যেভাবে সুন্দরী ফাঁদ মোসাদের

মঙ্গলবার, অক্টোবর ৩০, ২০১৮

ঢাকা: চারপাশে বিছানো অদৃশ্য এক জাল। তা দিয়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে প্রতিজন মানুষের গতিবিধি, কর্মকান্ড। অথচ সেই মানুষটি এর কিছুই বুঝতে পারছেন না। অকস্মাৎ সৌদি আরবের সাংবাদিক জামাল খাসোগির মতো নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ। ‘শিকার’ ধরতে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা হয় সুন্দরীদের। সেই ফাঁদে পা দিয়ে কুপোকাত হচ্ছেন ঝানু সমরবিদ, রাজনীতিক, বোদ্ধা, যোদ্ধা, বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। এমনই ফাঁদ পাতার ক্ষেত্রে যে নামটি সবার আগে চলে আসে তা হলো ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। তারা লাতিন আমেরিকা সহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশে, এশিয়া সহ সারাবিশ্বের বহু দেশে অপারেশন পরিচালনা করে।

১৯৫৪ সালের কথা। মোসাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য এলো। তাতে বলা হলো, ইসরাইলের সামরিক গোপন প্রযুক্তি নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন বা এর সুবিধা পেয়েছেন এমন একজন ইসরাইল কর্মকর্তা মেজর আলেকজান্ডার ইসরাইল রয়েছেন ইসরাইলে। সেখানে তিনি মিশরীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। মোসাদ খবর পেলো, তিনি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর গোপন তথ্য ও গোপনীয় সব প্রযুক্তি বিক্রি করে দেয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে দ্রুত পদক্ষেপ নিলো মোসাদ ও শিন বেত কর্মকর্তারা। তাদের একটি টিমকে এ বিষয়ে দায়িত্ব দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে পাঠানো হলো ইউরোপে। বলে দেয়া হলোÑ যত দ্রুত সময়ে হোক মেজর আলেকজান্দার ইসরাইলকে খুঁজে বের করতে হবে এবং তাকে অপহরণ করতে হবে। অবশেষে চিরুণি তল্লাশিতে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় তাকে আবিষ্কার করে ফেলল মোসাদ ও শিন বেত কর্মকর্তারা। এই মিশনের কোড নাম দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন ব্রেন’। মেজর আলেকজান্দার ইসরাইলকে শিকার করতে তার সামনে অপারেশনের ‘হানি ট্রাপ’ বা ফাঁদ পাতলেন এই টিমের একজন সুন্দরী এজেন্ট। মেজর আলেকজান্দার ইসলাইলকে একদিন আমন্ত্রণ জানালেন ওই সুন্দরী। তা করতে তিনি যতটুকু পারেন উদার হওয়ার চেষ্টা করলেন। সুন্দরী নারীর আহ্বানে নরম হয়ে গেলেন মেজর আলেকজান্দার। তিনি নিজেকে আর সংযত করতে পারলেন না। ফাঁদে পা দিলেন। ব্যাস আর যায় কোথা! অপহরণ করা হলো । তার ওপর চেতনানাশক প্রয়োগ করা হলো। ওদিকে প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষায় থাকে ইসরাইলের সেনাবাহিনীর একটি বিমান। তাতে তুলে নেয়া হয় মেজর আলেকজান্দারকে। তাকে নিয়ে ইসরাইলের উদ্দেশে উড়াল দেয় ওই বিমানটি। তবে ইসরাইলে আসার পথে জ্বালানি নেয়ার জন্য বেশ কয়েকবার থামতে হয় ওই বিমানটিকে। প্রতিবারই তিনি জেগে যাবেন এই ভয়ে তার ওপর প্রয়োগ করা হয় বাড়তি চেতনানাশক। এর মাত্রা এতটাই হয়ে যায় যে, তা ওভারডোজ বা অতিমাত্রায় প্রয়োগ হয়ে যায়। এতে তিনি মারা যান। কিন্তু বিমানের কোনো আরোহী বা অপহরণকারীদের কেউই বুঝতে পারেন নি তিনি আর নেই।
ইসরাইলের মাটি স্পর্শ করলো ওই বিমান। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নামানোর চেষ্টা করা হলো। কিন্তু মাত্র তখনই তারা বুঝতে পারলো মেজর আলেকজান্দার মারা গেছেন। ফলে তাকে সমুদ্রেই সমাহিত করা হলো। এই ঘটনাটি দশকের পর দশক কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়েছিল।
এ ছাড়া উচ্চ পর্যায়ের গুপ্তচর ব্যবহার করে অস্ট্রিয়ান রাজনীতিক হায়দার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে মোসাদ।
১৯৬০ সাল। মোসাদ গোয়েন্দা তথ্যে আবিস্কার করলো নাৎসি নেতা, হলোকাস্টের সংগঠক জার্মান এডলফ আইসম্যান অবস্থান করছেন আর্জেন্টিনা। কোনোভাবে খুব সঙ্গোপনে আর্জেন্টিনায় পা রাখলেন পাঁচ মোসাদ এজেন্টের একটি টিম। এর নেতৃত্বে ছিলেন শিমন বেন আহারন। তারা গোয়েন্দা তথ্য ও নজরদারির মাধ্যমে নিশ্চিত হলেন এডলফ আইসম্যানের বিষয়ে। তারা নিশ্চিত হলেন, আর্জেন্টিনায় নাম পাল্টে ছদ্মনাম ধারণ করেছেন এডলফ আইসম্যান। ওই দেশে তিনি নতুন নাম ধারণ করেছেন রিকার্ডো ক্লেমেন্ট। এই নামেই তিনি বসবাস করছেন আর্জেন্টিনা। কিন্তু ছদ্মনাম ধারণ করলে কি হবে! তার ওপর চোখ পড়েছে মোসাদের।
১৯৬০ সালের ১১ই মে। এদিন রিকার্ডো ক্লেমেন্ট নাম ধারণ করা এডলফ আইসম্যানকে অপহরণ করা হলো। নিয়ে যাওয়া হলো অজ্ঞাত স্থানে। এরপর তাকে পাচার করা হলো ইসরাইলে। এখানে তার বিচার হলো এবং তাকে মৃত্যুদ- দেয়া হলো। এর প্রতিবাদ করে আর্জেন্টিনা। কারণ, তারা একটি স্বাধীন সাবভৌম দেশ। তাদের দেশ থেকে এভাবে একজন মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়া সেই সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে প্রতিবাদে উল্লেখ করলো আর্জেন্টিনা। এমন কর্মকান্ডের বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও প্রতিবাদ করে। তারা বলে, আন্তর্জাতিক শৃংখলা প্রতিষ্ঠায় যেসব নীতি রয়েছে, এর পুনরাবৃত্তি হলে, সেই সব নীতির লঙ্ঘন হবে। এতে সৃষ্টি হবে নিরাপত্তাহীনতা ও অনাস্থার এক পরিবেশ। শান্তি রক্ষার সঙ্গে যা মানানসই নয়। তাতে আরো বলা হয়, যে অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে সেই অভিযোগে এডলফ আইসম্যানকে যথাযথ বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির অশউইজ নির্যাতন শিবিরে একজন জার্মান অফিসার ও চিকিৎসক ছিলেন হোসে মেঙ্গেল। তাকেও অপহরণের একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই দ্বিতীয় অপারেশন থেকে সরে যায় মোসাদ।
১৯৯০ এর দশক। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করতে পারে এমন বিস্ফোরক ও অন্যান্য অস্ত্র তৈরিতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন যোদ্ধাগোষ্ঠী হিজবুল্লাহর একজন এজেন্ট। বিষয়টি মোসাদের জালে ধরা পড়ে যায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের সঙ্গে যৌথ অভিযানে নামে মোসাদ। তারা তার ওপর নজর রাখে। মনে করা হয় তিনি হিজবুল্লাহর অপারেটরদের সঙ্গে প্রতারণা করবেন। অর্থাৎ তিনি দায়িত্ব থেকে সরে আসবেন। কিন্তু না। তা হয় নি। ফলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০০১ সালের আগস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় দুই গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এবং সিআইএ’কে গোয়েন্দা তথ্য জানায় মোসাদ। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদেরকে সতর্ক করা হয়। বলা হয়, গোপনে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে দুই শত সন্ত্রাসী। তারা বড় ধরনের অপারেশন চালানোর পরিকল্পনা করেছে। মোসাদ যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআইকে সতর্ক করে এই বলে যে, যুক্তরাষ্ট্রে বিরাট আকারে টার্গেট করার ইঙ্গিত পেয়েছে তারা। এর ফলে আমেরিকানরা খুবই বিপন্ন হয়ে পড়তে পারেন। তবে ওই সতর্কতাকে কতটা বিশ্বাসযোগ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছিল তা জানা যায় নি। এর এক মাস পরে, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয়।
লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে। এখানেও জাল ছড়ানো মোসদের। ১৯৬৫ সালের কথা। ওই দেশে হলোকাস্টের অংশ হিসেবে লাতভিয়ান ইহুদিদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছিল। যারা এটা করেছিল তাদেরকে বলা হতো আরাজ কমান্ডো। এর সদস্য ছিলেন হার্বার্টস কুকারস। তিনি লাতভিয়ার একজন বৈমানিক। তাকে হত্যা করে মোসাদ।