৬১ আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও ২০টির বেশি দেওয়া হবে না

কৌশলী জামায়াতকে ছাড় দেবে না বিএনপি

মঙ্গলবার, নভেম্বর ২০, ২০১৮

ঢাকা: ২০-দলীয় জোটের মূল নেতৃত্ব দেওয়া দল বিএনপির সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে কোনো রকম সমঝোতার আগেই ৬১টি আসনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এদিকে দুই দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হলেও এ পর্যন্ত আসন বণ্টনের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি। বৈঠকে বিএনপি সর্বোচ্চ ১০ আসনে জামায়াতকে ছাড় দিতে চেয়েছে। এ ছাড়া উপমহাদেশীয় ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সীমান্তবর্তী আসনে প্রার্থী হওয়া-না হওয়া; স্বতন্ত্র না ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন জামায়াতের এসব বিষয়ও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। দুই দলের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

জানা গেছে, নির্বাচনে অংশ নিতে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ৬১ আসনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছে ২০ দলের গড়া জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। ওই আসনগুলোতে নিজ দলের প্রার্থীদের নামসহ বিএনপির সঙ্গে আলোচনাও শুরু করেছে জামায়াত। ২১ নভেম্বর বিএনপি প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার শেষ হলে জামায়াত এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে আসন বণ্টন কার্যক্রম শেষ করতে চান বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে দুদফার বৈঠকে জামায়াত তাদের দাবিকৃত আসনগুলোতে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর যোগ্যতা, বিগত নির্বাচনে তাদের ভোটপ্রাপ্তিগত অবস্থান এবং নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীদের ভোটব্যাংকের বর্ণনাসহ বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। প্রথম বৈঠকে বিএনপি পাল্টা যুক্তি দিয়ে ৬ আসন ছাড়তে রাজি হয়। দ্বিতীয় বৈঠকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০-এ।

দলীয় প্রয়োজনে প্রায়ই শরিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, আসন বণ্টনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও নজরুল ইসলাম খান। তারা শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। কে কত আসন চায়, ইতোমধ্যে সে বিষয়েও অবগত হয়েছেন। তিনি বলেন, ৩০০ আসনে প্রথমে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে বিএনপির প্রার্থী ঠিক করা হবে। এর পর আমাদের নির্ধারণ করা প্রার্থীর তুলনায় শরিক দলের প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, স্থানীয় অবস্থা ও অবস্থানসহ বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে দেখা হবে তিনি ‘উইনিং’ প্রার্থী কিনা। অর্থাৎ তার বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা। যদি তা-ই হয়, তাহলে তাকে প্রার্থী করা হবে। প্রার্থী যে-ই হোক, যে দলেরই হোক, তাকে হতে হবে উইনিং প্রার্থী বলেন মিন্টু।

সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান ৫০ থেকে ৬০টি আসনে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছতে চান বলে জানান। তবে জামায়াতের নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ৩৫ আসনে জোটগতভাবে নির্বাচন করেছিলাম। তার দাবি, এর বাইরে ৪ আসন উন্মুক্ত ছিল। এবারও তারা এর চেয়ে বেশি আসন চাইবেন। বিএনপি এতো আসন দিতে না চাইলে কী করবেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এগুলো নিয়ে বৈঠক হবে। পরে একটি সিদ্ধান্ত তো হবেই।

জানা গেছে, বিএনপি ও জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গতকাল সোমবারও ফের এ নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে জামায়াতকে তাদের প্রার্থীতালিকা আরও সংক্ষিপ্ত করে আলোচনায় বসার পরামর্শ দেওয়া হয় বিএনপির পক্ষ থেকে। যৌক্তিক দাবি নিয়ে আলোচনায় বসলে অল্প সময়ের মধ্যেই আসন বণ্টন সম্ভব বলে বৈঠকে মন্তব্য করেন বিএনপির এক নেতা। দলটির দায়িত্বশীল এক নেতা জানিয়েছেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দুই দফা জামায়াত নেতা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জামায়াতের দাবি করা প্রত্যেক আসনের বিপরীতে বিএনপি তাদের প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, ভোটের সমীকরণ ও বিগত নির্বাচনের ফল নিয়ে বিশ্লেষণসহ তাদের সার্বিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা মনে করেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ২০টির বেশি আসনে জামায়াতকে ছাড় দেওয়া যাবে না।

বিএনপির এক নেতা বলেন, উপমহাদেশীয় ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে জামায়াতকে সীমান্তবর্তী আসন দেওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের বক্তব্য আছে। সীমান্তবর্তী আসনে তাদের কাউকে সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চায় না দেশটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বিরোধিতাকারী জামায়াত সম্পর্কে ভারত বরাবরই নেতিবাচক মন্তব্য করে আসছে। ওই নেতা আরও বলেন, ২০০৮ সালে জামায়াতকে ৩৫টি আসন দেওয়া হয়েছিল। তখনকার আর এখনকার বাস্তবতা এক নয়। জামায়াতের পাশাপাশি ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরামকে বেশকিছু আসন ছাড় দিতে হবে। এর বাইরে মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য এবং ২০ দলের অন্যতম শরিক এলডিপিকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আসন দিতে হবে। ২০ দলের অন্য শরিকরাও কয়েকটি আসন পাবে। বিএনপি চায় ২০-দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে তাদের যত শরিক দল আছে, সেসব দলকে মোট ৫০ থেকে ৬০টি আসনে ছাড় দিতে, এর বেশি নয়।

আসন বণ্টন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করতে জামায়াতের চার নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান, কেন্দ্রীয় নেতা রফিকুল ইসলাম খান, আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও আবদুল হালিম। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

যে ৬১ আসনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছে জামায়াত : ঠাকুরগাঁও-২ মাওলানা আবদুল হাকিম, দিনাজপুর-১ মাওলানা মোহাম্মদ হানিফ, দিনাজপুর-৪ মাওলানা আফতাব উদ্দিন মোল্লা, দিনাজপুর-৬ মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম, নীলফামারী-১ মাওলানা আবদুস সাত্তার, নীলফামারী-২ মনিরুজ্জামান মন্টু, নীলফামারী-৩ মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম, লালমনিরহাট-১ আবু হেনা মো. এরশাদ হোসেন সাজু, রংপুর-৫ অধ্যাপক গোলাম রব্বানী, কুড়িগ্রাম-৪ আলহাজ মোস্তাফিজুর রহমান, গাইবান্ধা-১ মাজেদুর রহমান সরকার, গাইবান্ধা-৩ মাওলানা নজরুল ইসলাম লেবু, গাইবান্ধা-৪ ডা. আবদুর রহিম সরকার, জয়পুরহাট-১ ডা. ফজলুর রহমান সাঈদ, বগুড়া-২ অধ্যক্ষ মাও. শাহাদাতুজ্জামান, বগুড়া-৪ তায়েব আলী,  সিরাজগঞ্জ-৫ অধ্যক্ষ আলী আলম, পাবনা-১ ডা. আবদুল বাসেত, পাবনা-৪ আবু তালেব ম-ল, পাবনা-৫ ইকবাল হুসাইন, মেহেরপুর-১ তাজ উদ্দীন আহমদ, কুষ্টিয়া-২ আব্দুল গফুর, চুয়াডাঙ্গা-২ মাওলানা রুহুল আমিন, ঝিনাইদহ-৩ মতিয়ার রহমান, যশোর-১ আজিজুর রহমান, যশোর-২ আবু সাইদ মুহাম্মদ সাদাত হোসাইন, যশোর-৫ গাজী এনামুল হক, যশোর-৬ মুক্তার আলী, বাগেরহাট-৩ অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াদুদ, বাগেরহাট-৪ অধ্যাপক আবদুল আলীম, খুলনা-৫ অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, খুলনা-৬ মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, সাতক্ষীরা-১ অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ মাওলানা আবদুল খালেক ম-ল, সাতক্ষীরা-৩ মুফতি রবিউল বাশার, সাতক্ষীরা-৪ গাজী নজরুল ইসলাম, পটুয়াখালী-২ ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, পিরোজপুর-১ শামীম সাঈদী, পিরোজপুর-২ মাসুদ সাঈদী, ময়মনসিংহ-৬ জসিমউদ্দিন সরকার, ঢাকা-১৫ ডা. শফিকুর রহমান, সিলেট-৫ ফরিদউদ্দিন চৌধুরী, সিলেট-৬ হাবিবুর রহমান, কুমিল্লা-৯ এএফএম সোলায়মান চৌধুরী, কুমিল্লা-১১ ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, ফেনী-৩ ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, লক্ষ্মীপুর-২ রুহুল আমিন, লক্ষ্মীপুর-৩ ডা. আনোয়ারুল আজীম, চট্টগ্রাম-১০ শাহজাহান চৌধুরী, বগুড়া-৫ দবিবুর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ ড. কেরামত আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ অধ্যাপক ইয়াহিয়া খালেদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ নুরুল ইসলাম বুলবুল, নওগাঁ-৪ খ ম আব্দুর রাকিব, রাজশাহী-১ অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, নাটোর-১ অধ্যাপক তাসনিম আলম, নাটোর-৪ দেলোয়ার হোসেন খান, সিরাজগঞ্জ-৪ রফিকুল ইসলাম খান, চট্টগ্রাম-১৫ আ ন ম শামসুল ইসলাম, চট্টগ্রাম-১৬ জহিরুল ইসলাম, কক্সবাজার-২ হামিদুর রহমান আযাদ।