হঠাৎ ২০ দলীয় জোটে ভাঙন, সরকারের চাপ নাকি টানাপোড়েন!

মঙ্গলবার, মে ৭, ২০১৯

ঢাকা: শপথ নিয়ে সংসদে যাওয়ায় ১৩ দিনের মাথায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে ভাঙন শুরু হয়েছে। সোমবার জোট থেকে বেরিয়ে গেছে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)।

এর একদিন পর আজ মঙ্গলবার জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জোটের আরেক শরিক দল লেবার পার্টি।

হঠাৎ করেই বিএনপির জোটে এমন অস্থিরতা- সরকারের চাপ, নাকি ২০ দলীয় জোটের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে।

২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর নেতাদের দাবি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে পুরানো মিত্রকে অবজ্ঞা করায় জোটের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। কেউ কেউ আবার ২০ দলকে পুনর্গঠন করারও দাবি জানিয়েছেন।

তবে, ২০ দল থেকে বিজেপির বের হযে যাওয়া আর লেবার পার্টির বের হয়ে যাওয়া এক করে দেখতে চান না নেতারা। কারণ ২০ বছর ধরে জোটের জন্য বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থের ত্যাগ আর লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের অবদান এক নয়। তবুও যেহেতু ইরান জোটে আছে, তার মতামতকেও প্রাধান্য দিতে হবে।

জোট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট গঠন নিয়ে ২০ দলের সঙ্গে টানাপোড়েন শুরু হয়। দলের চেয়ারপারসন কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়ার ‘মুক্তি’ ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি নানা কৌশলে ঐক্যফ্রন্ট গঠনে জোটের সমর্থন আদায় করে নেয়।

জোট নেতাদের দাবি, কারণ তখন যদি কেউ প্রকাশ্যে বিরোধীতা করেন তাহলে মনে করা হত খালেদা জিয়ার মুক্তিতে তারা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু ২০ দলকে ‘অন্ধকারে’ রেখে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে জোটের মধ্যে ফাটল ধরাল বিএনপি। যার অংশ হিসেবে পার্থ জোট থেকে বের হয়ে যান। এর মধ্য দিয়ে জোটের সঙ্গে বিজেপির ২০ বছরের সম্পর্কের ইতি ঘটে।

সোমবার রাতে জোট ছাড়ার কারণ উল্লেখ করে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, এইমাত্র আমার দল ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেল।

পরে পার্থ জোট ছাড়ার যুক্তি তুলে ধরে সংবাদমাধ্যমে একটি বিবৃতিও পাঠিয়েছেন।

এতে পার্থ উল্লেখ করেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর ২০ দলীয় জোট স্থবির হয়ে যায় এবং রাজনীতি ঐক্যফ্রন্টমুখী হয়ে পড়ে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকারের সঙ্গে সংলাপে বিএনপি বাদে ২০ দলের অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল না। তবে শুধুমাত্র সংহতি ও সহমত পোষণের জন্যই ২০ দলের সভা ডাকা হতো।

পার্থের অভিযোগ, ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে সংসদে যাবে না বলেছিল। কিন্তু, তারা শেষ মুহূর্তে শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেয়। এতে আমরা অবাক হয়েছি। শপথ গ্রহণের মাধ্যমে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি ৩০ ডিসেম্বরের ‘প্রহসনের’ নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে। আর এ কারণগুলো দেখিয়েই ২০ দলের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার কথা জানালেন পার্থ।

জোট থেকে পার্থের বের হয়ে যাওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার জন্য বিএনপিকে হুমকি দিয়েছেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান।

মঙ্গলবার তিনি বিএনপিকে ২৩ মে পর্যন্ত সময় বেধে দিয়েছেন। এর ব্যতয় হলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ছাড়ার ঘোষণা দেন ইরান।

পরিবর্তন ডটকমকে তিনি বলেন, আমরা বিএনপিকে ড. কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্ট ছাড়া এবং কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কর্মসূচি দিতে আগামী ২৩ মে পর্যন্ত আল্টিমেটাম দিচ্ছি। এই সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে, ২৪ মে আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত বিএনপিকে জানিয়ে দেব।’

আগেও একবার বিএনপি জোট ছাড়ার হুমকি দিয়েছিলেন লেবার পার্টির এই নেতা। ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে তিনি কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী এবং গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে ২০ দলীয় জোটে অন্তর্ভুক্ত করলে জোট ছাড়ার হুমকি দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বিএনপি জোটে থেকে যান।

চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাতে চাইলে বিএনপির জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহীম বলেন, এখন একটি অস্থির সময় চলছে। বিভিন্ন মহলে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ কাজ করছে। এ রকম প্রেক্ষাপটে একেক দল একেক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু কল্যাণ পার্টি বিএনপির কোটি কোটি নির্যাতিত নেতাকর্মীদের অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম।

বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে জেনারেল ইবরাহীম বলেন, বিএনপির প্রকাশ্য নেতৃত্বের উচিৎ হবে, ২০ দলীয় জোটকে পুনর্গঠন করে নতুন উদ্যোগে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে যাওয়া।

বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহদাৎ হোসেন সেলিম বলেন, পার্থ জোট ছাড়া নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে আমরাও একমত। কারণ ২০ দলকে উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপ করে বিএনপি। এর থেকে ২০ দলে টানাপোড়েন শুরু হয়। পরিস্থিতি দেখে দলের আলোচনা করে আমরাও আমাদের সিদ্ধান্ত নিব।’

ইরানের হুমকি প্রসঙ্গে সেলিম বলেন, পার্থ চলে যাওয়া আর ইরানের চলে যাওয়া এক নয়। তারপরও কেউ যদি জোট ছেড়ে চলে যায় এটা তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটা নিয়ে কিছু বলার নেই।

২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের সঙ্গে যোগযোগে চেষ্টা করে হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, চার দলীয় জোটের সঙ্গে ১৯৯৯ সাল থেকে এবং পরে ২০ দলীয় জোটভুক্ত হয়ে রাজনীতি করে আসছিল বিজেপি। অবশ্য ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই ২০ দলীয় জোট ছেড়ে যায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ) ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) একাংশের নেতারা।

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন