‘কখনো কোন ছবিতে লেংটা হয়ে কাজ করিনি’

শুক্রবার, জানুয়ারি ১৮, ২০১৯

ঢাকা: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মুনমুন। মুনমুনের জন্ম ইরাকে হলেও তার পৈত্রিক নিবাস বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটার পর অর্থকষ্টে পড়তে হয়েছিল তাদের। সেই কারণে পড়াশোনাও করতে পারেন নি তিনি। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর আর সেটা হয়ে উঠেনি।

১৯৯৭ সালে চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেসামের হাত ধরে বাংলাদেশ চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি হয় মুনমুনের। তিনি এহতেসামের সহকারী হিসেবে কাজ করতে এসেছিলেন কিন্তু এহতেসাম তার অভিনয়ের দক্ষতা দেখে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দেন। এহতেসাম পরিচালিত ‘মৌমাছি’ চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় মুনমুনের। কিন্তু চলচ্চিত্রটি ব্যবসায়িকভাবে লাভ করতে পারেনি। এতে মুনমুনকে ক্যারিয়ারের শুরুতেই থেমে যেতে হয়। এরপর তাকে কোন পরিচালক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রস্তাব দিতো না। এই সময় নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যপরিচালক মাসুম বাবুলের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে মুনমুনের। মাসুম বাবুলের মাধ্যমে মুনমুন আবার বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টু পরিচালিত ‘শক্তির লড়াই’ চলচ্চিত্রে মুনমুনের অনবদ্য অভিনয় দর্শকের মন জয় করেন। এরপর মালেক আফসারী পরিচালিত ‘মৃত্যুর মুখে’ তার একটি দারুণ ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র। এছাড়াও ‘রানী কেন ডাকাত’, ‘লংকাকাণ্ড’, ‘জানের জান’, ‘শত্রু সাবধান’, ‘জল্লাদ’, ‘রক্তের অধিকার’ প্রমুখ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে চলচ্চিত্র অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অধিকাংশ নায়কের সাথে অভিনয় করেছেন মুনমুন। এই সময়ের শীর্ষনায়ক শাকিব খানের সঙ্গে মুনমুনের জুটি এক সময় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। শাকিব খানের প্রথম ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র ‘বিষে ভরা নাগীন’ ছবিতে নায়িকা ছিলেন মুনমুন। এরপর একসাথে প্রায় ১৪টি চলচ্চিত্রে এই জুটিকে দেখা গেছে। এরপর তাদেরকে আর একসাথে দেখা যায় নি।

সফলতা পাওয়ার পর প্রায় বেশকিছু ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু ২০০০ সালের দিকে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে নগ্নতা ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিলো। সেই সময়টাতে অনেকের দৃষ্টিতে মুনমুন ছিলেন একজন অন্যতম বিতর্কিত নায়িকা। তখনকার সময়ে মুনমুন অভিনীত বেশ কিছু চলচ্চিত্রে নগ্নতা দেখা যায়। তবে মুনমুন কে কোন চলচ্চিত্রে নগ্ন ভাবে অভিনয় বা নৃত্য করতে দেখা যায় নি। ওই সময়টাতে মুনমুন ছিলেন প্রথম সারির একজন নায়িকা। তাকে হেয় বা সমালোচিত করতে একটি মহল তার নামের পাশে অশ্লীল শব্দের ব্যবহার করা শুরু করে। তার নামের সাথে ঐ মহলের সংশ্লিষ্টরা ‘বি’ গ্রেডের কিছু নায়িকার নাম জুড়ে দেয়াও শুরু করে। এসব দেখে মুনমুন চলচ্চিত্র ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেন।

এ বিষয়ে চিত্রনায়িকা মুনমুন বলেন, ‘আমি যখন কাজ করতে শুরু করি তার কয়েক বছর পর অর্থাৎ ২০০০ কিংবা ২০০১ সালের দিকে বাংলা চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা ঢুকে পড়েছিল। যার কারণে আমি সিনেমা ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। আমি কখনো লেংটা হয়ে অভিনয় করি নি কিংবা কাজ করিনি। কাজের প্রয়োজনে আমার কস্টিউম যেমন পড়া দরকার ছিল সেগুলো পড়েছি। ছোট ছোট প্যান্ট পরেছি, শর্ট ড্রেস পড়েছি কিন্তু কখনো কোন ছবিতে লেংটা হয়ে কাজ করিনি। কিন্তু ঐ সময়টাতে আমার পিছনে একটা মহল নানারকম মন্তব্য করে বেড়াচ্ছিল আমাকে টেনে নিচে নামাতে। বিভিন্ন ছবিতে অশ্লীল দৃশ্য ব্যবহার করে সেখানে আমার নাম জুড়ে দিত অনেকেই। তাদের মধ্যে আমার কাছের অনেকেই ছিলেন। এক্সট্রা শিল্পীদের নগ্ন করিয়ে দৃশ্য ধারণ করিয়ে সেখানে আমার নাম আর আমার ফেইস ব্যবহার করত। অথচ আমি এগুলোর কিছুতেই ছিলাম না তখন। আমাকে বাজেভাবে নিচে টেনে নামানোর চেষ্টা করেছে তারা। এমন অবস্থায় আমার আর কাজ করার ইচ্ছা মন থেকে উঠে গিয়েছিল। অথচ আমি যে একজন অভিনয় শিল্পী অভিনয়ের প্রতি যে টান সেটা আমাকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খায়।’

মনে প্রচন্ড কষ্ট নিয়ে ২০০৩ সালের দিকে তিনি চলচ্চিত্র ছেড়ে দেন। এরপর বিভিন্ন সময় সার্কাসে অভিনয় ও নৃত্য পরিবেশনা করা শুরু করেন। এরপর ঐ সময়টাতেও যাত্রা করে বেড়াচ্ছেন বলে তার নামে নানান বাজে মন্তব্য করতেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চলচ্চিত্রে যখন অশ্লীলতা ঝেঁকে বসে তখন আর আমার অভিনয় করা সম্ভব ছিল না। এভাবে আমি কখনো কাজ করতে পারব না। এরপর কাজ করা ছেড়ে দেই। এরপর সার্কাসে কাজ করতে শুরু করি। কিন্তু এতেও অনেকে নানা মন্তব্য করে বেড়াত। সিনেমা ছেড়ে নোংরামি করে বেড়াচ্ছি, যাত্রা করে বেড়াচ্ছি। অথচ আমি কখনও যাত্রা করিনি। যাত্রা আর সার্কাস দুইটা দুই জিনিস। যাত্রাতে মেয়েরা লেংটা হয়ে নাচে আরও কত কি? কিন্তু সার্কাস দেখতে যায় সমাজের অনেক বড় বড় মানুষ। সেখানে নগ্নতার তেমন কিছু নেই। আমি কখনও নগ্ন হয়ে কাজ করিনি। নগ্নতার জন্য সিনেমাই ছেড়ে দিয়েছিলাম আর সেই আমি কিনা এসব করব এখানে এসে। আমার খুব খারাপ সময় গিয়েছিল ঐ সময়টাতে। চলতেও খুব কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু তখন তো কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়াননি। সবাই তো আমার সমালোচনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।

এরপর ২০০৭ সালের দিকে চলচ্চিত্রে ফিরেছিলেন কিন্তু সে সময়েও খুব বেশী সিনেমা করতে পারেন নি। ২-৩ টা ছবিতে কাজ করেছিলেন। এরপর আবার বিরতিও নিয়েছিলেন। তিনি প্রায় ৯০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এদিকে ২০১৬ সালের দিকে আবারও অভিনয়ে ফিরেন তিনি। ফিরে বেশ কিছু চলচ্চিত্রে কাজ করেন। এখন মিজানুর রহমান মিজানের রাগী চলচ্চিত্রে কাজ করছেন। এখানে নায়িকার বড় বোনের চরিত্রে অর্থাৎ খল নায়িকার চরিত্রে দেখা যাবে তাকে। এছাড়াও একই পরিচালকের ‘তোলপাড়’ ছবিতেও অভিনয় করছেন তিনি।

উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের দিকে সিলেটের এক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেছিলেন। এরপর মাঝে যুক্তরাজ্যে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৬ সালের দিকে সেই সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ২০০৭ সালে এক প্রযোজক ও নায়ককে বিয়ে করেন তিনি। সেই সংসারে তার দুই ছেলে রয়েছে যারা দুজনই এখন ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করছে।