অংশগ্রহণমূলক পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন দরকার

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

রবিবার, অক্টোবর ২৮, ২০১৮

উন্নয়ন সম্পর্কে একেকজনের বোধ একেক রকম। আমাদের কিছু অর্জন আছে সত্য। কিন্তু সেই অর্জন কতটা টেকসই হয়েছে, সে ব্যাপারে প্রশ্ন আছে। মাথাপিছু সবচেয়ে কম ভূমির দেশ বাংলাদেশ। এ স্বল্প পরিমাণ ভূমি নিয়ে আমরা আমাদের ভোগ্যপণ্য দেশেই উৎপাদন করছি। এটি যেমন একটি সুসংবাদ, তেমনি বাসার পাশে পড়ে থাকা জমিতে দেশী বেগুন, শসা, করলা লাগাতে বীজ না পাওয়াটা দুঃখজনক। হয়তো পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও অনেক পরিশ্রম করে। এটি সাংঘাতিক দুঃসংবাদ। নিজস্ব বীজের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এসব বীজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি। আগে ঢাকা থেকে হবিগঞ্জে গেলে সকালে রওনা হয়ে রাত ৮টায় পৌঁছতাম। তখন দুটি ফেরি পার হতাম। এখন সকালে রওনা হলে দুপুরে পৌঁছানো যায়। অন্যদিকে ছোট ছোট অনেক মাছ এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। এসব মাছের মধ্যে কৈ অন্যতম। ছোট প্রজাতির কৈ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেক পরিশ্রম করেও সেটি পাওয়া যাচ্ছে না। কাজেই ব্যক্তিমানুষের উপলব্ধির ওপর নির্ভর করছে উন্নয়ন।

অর্থনৈতিক সূচকের দিক থেকে আমরা অনেক এগিয়েছি। কিন্তু এ উন্নয়নকে টেকসই মনে করতে পারছি না। কারণ বনের পরিমাণ আগের চেয়ে ১০ শতাংশ কমে এসেছে। ঢাকা শহরবাসীর পানের জন্য কোনো নদীর পানি শোধনের উপায় নেই। ঋণখেলাপির পরিমাণ বেড়েই চলছে। আবার ঢাকা শহরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। ঢাকা শহরে প্রচুর দালান নির্মাণ হচ্ছে। দেশের সর্বত্র প্রচুর ইটভাটা। সেখানে মানুষের কর্মসংস্থান ঘটছে। কৃষি শ্রমিক হয়ে যাচ্ছেন মজুর। এ অবস্থান পরিবর্তনকে কি আমরা উন্নয়ন হিসেবে দেখব? উন্নয়নে একটি বড় অংশের অর্থ ব্যয় হচ্ছে বিদেশে শ্রমিকদের অমানুষিক পরিশ্রমলব্ধ প্রবাসী আয় থেকে। এটি মোটেই টেকসই নয়। বিষয়টি এমন নয় যে দেশী পণ্যকে কেন্দ্র করে শিল্প বিপ্লব ঘটছে। আমরা আমাদের কৃষি ব্যবস্থাকে বিস্তৃত করতে পেরেছি কিন্তু সুসংহত করতে পারিনি। আমাদের নদী ব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারিনি। খালগুলো হারিয়ে গেছে। ফলে দালান দেখে যে বলবে উন্নয়ন, সে বলবে উন্নয়ন। আমি আসলে এটিকে উন্নয়ন বলব না।

আজকে ঢাকা শহরে এত দালান দরকার ছিল না। বহুতল করে এর অর্ধেকেই হয়তো যথেষ্ট ছিল বসবাসের জন্য। অনেক সবুজ গাছপালা, জলাশয় আমরা বাঁচাতে পারতাম। সেটি আমরা করিনি। যার কারণে যে নগরীতে আমরা বসবাস করছি, সেটিকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ নগরী। অনেক ইটভাটা হচ্ছে। তার দূষণ থেকে মানুষকে বাঁচানো যাচ্ছে না। বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশ ইটভাটা থেকে সরে আসছে বায়ু ও মাটি দূষণের কারণে। আমরা বেশি করে ইট তৈরি করছি, উন্নয়ন হলে নাকি অধিক ইট লাগবে। অথচ আমরা বিকল্প ইটের দিকে যাচ্ছি না। উন্নয়নের জন্য যে প্রযুক্তিকে বেছে নিলে প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচাতে পারতাম, সেটি করা হচ্ছে না।

এক্ষেত্রে আমাদের চামড়া শিল্পের উদাহরণ টানা যায়। চামড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানিমুখী শিল্প। এবার গরুর চামড়া বিক্রয়কারী মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অবস্থা দেখেছি। আমরা অনেক লড়াই-সংগ্রাম করে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে জনগণের করের অর্থ দিয়ে সিইটিপি স্থাপন করে ট্যানারিগুলো হাজারীবাগ থেকে সাভারে নিলাম। সেখানে পুরোপুরি সিইটিপি বাস্তবায়ন করা যায়নি। এখন ধলেশ্বরী দূষিত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, পরিবেশ রক্ষা সরকারের মুখের কথা, এটি কোনো প্রাধিকার নয়। এটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার দিয়ে মোকাবেলা করা হয়নি। অথচ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদকে দেখুন। ক্ষমতায় এসে ঘোষণা করলেন— হ্যাঁ, আমরা একসময় পাম ট্রি চাষাবাদ করেছিলাম। এখন আমরা পাম ট্রি থেকে সরে আসব। এটি আমাদের প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষতি করছে। অন্যদিকে আমরা সুন্দরবনে পরিবেশ রক্ষার কথা বললে শুনতে হয়, ‘বাঘের জন্য কাঁদে, মানুষের জন্য কাঁদে না।’ এটি চরম অসংবেদনশীল বক্তব্য। যে প্রাণ মানুষের জন্য কাঁদে, সে প্রাণ বাঘের জন্য কাঁদবে। আর যে প্রাণ বাঘের জন্য কাঁদে না, সে প্রাণ মানুষ কেন কোনো কিছুর জন্যই কাঁদবে না। ৭৮টি ট্যানারি বন্ধ করার চেয়ে ধলেশ্বরী বাঁচানো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা একটি ধলেশ্বরী সৃষ্টি করতে পারব না। কিন্তু আমরা উল্লিখিত সংখ্যার চেয়ে অধিক ট্যানারি তৈরি করতে পারব। কে বলল, যারা চরম দূষণ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে এবং সেখানে কর্মসংস্থান দিয়ে হাজার হাজার মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটায়, তারা না থাকলে দেশে শিল্পায়ন হবে না! দায়িত্বশীল ও পরিবেশ সুরক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ শিল্পায়ন তো এখনকার বিশ্বেই হচ্ছে। ব্যাংককে হচ্ছে, ভিয়েতনামে হচ্ছে। যদিও সূচকে ভিয়েতনাম পিছিয়ে, তবু তারা পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করছে। আইন প্রণয়ন করছে এবং এর প্রয়োগও নিশ্চিত করছে। বলা যায়, অনেক দেশই পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের দিকে যাচ্ছে।

নিজস্ব বীজ হারিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আমাদের টেকসই করেনি। নিজেদের পানি ব্যবস্থা প্রায়ই ধ্বংস হয়েছে, হয়তো ল্যাবরেটরিতে পানি তৈরি করতে হবে ভবিষ্যতে। কিছুদিন পরে মেঘনায়ও পানি পাব না। সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে, অনিয়ন্ত্রিত দূষণ হচ্ছে। ফলে মেঘনাও আমাদের পানি সরবরাহ করতে পারবে না। আমাদের পাহাড় কোথায়? কক্সবাজার শহরে মাত্র দুটি পাহাড়। একটি উত্তরণের, আরেকটি সিটি কলেজের। দুটি প্রতিষ্ঠান ওই পাহাড় কেটেছে। বাকি পাহাড় স্টেডিয়াম, রাস্তা বানানোর কথা বলে সাফ করে দেয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্পদগুলোকে খনি হিসেবে নিয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে লুণ্ঠন করা হয়েছে। সাদা মাটি শেষ করে দেয়া হয়েছে। সিলিকা বালি নিঃশেষ করে দেয়া হচ্ছে। বালি উত্তোলন করে নদীর প্রতিবেশ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। মাত্র কয়েক কোটি টাকার জন্য অনিন্দ্যসুন্দর জাফলং ধ্বংস হলো। পরিবেশ ধ্বংসকারী উন্নয়ন কখনো টেকসই হয় না। পরিবেশকে টিকিয়ে রেখে উন্নয়ন করলে হয়তো আমাদের জিডিপি তুলনামূলক কম হতো। কিন্তু সেটি টেকসই হতো এবং দীর্ঘমেয়াদে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারতাম।

বাংলাদেশে অসংখ্য নদ-নদী। এগুলোর অধিকাংশই শুকিয়ে গেছে। নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ উজানে বাঁধ দেয়া। আবার ভাটি অঞ্চলে আমাদের পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত বাঁধ। তার ওপর রয়েছে বিভিন্ন বিলের মাঝখানে রাস্তা বা রেলপথ নির্মাণ। আবার আছে নগরায়ণের জন্য নদী দখল। এসব কারণে নদীগুলো মরে যাচ্ছে। নদীগুলো বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সরকারের। সরকার কাগজে-কলমে অনেক কথা বলে। অথচ বুড়িগঙ্গাকে উদ্ধার করে দেখাতে পারে না। জাতীয় পর্যায়ে সরকার কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। নদী রক্ষা কমিশনকে নখদন্তহীন করে রেখে দেয়া হয়েছে। এর আইনগত কর্তৃত্ব দেখলেই বিষয়টি বোঝা যায়।

নদী, বন, পাহাড়— এগুলো মানুষ সৃষ্টি করতে পারবে না। কাজেই এগুলো ধ্বংস না করে যে উন্নয়ন হবে সেদিকেই যাওয়া উচিত। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন দেখলেই বোঝা যাবে, আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পিত হয়নি। দেশের অন্য জায়গাগুলোকে বাঁচানো যাবে কিন্তু ঢাকা শহরকে কীভাবে বাঁচানো যাবে, সে সম্পর্কে আসলে কোনো কূলকিনারা মেলে না। একটি বড় জনবহুল শহরকে বাঁচাতে হলে এর আশপাশের জায়গাগুলোকে বাঁচাতে হয়। সাভার, কেরানীগঞ্জ, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর সবই ভূমিদস্যুরা দখল করে ফেলেছে। ফলে এখান থেকে শহরবাসীর একটি অংশকে যে ওই দিকে সরানো যাবে, সেটি আর সম্ভব নয়। ঢাকা শহর কত মানুষ নিতে পারবে, সেটি আমরা হিসাব করিনি।

দেশে আইন না থাকার কারণে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, এটি আমি মনে করি না। আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে দরকষাকষিতে আমরা ভারতের সঙ্গে পেরে উঠছি না। পারার চেষ্টাও করছি না। আর জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে উষ্ণায়নে দায়ী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকল্পে কত অর্থ পাবে, সেটি না ভেবে মিটিগেট কীভাবে করা যায়, সেটিই হবে টেকসই উপায়। বাংলাদেশ বিদেশে যা বলবে, তা নিজ দেশে চর্চা করতে হবে। আমরা কেন ২৮টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করব? চীন, ভারত যখন নির্মাণ করেছে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে তারা খুব একটা জানত না। তখন সৌরবিদ্যুৎ এভাবে প্রচলিত হয়নি। এখন বাংলাদেশের কাছে বিকল্প প্রযুক্তি আছে। সে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যে অর্থ চায়, সেটি কেন এ কাজে ব্যয় করে না? একসময় কয়লা শেষ হয়ে যাবে, তখন কয়লা পাব কোথায়? আমি মনে করি, আইনের কোনো বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দরকষাকষি ও সঠিক প্রাধিকার নির্ধারণে ব্যর্থতা, জাতীয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা, জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া উন্নয়ন বাস্তবায়ন, দুর্নীতির বিষয় যুক্ত থাকা অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়া— এসব কারণে বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হচ্ছে না।

গণতন্ত্রের অভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে। কাজেই গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে বিশ্বের ধনীদের তালিকায় জায়গা পাওয়া প্রচণ্ড প্রতাপশালীদের অত্যাচারে যে পরিবেশ ধ্বংসের মুখোমুখি হচ্ছে, তা রুখতে লোকজন সংগঠিত হতে পারছে না। সবাই একটি ভীতির আবহে রয়েছে। সরকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেনি। বিজিএমই ভবন ভাঙলে অনেকের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হতো। সরকার তা করেনি। হয়তো চায়ও না। পূর্বাচল দেখুন। ১১ লাখ গাছের বিনিময়ে পূর্বাচলের দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে। প্রথম ধাপ বালু নদ দখল করেই করা হলো। এখন নয় হাজার একরের আবাসন প্রকল্পের একটি পরিকল্পনা করছে রাজউক। সেখানে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ভরাটের পাঁয়তারা চলছে। অধিকসংখ্যক মানুষের আবাসনের দোহাই দিয়ে এগুলো করা হচ্ছে। এরা কি শুধু থাকবে, নাকি তাদের খেতেও হবে। জনসংখ্যার ওপর দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমজনতা নদী-জলাশয় দখল করে না। বিজিএমইর মতো ভবনও বানায় না। তারা বরং খেটে খায়। বিদেশে গিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করে আমাদের অর্থ পাঠায়, আর আমরা তা অপচয় করি কোনো রকম জবাবদিহিতা ছাড়াই। এ ধরনের প্রবণতাই আসলে উন্নয়নকে টেকসই করছে না।

আমরা যদি জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করতে পারতাম। যদি আমরা সঠিকভাবে শিল্পায়নের দিকে মনোনিবেশ করতে পারতাম, তাহলে উন্নয়ন টেকসই হতো। যে শিল্পগুলো আর কেউ নেয় না (যেমন জাহাজ ভাঙা, ইস্পাত, কয়লা), সেগুলো নিয়ে আমরা উত্তেজিত। জনগণকে কি জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তারা কী ধরনের উন্নয়ন চায়? এটা আরোপিত উন্নয়ন। এ উন্নয়নে সরকারের কিছু লোক ধনী হচ্ছে। আশঙ্কা হয়, এ উন্নয়ন একসময় না বুমেরাং হয়ে দেখা দেয়।

এসডিজির পরিবেশ রক্ষার অভীষ্টে আমরা মোটেই এগোইনি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি লক্ষ্যের ক্ষেত্রে আমরা অনেকদূর এগিয়েছি। এর কারণ হলো, এখানে ডেলিভারি সিস্টেম ডিসেন্ট্রালাইজড। সরকারের একটি ইতিবাচক নীতি আছে। এনজিওগুলো এ সেবা দিচ্ছে। স্থানীয় সরকার এখানে ভূমিকা রাখছে। ফলে ডেলিভারি সিস্টেমের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আজকাল যোগাযোগের কারণে সবাই সবার সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে স্বাস্থ্যের অনেক ছোট ছোট বিষয় মানুষ জেনে যাচ্ছে। নিজেও কিছু পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে পারছে। সেখানে আইনের প্রয়োগের কারণেই উন্নতি ঘটেনি। কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। কারণ আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না। আইন আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, প্রশাসন আছে; কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধা হচ্ছে না। কারণ পরিবেশের প্রাকৃতিক সম্পদগুলো কিছু গোষ্ঠী লুণ্ঠন করে খাচ্ছে এবং তার সঙ্গে সরকারের প্রভাবশালী মহল জড়িত।

বিশ্বের অভিধান থেকে উন্নয়ন শব্দটি উঠে গেছে। এখন বলা হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন। পরিবেশ ও উন্নয়ন মোটেও সাংঘর্ষিক নয়, যদি টেকসই উন্নয়নের নীতিগুলো মেনে চলা হয়। উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে জনগণের তথ্য পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। যদি দেখা যায় উন্নয়ন পরিবেশ বিধ্বংসী হচ্ছে, তাহলে জনগণকে প্রতিকার পাওয়ার বিধান করে দিতে হবে। ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিদেশী বিনিয়োগের উন্নয়ন প্রকল্প খারিজ করে দিয়েছে। তাতে কি দেশটির উন্নয়ন থেমে আছে? তা তো নেই। কাজেই উন্নয়ন ও পরিবেশকে
তারাই আসলে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, যারা উন্নয়নের নামে নিজের পকেট ভারী করে। যে উন্নয়ন একটি ছোট গোষ্ঠীকে বড়লোক করে অধিকাংশ মানুষকে সম্পদহারা করে, সেটি টেকসই উন্নয়নের সংজ্ঞায় পড়ে না। আমরা প্রাকৃতিক সম্পদ সৃষ্টি করতে পারব না। আর যা নিজেরা সৃষ্টি করতে পারব না, তা ধ্বংসে আমাদের আইনি বা নৈতিক অধিকার নেই। সরকারকে এ কথাটি মাথায় রেখে আইন প্রয়োগ করতে হবে। তবে নিজস্ব ধারায় উন্নয়ন হবে, সবার মতামতের ভিত্তিতে উন্নয়ন হবে; কোনোভাবেই আরোপিত উন্নয়ন হবে না।

লেখক: পরিবেশবিদ

নির্বাহী পরিচালক, বেলা