আগে নিজেরা ইভিএম ব্যবহার শিখুন: ইসিকে ঐক্যফ্রন্ট

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২২, ২০১৮

ঢাকা: একাদশ সংসদ নির্বাচনে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। আগামী শনিবার এ সংক্রান্ত এক সভায় কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে, সংসদ নির্বাচনে তারা কতটি আসনে ইভিএম ব্যবহার করবে। তবে তার আগে ভোটে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে আবার ইসির সমালোচনা করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতারা।

তাদের দাবি, ইসি নিজে আগে ইভিএম ব্যবহার শিখুক। তারপর জনগণকে শেখানো হোক। ইসি নিজেই ইভিএম চালাতে জানেনা।

ইভিএম সম্পর্কে ইসির সুস্পষ্ট ধারণা নেই দাবি করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা ও বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ইসির উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আগে নিজেরা ইভিএম চালানো শিখুন, পরে অন্যকে শেখান।’

বৃহস্পতিবার (২২ নভেম্বর) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে ‘ইভিএমকে না বলুন আপনার ভোট সুরক্ষিত করুন’ শীর্ষক সেমিনারে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘ইভিএম যারা এনেছে তারাও এর ব্যবহার ঠিকমতো জানে না, যারা ভোট দেবে তারা কখনো ইভিএম দেখেইনি। একজন নাগরিকের ইচ্ছেমতো, পছন্দমতো ভোট দেয়ার অধিকার আছে। কিন্তু যে যন্ত্র জনগণ কখনো দেখেনি সেটা স্পর্শ করলে যে ভোট হবে এটা তারা বিশ্বাস করতে পারে না।’

অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব ও ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন (ইসি) বর্তমান সরকারের আজ্ঞাবহ। জনগণের কাছে তাদের কোনও জবাবদিহিতা নেই। সব অপশক্তি অবলম্বন করে আবারও ক্ষমতায় আসতে চায় এ সরকার। আমরা ১০ বছর ধরে এ সরকার দ্বারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছি। আমাদের হাজার হাজার নেতা আজ কারাগারে। আমরা যখন নির্বাচনে যেতে চাচ্ছি তখনও আমাদের এসব নেতা কারাগারে আছেন। পদে পদে গ্রেফতার করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে ভোট বিপ্লবের জন্য জনগণ প্রস্তুত রয়েছে।’

ঐক্যফ্রন্টের শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘দেশে গায়েবি মামলা, গ্রেফতার, নির্যাতন চলছেই। এসব কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনের জন্য আমরা নির্বাচনে যাচ্ছি। আমরা এমন নির্বাচন চাই, যে নির্বাচন প্রশ্নবৃদ্ধ হতে পারে না। আমাদের নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করতে হবে। আমরা নিরাপদ ভোট কেন্দ্র চাই।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘দেশের হাওয়া বদলে গেছে, সুতরাং যে যাই করুক না কেন জনগণকে ভোট কেন্দ্র পাহারা দিয়ে নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন বিবেকের কাছে দায়ী হবে, খোদার কাছে দায়ী হবে।’

নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘যে প্রতিষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ তাদের ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতার অভাব আছে। সংবিধানে সব নাগরিকের সমঅধিকারের কথা বলা আছে। কিন্তু কেউ ডান হাতে ভোট দেবে, কেউ বাম হাতে দেবে, কেউ আবার দুই হাতে ভোট দেবে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচন কমিশনকে ইভিএমের ব্যবহার বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

সরকার ও ইসি বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করা হবে বলে এসময় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন জেএসডির সভাপতি ও ঐক্যফ্রন্ট নেতা আ স ম আব্দুর রব।

তিনি বলেন, ‘আমরা ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে ড. কামালের নেতৃত্বে ইসি ও সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করবো। সংবিধানের কোথাও ইভিএম ব্যবহারের কথা উল্লেখ নেই।’

সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের ২(ক) তে বলা আছে, সংসদ গঠন হবে প্রত্যক্ষ ভোটে। সংবিধানে ইংরেজিতে স্পষ্টভাবে ‘ডিরেক্ট’ শব্দটি উল্লেখ করা আছে, যার অর্থ প্রত্যক্ষ। ইভিএম প্রত্যক্ষ ভোটের আওতায় পড়ে না। নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা সংবিধান বিরোধী। তাই সংবিধান সংশোধন ছাড়া ইভিএম ব্যবহার করা যাবে না।

তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করতে ইভিএম কেন্দ্রগুলোতে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। র‌্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী, ডিবি, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বলবো, আপনারা নিরপেক্ষ হন। নির্বাচনের পর দেশে আপনারা থাকবেন, আমরাও থাকবো। আপনাদের ভূমিকার জন্য জনগণের কাছে জবাব দিতে হবে।’

সেমিনারে ইভিএমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানাভাবে ভোট জালিয়াতির কয়েকটি নমুনা দেখান বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল ও দলের তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ দল।

সেমিনারে বক্তারা ইভিএম’র সময়ভিত্তিক কারচুপি, সংখ্যানির্ভর কারচুপি, ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর কারচুপির বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

বক্তারা বলেন, বর্তমান পদ্ধতিতে ভোটারের আঙ্গুলের ছাপ না মিললে ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের সাহায্য নিয়ে ভোট প্রদান করা সম্ভব। ফলে একজনের ভোট আরেকজনের দেয়ার সুযোগ স্পষ্ট হয়। ইভিএম’এ কোনো পেপার টেন নেই ফলে ভোট পুনরায় গণনার সুযোগ নেই। সব ইভিএম মেশিন থেকে সংগৃহীত ভোটের চূড়ান্ত গণনা প্রক্রিয়াটি স্পষ্ট ও স্বচ্ছ নয়। প্রিসাইডিং অফিসারের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার সময় পোলিং এজেন্ট থাকছে না এবং পোলিং এজেন্টকে চূড়ান্ত ফলাফলের সার্টিফাইড কপি দেয়া হবে না। গোপনীয়ভাবে ওয়্যারলেস ডিভাইস সংযুক্ত করার মাধ্যমে ওয়্যারলেস প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূরবর্তী অবস্থান থেকেই ভোটের ফল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।