‘মাঝে মাঝে সুইসাইড করতে ইচ্ছে করে,’ বেরোবির সেশনজট নিয়ে শিক্ষার্থীর স্ট্যাটাস

শুক্রবার, মে ১০, ২০১৯

বেরোবি: বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১১ বছরেও সেশনজটের কবল থেকে মুক্তি পায়নি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি ২১টি বিভাগের মধ্যে কিছু বিভাগ নিজ প্রচেষ্টায় সেশনজট কমিয়ে আনলেও বেশিরভাগ বিভাগেই সেশনজট জটলা দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে, শিক্ষার্থীদের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে।

অনেকেই এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা তুলে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। সম্প্রতি সেশনজট কমানোর দাবি জানিয়ে পর্যাপ্ত নিয়োগের ব্যবস্থার করার দাবিতে শিক্ষক সমিতি ও সাধারণ শিক্ষার্থী পরিষদ ভিসি বরাবর স্মারকলিপি দিলেও দৃশ্যমান কিছুই পরিবর্তন হয়নি।

সেশনজটের জটলায় আটকে থাকা উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা আব্দুল মোমিন গতকাল রাতে সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আত্মহত্যা করার কথা তুলে ধরেছেন। যা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রুপে গ্রুপে ভাইরাল হয়ে পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ বিভাগের যেসব বিভাগে সেশনজট রয়েছে তাদের মধ্যে উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্ট্যাডিজ বিভাগসহ কলা অনুষদে বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, লোকপ্রশাসন, বিজ্ঞান অনুষদে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত। এছাড়াও কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ সেশনজটের জটলা অন্যতম। ওইসব বিভাগের প্রত্যেকটি ব্যাচই দুই থেকে ৩ বছরে সেশনজটে পড়েছে। তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সব থেকে হতভাগাা ২০১১-১২, ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫ এবং ২০১৫-১৬ সেশনে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা। এসব বিভাগগুলোতে ভর্তি হওয়ার সাড়ে ৫ থেকে ৬ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনও তাদের অনার্স শেষ হয়নি। এমনকি কবে শেষ হবে তারও নির্ধারিত সময় জানা নেই শিক্ষার্থীদের। অথচ ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া অর্থনীতি, মার্কেটিং, ফিনান্স, ম্যানেজমেন্ট, একাউন্টিং, পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স শেষ হয়েছে। আর অন্য কয়েকটি বিভাগে মাস্টার্স শেষের দিকে।

উপাচার্যের ক্যাম্পাসে না থাকা, শিক্ষক স্বল্পতা, শ্রেণী কক্ষ সংকট, শিক্ষকদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, সমন্বয়হীনতা, শিক্ষকদের আদর্শিক দ্বন্দ্ব, দায়িত্বহীনতা, জবাবদিহিতা না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে সেশনজট দীর্ঘ হচ্ছে বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের । অতি দ্রুত এসব সমস্যা সমাধান করা না হলে মুখ থুবড়ে পরতে পারে উত্তরাঞ্চলের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠের পড়াশুনা।

এদিকে, সেশনজটকে কেন্দ্র করে নিয়মিতই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরছেন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। গতকাল তেমনি ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন আব্দুল মোমিন। আব্দুল মোমিন সিরাজগঞ্জ জেলার নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের একজন সন্তান। বর্তমানে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার পিতা অসুস্থতার সাথে লড়াই করছেন। তার মাও ভুগছেন জটিল সব রোগে। এমতাবস্থায় পরিবারের জন্য কিছুই করতে না পারার যন্ত্রণা তাড়া করছে মোমিনকে।

আব্দুল মোমিন লিখেছেন:

“মাঝে মাঝে খুব সুইসাইড করতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ভয় আর কাফের হয়ে মরে যাওয়ার ভয়ে আর কিছু করা হয় না। এমন একটা সময়ে উপনিত, এখন আমার পরিবারকে সাপোর্ট করা খুবই প্রয়োজন। বাবা-মা দুইজনই অসুস্থ (বিশেষ করে বাবা, ঠিকমত হাঁটতে পারেন না)। একমাত্র উপার্জনকারী বাবার চাকরির বাকি আর কয়েক মাস। বাড়িতে ফোন দিয়ে মেস ভাড়া আর মিলের টাকা চাইতেও লজ্জা লাগে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৩-২০১৪ সেশনে ভর্তি হয়েছি কিন্তু এখনো অনার্স শেষ করতে ৫-৬ মাস লেগে যাবে। যেখানে আমার সব বন্ধুরা মাস্টার্স শেষ করে এখন কেউ চাকুরি করছে বা কেউ চাকুরি খুঁজছে। এই ৫-৬ মাসের মধ্যে বাবার চাকুরি শেষ হয়ে যাবে। যে রেজাল্ট তাতে কেউ ফেস দেখে যে চাকুরি দেবে সে ভরসা মেয়েদের ভ্রুকুচকে তাকানো, বন্ধুমহলে কম প্রাধান্য পাওয়া, কালো আর খাটো হওয়াতে বাবা, মুরুব্বিদের টিটকারী, টিচারদের অবহেলা দেখেই বাদ দিয়েছি। বাদির অর্থনৈতিক মন্দা, বাবার অসুস্থতা, দীর্ঘ সেশনজট, চাকুরির দুর্বলতা সব মিলিয়ে খুব বড় একটা হতাশার মধ্য দিয়ে দিনানিপাত করছি, যা অনেক সময় আত্নহুতির জন্য অনুপ্রেরণা যোগায়।”

“আমার এই পোস্ট দেখে অনেকের গা জ্বলবে, অনেকেই তেলবাজি করবে, অনেকেই অনুগ্রহ দেখাবে যা আমার একটুও পছন্দ নয়। পারলে কিছু করে দেখান যাতে করে আমার মতো কেউ আত্নহুতির চিন্তাভাবনা মাথায় না নেয়। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ মনে হয় বেরোবিতে ভর্তি হওয়া।”