লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড : ইসির মুখে কুলুপ নাকে তেল!

রবিবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৮

ঢাকা: নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে দেশবাসীর মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর শঙ্কা ততই বাড়ছে। জনমনে সংশয়- নির্বাচন অবাধ, ‍সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হবে তো? সবাই নিশ্চিন্তে ভোট দিতে যেতে পারবে তো? নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে তো? সর্বোপতি একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বাস্তবে কতটা দৃশ্যমান হবে তা নিয়েই এখন টানাপোড়েন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে।

তবে তফসিল ঘোষণার পর সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এখনও যে নিশ্চিত হয়নি তা স্পষ্ট। তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আওতায় সব কিছু চলে আসে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করাও তাদেরই দায়িত্ব। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচনী মাঠে সমান সুযোগের জোর দাবি থাকলেও এ বিষয়ে এখনও মুখে কুলুপ এঁটে নাকে তেল দিয়ে নিশ্চিন্তে নির্ভার অবস্থানে নির্বাচন কমিশন (ইসি)!

তফসিল ঘোষণার পর থেকে সব দলের জন্য সমান সুযোগ দেয়ার ঘোষণা দেয় ইসি। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন উত্তোলন ও জমা দেয়ার সময় কর্মীদের মিছিল-সমাবেশসহ নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে সরকার সমর্থিত রাজনৈতিক দলগুলো। অন্য দিকে নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি পুলিশি তল্লাশি ও গ্রেফতারসহ নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।

গত ৮ নভেম্বর তফসিলের দিন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা বলেন, ‘ভোটার, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, প্রার্থী, প্রার্থীর সমর্থক ও এজেন্ট যেন বিনা কারণে হয়রানির শিকার না হন বা মামলা-মোকদ্দমার সম্মুখীন না হন তার নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কঠোর নির্দেশ থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘দলমত নির্বিশেষে সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ধর্ম, জাত, বর্ণ ও নারী-পুরুষভেদে সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। ভোট শেষে নিজ নিজ বাসস্থানে নিরাপদে অবস্থান করতে পারবেন। নির্বাচনী প্রচারণায় সব প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ পাবে। সবার জন্য অভিন্ন আচরণ ও সমান সুযোগ সৃষ্টির অনুকূলে নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা হবে।’

কিন্তু সিইসি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার কথা বললেও তফসিলের ১০ দিন পরও তার কার্যকর কোনও ব্যবস্থা এখনও চোখে পড়ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তফসিল ঘোষণার পরও অব্যাহত রয়েছে বিরোধী দলগুলোর ওপর বিশেষত বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের গ্রেফতার অভিযান। বিএনপিসহ সরকারবিরোধী নেতাকর্মী সমর্থকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় অনেককেই এখনও গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। এতে সারা দেশে বিরোধীদলের নেতাকর্মী এবং ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা নিরবিঘ্নে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার বিষয়টি ভোটের আগেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

গত শুক্রবার তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির ৪৭২ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে দলটি। এছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেয়া ‘গায়েবি মামলা’ প্রত্যাহারসহ গ্রেফতার নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তফসিল ঘোষণার পর গত ৯ নভেম্বর থেকে দলীয় প্রার্থীদের কাছে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সকাল ১০টা থেকে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে (৩/এ) এই কার্যক্রম চলে। মনোনয়নপত্র ক্রয়কে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ কার্যালয় ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। সকাল থেকেই শোডাউন করতে করতে আসেন মনোনয়ন কিনতে আসা নেতাকর্মীরা।

দলে দলে মিছিল নিয়ে আসেন ধানমন্ডিমুখী মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। ব্যানার-ফেস্টুনসহ নানা বাদ্যযন্ত্র রয়েছে তাদের বহরে। ভিড় সামলাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেগ পেতে হয়। ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে আসা নেতাকর্মীদের সমাগমে পুরো ধানমন্ডিতে দেখা দেয় যানজট। এর মধ্যে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের মতো ঘটনাও ঘটে। এরপরও পুলিশ অথবা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

অন্যদিকে গত ১২ নভেম্বর থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছে মনোনয়নপত্র বিক্রি শুরু করে বিএনপি। মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ উপলক্ষে নেতাকর্মীদের ব্যাপক সমাগমে সারা দিন জনসমুদ্রে পরিণত হয় রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকা। সকাল থেকেই ব্যানার-ফেস্টুনসহ মিছিল নিয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসতে থাকেন। অনেকে ব্যান্ড পার্টি, হাতি ও ঘোড়াও সাথে আনেন।

গত ১৪ নভেম্বর বুধবার হঠাৎ করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের তৎপর বেড়ে যায়। সকাল থেকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাকর্মী-সমর্থকদের ভিড় ছিল। পুলিশ আশাপাশের রাস্তায় তাদের দাঁড়াতে দিচ্ছিল না। মনোনয়ন ফরম বিক্রির কার্যক্রমের এক পর‌্যায়ে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। গত বুধবার বেলা ১টা থেকে পরবর্তী এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এই সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আহত হন পুলিশ সদস্যসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছোঁড়ে। অন্যদিকে বিএনপি কর্মীরা বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করে এবং পুলিশের দুটি গাড়িতে আগুন দেয়। এ ঘটনায় তিনটি মামলায় বিএনপির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রায় একই সময়ে আওয়ামী লীগ উৎসবমুখর পরিবেশে মিছিল শোডাউন নিয়ে মনোনয়নপত্র দেয়া নেয়া করলেও মাথা ব্যথা ছিল না ইসির। কিন্তু বিএনপির মনোনয়ন বিক্রি শুরু হলে হঠাৎ নড়েচড়ে বসে কমিশন। ১২ নভেম্বর মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মিছিল, শোভাযাত্রা ও মহড়া বন্ধের ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেয় ইসি। আচরণবিধি প্রতিপালনে ব্যবস্থা নিতে উপজেলা একজন করে নির্বাহী হাকিম নিয়োগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় ইসির যুগ্ম সচিব ফরহাদ আহাম্মদ খান।

সেই সঙ্গে ‘তফসিল ঘোষণার পর প্রার্থী বা তার পক্ষে কোনও ব্যক্তির মিছিল-শোডাউন আচরণবিধি লঙ্ঘন’ উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি দেয় ইসি।

বিএনপির দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ শুরু করার পরপর কেন পুলিশকে আচরণবিধি সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘এই চিঠি সবার জন্য প্রযোজ্য। ভবিষ্যতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাতে শোডাউন না হয়, সেজন্য সতর্কতামূলক ওই চিঠি পুলিশ মহাপরিদর্শকে (আইজিপি) দেয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে দুর্ভোগের বিষয়টি এসেছে, ইসি সেদিকে খেয়াল রাখতে বলেছে।’

এদিকে সংঘর্ষের ঘটনার তিন দিন পর নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার প্রতিবেদন চেয়ে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে ইসি। মহাপুলিশ পরিদর্শকের কাছে দেয়া চিঠিতে এ ঘটনায় কাউকে অহেতুক হয়রানি না করার জন্য বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ আরও বলেন, ‘প্রকৃত ঘটনা কি তা জানতে পুলিশের কাছে প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর করণীয় কী হবে তা কমিশন ঠিক করবে।’