কয়লা থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাত্রা

আড়াই ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব বিজ্ঞানীদের

মঙ্গলবার, অক্টোবর ৯, ২০১৮

ঢাকা: জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হুমকি মোকাবেলায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে ২০৩৫ সাল নাগাদ ২ দশমিক ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ২০৫০ সালের মধ্যে কয়লার ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনে এ অর্থ অবশ্যই ব্যয় করতে হবে বলে জানিয়েছেন তারা। জাতিসংঘের আহ্বানে আয়োজিত বিজ্ঞানীদের একটি সম্মেলন থেকে এ প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। খবর ব্লুমবার্গ ও গার্ডিয়ান।

বিশ্বের শীর্ষ জলবায়ু বিজ্ঞানীদের নিয়ে আয়োজিত ওই সম্মেলন থেকে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধরে রাখতে হাতে এক যুগেরও কম সময় রয়েছে। উষ্ণতা যদি তার চেয়ে আধা ডিগ্রিও বৃদ্ধি পায় তা লক্ষণীয়ভাবে খরা, বন্যা, ভয়ানক তাপমাত্রা ও লাখো লাখো মানুষকে দরিদ্রতার মধ্যে ফেলবে।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল-আইপিসিসি সোমবার একটি প্রতিবেদনে ওই আশঙ্কাগুলো ব্যক্ত করেছে। প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি দেড় থেকে ২ ডিগ্রির মধ্যে রাখতে অনতিবিলম্বে নজিরবিহীন পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে বলে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বরফ গলা ত্বরান্বিত হয়েছে। বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা শিল্পবিপ্লবের সময়ের উষ্ণতা থেকে প্রায় ১ ডিগ্রি (১ দশমিক ৮০ ফারেনহাইট) বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনতর অবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার অব্যাহত রাখলে উষ্ণতা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের।

বর্তমানে যে হারে উষ্ণতা বাড়ছে, এটা চলতে থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ পৃথিবীর উষ্ণতা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়বে। ২০১৫ সালে ২০০ দেশের স্বাক্ষরিত প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার চেয়ে যা দ্বিগুণ।

প্রতিবেদনটি প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা বিজ্ঞানীদের সংগঠনটির সহসভাপতি পানমাও ঝাই বলেন, ‘বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির ফল আমরা দেখতে পাচ্ছি; আবহাওয়া পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আর্কটিক সাগরের বরফ কমছে।’

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি কীভাবে দেড় ডিগ্রির মধ্যে রাখা যায়, এ নিয়ে গবেষণার জন্য আইপিসিসিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন ২০১৫ সালের প্যারিস সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিনিধি দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা। বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ২০১০ সালের তুলনায় ৪৫ শতাংশ কমাতে হবে। এবং ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নিয়ে আসতে হবে। এটা সম্ভবপর করতে হলে ‘সমাজের সর্বস্তরে নজিরবিহীন পরিবর্তন’ নিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনতে হবে। প্রতিবেদনে এটি স্বীকার করা হয়, ওই পরিবর্তনগুলো কঠিন ও ব্যয়বহুল কিন্তু অসম্ভব নয়।

প্রতিবেদনটিতে আইপিসিসি বলছে, ‘আকারের দিক থেকে ওই ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রূপান্তর অভূতপূর্ব হলেও তা আনতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ উপায়গুলো কারিগরিভাবে সফল প্রমাণিত হলেও অর্থনৈতিক, মানবীয় সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে বড় আকারে স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।’

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখতে হলে ২০৫০ সাল পর্যন্ত স্বল্প কার্বন জ্বালানি প্রযুক্তি খাতে বার্ষিক বিনিয়োগ ২০১৫ সালের তুলনায় পাঁচ গুণ বাড়াতে হবে। ২০৩৫ সাল নাগাদ এ খাতে বার্ষিক বিনিয়োগ করতে হবে ২ দশমিক ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার, ব্লুমবার্গের হিসাবে গত বছরের ৩৩ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের চেয়ে যা সাত গুণ বেশি।

আইপিসিসি তাদের প্রস্তাবনায় আরো যে বিষয়গুলো উপস্থাপন করেছে, তার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার অংশ ২ শতাংশ বা তার চেয়ে কমিয়ে আনতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি নির্গমন শোষণে কার্বন নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৮ শতাংশে নামাতে হবে।ব:বা: