্র দলিলের কোনো কিছুই অনুসরণ করা হয়নি। টেন্ডার কমিটির সভাপতি ও অন্য সদস্যরা বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করে ওই ভুয়া দরপত্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে এ এম এন্টারপ্রাইজ, স্টেট সার্ভিসেস (প্রা.) লিঃ, নর্থ বেঙ্গল সিকিউরিটি সার্ভিসেস প্রা. লি. ও আসিফ ট্রেডার্সকে অভিপ্রায়পত্র (এনওএ) কার্যাদেশ দেয়। এই জালিয়াতির সঙ্গে দরপত্রের মূল্যায়ন কমিটির সকল সদস্যসহ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জড়িত।

ঘুষের বিনিময়ে গ্রহণ কার্যাদেশের চুক্তি বাতিল করাসহ ঘটনায় জড়িত সকলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান ঠিকাদার কামাল হোসেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল শনিবার এই টেন্ডার আহ্বায়ক ঢাকার নিবন্ধন অধিদপ্তরের আই.আর.ও (চট্টগ্রাম বিভাগ) নৃপেন্দ্রনাথ সিকদারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ওপাশ থেকে সাড়া দেননি তিনি।