মামলা-অভিযান গোপন রাখেন পল্টনের ওসি : নজিরবিহীন কাণ্ড

বুধবার, অক্টোবর ৩১, ২০১৮

ঢাকা: সাজানো চুরির মামলায় তরুণকে ফাঁসিয়ে জজকোর্ট প্রাঙ্গণে নজিরবিহীন অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার চালানোর নেপথ্যে মূল ভূমিকা রাখেন পল্টন থানার ওসি মাহমুদুল হক। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত না করেই প্রথমে ভৌতিক অভিযোগে তিনি মামলা নেন। যে মামলায় সুরেশ সরিষার তেলের কর্ণধার সুধীর সাহার একমাত্র মেয়ে লিমা সাহার স্বামী সৈকত পালসহ চারজনকে আসামি করা হয়। ওই মামলায় সাজানো আসামি সৈকতকে আটক করতে ওসির চাপে সোমবার সন্ধ্যায় জজকোর্ট এলাকায় সিভিল ড্রেসে অভিযান চালাতে যায় পল্টন থানা পুলিশ। মামলার বিষয়টি যেভাবে গোপন রেখেছেন, একইভাবে অভিযানের ব্যাপারটিও ওসি মাহমুদুল ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তাকে জানাননি। সুরেশের মালিকের সঙ্গে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সাজানো মামলায় সৈকতকে ফাঁসানোর আয়োজন করেছেন বলে পল্টন থানার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে তদন্তও শুরু করেছে পুলিশ।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, যে প্রক্রিয়ায় মামলা হওয়ার পর আদালত এলাকায় স্থানীয় থানা পুলিশকে অবহিত না করে পল্টন থানার ওসির নির্দেশে অভিযান চালানো হয়েছে, এতে পরিস্কার যে, এর পেছনে বড় ধরনের টাকার খেলা ছিল। এরই মধ্যে অভিযানে অংশ নেওয়া দুই পুলিশ সদস্য পল্টন থানার এসআই ভৌতিক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান ও সোমেন বড়ূয়াকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্ত শেষে চলতি সপ্তাহে ওসির ব্যাপারে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

এ ব্যাপারে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের ডিসি আনোয়ার হোসেন বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। কেন তারা এত তাড়াহুড়া করে আদালত এলাকায় সিভিল ড্রেসে অভিযানে গেল, তা বের করা হবে। আদালত প্রাঙ্গণে কোনোভাবেই তারা এভাবে অভিযানে যেতে পারেন না। ওসির ব্যাপারে যে অভিযোগ উঠেছে, তারও তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে সবার দায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, যে অভিযোগে মামলা করা হয়েছে তা দায়ের করার আগে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওসি অবহিত করেননি।

মতিঝিল বিভাগের এডিসি শিবলী নোমান বলেন, অভিযুক্তদের বক্তব্য শোনা হচ্ছে। সিসিটিভির ফুটেজসহ অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করা হবে।

এদিকে সাজানো মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুল হান্নান বলেন, ওসির নির্দেশেই তারা টিম নিয়ে আদালত এলাকায় অভিযানে যান। তবে সৈকতকে আটক করার সময় আইনজীবীরা বাধা হয়ে দাঁড়ান। আসামি কোর্ট এলাকায় রয়েছে এটা অবহিত করেছিলেন মামলার বাদী। আরও কয়েক দফা এভাবে আসামি গ্রেফতারের কথা বলে বাদী তাদের ডেকে নিয়েছিলেন।

সৈকত পাল সমকালকে বলেন, সোমবার আদালত এলাকা থেকে বের হওয়ার সময় অতর্কিতভাবে ৭-৮ জন লোক তাকে টেনেহিঁচড়ে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের কারও গায়ে পুলিশের পোশাক ছিল না। একপর্যায়ে তারা মারধর শুরু করে। এ সময় তার মাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। উপস্থিত আইনজীবী ও কোতোয়ালি থানা পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। সুধীর সাহা মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে পল্টন থানার পুলিশকে কিনে নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, একে একে ৮টি মামলা দায়ের করে সুধীর সাহা তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছেন। এখন তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত। পল্টন থানার মামলায় দুই হাজার ৩৩০ টাকা চুরির অভিযোগ আনা হয়। বাদী আজিজুরের বাড়ি চাঁদপুর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নামের কারও সঙ্গে সৈকত পালের পরিচয় নেই।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ- আজিজুল হক পাটোয়ারি নামে যে ব্যক্তি বাদী হয়ে সৈকতসহ চারজনকে আসামি করে চুরির মামলা করেছেন সেটি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গোপন করেন ওসি মাহমুদুল হক। এ মামলা হওয়ার ঘটনায় পেছন থেকে কলকাঠি নাড়েন সুরেশের মালিক সুধীর সাহা। মোটা অঙ্কের অর্থের মাধ্যমে ওসিকে ম্যানেজ করেন তিনি।

সৈকতের আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, আদালত চত্বরের বার লাইব্রেরিতে সিভিল ড্রেসে পুলিশ এসে বিচারপ্রত্যাশীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টার ঘটনা নিন্দনীয়। এটা ন্যায়বিচার-পরিপন্থী। আদালত চত্বর থেকে এভাবে কাউকে ধরে নেওয়ার নজির নেই। এ ঘটনায় সকলে বিস্মিত।

সৈকত পালের মা ইতি পাল বলেন, এখন পর্যন্ত ৮টি মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে সুধীর সাহা ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। একের পর মামলা করে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৪টি নারী নির্যাতন আইনে, ৩টি অপহরণ ও একটি চুরির মামলা। প্রশাসনের অসাধু লোকজনকে ম্যানেজ করে তাদের সাজানো পরিবারকে তছনছ করা হচ্ছে। তারা দীর্ঘদিন গ্রামের বাড়ি নরসিংদীতে যেতে পারছেন না। বাড়ি-ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ। জীবন শঙ্কায় ঢাকায় এসে উঠেছেন। এরপরও সুধীর সাহার রোষানল থেকে নিস্তার পাচ্ছেন না।
সুত্র, সমকাল

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন