প্রশাসনে চাপা ক্ষোভ ও হতাশা ঃ জুনিয়রদের অধীনে দেড়শ’ কর্মকর্তা

মঙ্গলবার, অক্টোবর ৯, ২০১৮

‘আরে ভাই রাখেন তো! আমার চেয়ে দুই ব্যাচ জুনিয়র কর্মকর্তারা এখন মন্ত্রণালয়ের সচিব। তাদের অনেকে এখন এসএসবির (সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড) হর্তাকর্তাও। আমি পড়ে আছি দফতরপ্রধান হয়ে।

স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়াই ভালো ছিল। যাকে সব সময় ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করেছি, সে কিনা আজ আমার ‘বস’। আমার এসিআরও দেবেন, এ ছিল ভাগ্যে।’ কথাগুলো বলছিলেন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮২ ব্যাচের একজন অতিরিক্ত সচিব। যিনি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থার প্রধান।

এখানেই শেষ নয়। এই মুহূর্তে বিসিএস ১৯৮৫ ব্যাচের ২০ কর্মকর্তা সচিব হয়েছেন। এদের ৩ জনই পদোন্নতির সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষ সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সদস্য। ১৯৮২-এর নিয়মিত ও বিশেষ ব্যাচের ১২ জনসহ ১৯৮৪ ব্যাচের প্রায় ১৫১ কর্মকর্তা এখনও অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও উপসচিব পদে কর্মরত।

এছাড়া বিসিএস ১৯৮৫ ব্যাচের ২০ জন সচিব থাকলেও এই ব্যাচের সাড়ে ৩০০ কর্মকর্তা এখনও অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও উপসচিব পদে কর্মরত আছেন। অথচ ইতিমধ্যে তাদের ৩ ব্যাচ জুনিয়ররা অতিরিক্ত সচিব, ৬ ব্যাচ জুনিয়র ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা যুগ্মসচিব এবং ১২ ব্যাচ জুনিয়র ২৪তম ব্যাচের কর্মকর্তারা উপসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।

পদোন্নতিবঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ ওই অতিরিক্ত সচিবকে প্রায়ই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সভাসহ বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নিতে হয়। সেখানে সভাপতিত্ব করেন সচিব পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত তারই দুই ব্যাচ জুনিয়র কর্মকর্তা। সোমবার যুগান্তরের এই প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে ক্ষোভ ও হতাশা থেকে একপর্যায়ে কেঁদে ফেললেন।

নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে বলেন, ‘কেন পদোন্নতি পেলাম না তা আজও জানতে পারলাম না। আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, নেই কোনো বিভাগীয় অভিযোগ। ওএসডিও করা হয়নি। বছরের পর বছর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছি। আমার অধীনেই থাকা বেশ ক’জন কর্মকর্তা আগেই সচিব হয়েছেন। এখন তাদের অধীনেই আমাকে কাজ করতে হচ্ছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদের চেয়ে বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়ায় এ অবস্থা হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতমূলক পদোন্নতিও এ জন্য দায়ী। পদোন্নতি হতে হবে অবশ্যই পক্ষপাতহীন ও মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি দেয়া হলে এ অবস্থার বিছুটা উন্নতি হবে।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, সবাই সচিব পদে পদোন্নতি পাবেন না- এটাই স্বাভাবিক। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে এবং পক্ষপাতহীন পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। এরপরও কারও মনে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হলে তিনি স্বেচ্ছায় অবসরে যেতে পারেন। পদের চেয়ে কর্মকর্তা বেশি হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, বিসিএস ১৯৮২-র নিয়মিত ও বিশেষ ব্যাচের ২৪ কর্মকর্তার মধ্যে ১২ জন সচিব হলেও বাকিরা যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে কর্মরত। এর মধ্যে ৮ জনই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। মন্ত্রণালয়ের সচিব তাদের অনেকেরই দুই ব্যাচ জুনিয়র। বাকি ৪ যুগ্মসচিব ওএসডি। একইভাবে বিসিএস ১৯৮৪ ব্যাচের ১৭০ কর্মকর্তা বর্তমানে প্রশাসনে কর্মরত। তাদের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ জন সচিব হলেও বাকিরা অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও উপসচিব পদে আছেন।

বিশেষ করে এই ব্যাচের ১২ জন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে আছেন। তারা হলেন- চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি গোলাম হোসেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আবদুর রব, তথ্য কমিশনের পরিচালক ভুঁইয়া আতাউর রহমান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের পরিচালক মোহাম্মদ কেফায়েতুল্লাহ ও সৈয়দ মাহবুবে জামিল, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের পরিচালক তপন কুমার নাথ। বাকি ছয়জন ওএসডি। আর এই ব্যাচের ৪৩ জন কর্মকর্তা এখনও যুগ্মসচিব পদে আছেন; যাদের কেউ কেউ জুনিয়র কর্মকর্তার অধীনে কাজ করছেন।

প্রশাসনে ১৯৮৫ ব্যাচের সাড়ে ৩০০ অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও উপসচিবের মধ্যে কমবেশি ৩৭ জন কর্মকর্তা উপসচিব পদে কর্মরত যাদের বেশির ভাগই জুনিয়রদের অধীনে কাজ করছেন। এর মধ্যে রয়েছেন এনটিআরসিএর পরিচালক তৌহিদুর রহমান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আবদুর রশিদ খান, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আবুল বাসার মো. সিরাজুল হক, ভূমি আপিল বোর্ডের সচিব আবু তালেব, বিসিএস প্রশাসন একাডেমির পরিচালক তাহসিনুর রহমান, ওএসডি কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল বাকি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একেএম ফজলুজ্জোহা, ভূমি সংস্কার বোর্ডের কমিশনার এজিএম মীর মশিউর আলম ও কাজী মেরাজ হোসাইন, ওএসডি কর্মকর্তা কামরুজ্জামান চৌধুরী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের প্রকল্প পরিচালক আবদুল মান্নান, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মোহাম্মদ মফিজুল ইসলাম পাটোয়ারী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জামাল হোসাইন মজুমদার, কোর্ট অব সেটেলমেন্টের সদস্য ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও শফিক আনোয়ার, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব লোকাল গভর্মেন্টের পরিচালক মো. ইয়াহিয়া ভূঁইয়া ও আবদুর রশিদ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে সংযুক্ত মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালক আলনুরি ফাইজুর রেজা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের এএম শাফিউল হাসান, ওএসডি কর্মকর্তা আলাউল হক, মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ভূঁইয়া, চৌধুরী ইস্কান্দার আনোয়ার, মোজাম্মেল হক খান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ইকরামুল হক ও জগন্নাথ দাস খোকন, পরিকল্পনা বিভাগের জালাল উদ্দিন আহমেদ হোসাইন, আণবিক শক্তি কমিশনের সচিব ওয়াহেদুন্নবী সরকার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত জসিম উদ্দিন বাদল, শিল্পকলা একাডেমির প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, আইন ও বিচার বিভাগের শুভাশিষ সাহা, আইসিটি বিভাগের সোলাইমান মণ্ডল, ওএসডি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান, খন্দকার মোখলেসুর রহমান, হাসনুন নাহার, সৈয়দ আল আমিন, মো. আবদুল হাফিজ প্রমুখ।

১৯৮৫ ব্যাচের এক উপসচিব বললেন, ‘জুনিয়রদের অধীনে কাজ করতে গিয়ে মানসিক যন্ত্রণায় আছেন সিনিয়ররা। আনুষ্ঠানিক বৈঠকে জুনিয়রদের স্যার সম্বোধন করতে হয়। যদিও অফিসের বাইরে তাদের তুমি বলি। এ বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে যাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিএস ১৯৮২ বিশেষ ব্যাচের একজন অতিরিক্ত সচিব জানান, তার মন্ত্রণালয়ের সচিব তার দুই ব্যাচ জুনিয়র। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর খুবই ‘আপসেট’ ছিলাম। হয়তো আমার কপাল ভালো। এমন বিনয়ী সচিব কখনও দেখিনি। প্রয়োজন হলে তিনিই আমার রুমে আসেন বা ইন্টারকমে সালাম দিয়েই বলেন, ‘স্যার আমার রুমে আজ চা খাবেন না।’ তার রুমে গেলে নিজের চেয়ার থেকে উঠে স্যার বলে দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। তবে এমন চিত্র খুবই কম বলে মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা।
উৎসঃ যুগান্তর

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন