আশাহত বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের ছক

সোমবার, অক্টোবর ৮, ২০১৮

ঢাকা: নির্দলীয় সরকারের দাবি ও দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির লক্ষ্যে সরকারবিরোধী সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোরকে সঙ্গে নিয়ে এবার যুগপৎ আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। দলটির একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে আলাপচারিতায় এমন আভাসই পাওয়া গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একটি সূত্রমতে, সরকার শেষ মুহূর্তে সংলাপ বা আলোচনার মাধ্যমে কোনো না কোনো সমঝোতায় আসবে, এমন আশা ছিল ক্ষীণ। তবুও সরকারকে ক্রমান্বয়ে সময় দিয়ে গেছে তারা। কিন্তু আওয়ামী লীগ যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করতে চাচ্ছে, তাতে নিজেদের জয় নিশ্চিত করা ছাড়া অন্য কিছু মাথায় নেই, বিষয়টি এখন বিএনপির কাছে স্পষ্ট যে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি করবে না। বরং বিরোধীদল দমনে আগের চেয়ে আরও কঠোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

তাই সংলাপ সম্ভবনা ক্ষীণ বিবেচনায় নিয়ে দাবি আদায়ে বিএনপি এবার স্বল্পমেয়াদী যুগপৎ আন্দোলনের ছক ও পরিকল্পনায় কৌশল নির্ধারণ করছে।

এতে যার যার অবস্থান থেকে আন্দোলন কর্মসূচি পৃথক হলেও রাজপথে আন্দোলনে প্রতিটি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশে পেতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ায় সরকারের নানান অনিয়ম তুলে ধরতে একটি শক্তিশালী আইনজীবী প্যানেল পরিষদও গঠন করা হয়েছে। যারা সরকার বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়া নেতাকর্মীদের মতো সাধারণ জনগণকেও প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেবেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার নামে সরকারের বেআইনি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখবেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দাকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি রাজপথ আন্দোলন করে যাচ্ছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। সেই লক্ষ্যে এবার গতানুগতিক আন্দোলনের ধরন ও কৌশলে ভিন্নতা নিয়ে আসার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই কর্মসূচি বিএনপি তার নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট, ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জোট জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, যুক্তফ্রন্টসহ সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ঘোষণা করা হবে। প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে রাজপথে আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশ নেবে, প্রয়োজনে ভিন্ন কর্মসূচি ও ভিন্ন ব্যানারে গড়ে ওঠা আন্দোলন যুগপৎ আন্দোলনে মোড় নেবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৭ অক্টোবর, বুধবার রাতে বিএনপি ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর যুক্তফ্রন্ট একসঙ্গে আগামী দিনের আন্দোলন কর্মসূচি নির্ধারণে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে যুগপৎ আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হতে পারে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিএনপি একটি উদার ও মধ্যমপন্থী রাজনৈতিক দল। ফলে বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় যেতে হলে নির্বাচন করেই যাওয়ার কথা বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। কিন্তু সেই নির্বাচন দরজায় হাত বাড়ালেও এখনো নেই সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ। তা ছাড়া আমাদের দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মিথ্যা মামলায় কারাবন্দি আছেন। মুক্তি পেতে সরকার আইনি প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। সামনে নির্বাচন তাই খালেদা জিয়া মুক্ত করতে এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আদায়ে বিএনপির আন্দোলনের বিকল্প নাই। কেননা আমি মনে করি, নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতায় থাকা ও যাওয়া কারো জন্যই সুখকর হবে না। তাই জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠায় রাজপথ আন্দোলনে সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করা হবে।’

বিএনপির আন্দোলন বিষয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বলেন, ‘সরকার দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যকার বিভক্তির কারণেও আন্দোলনের মাঠে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে বিএনপি তথা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। কারণ নানামুখী নির্যাতন-হয়রানি ও বঞ্চনার প্রশ্নে বিরোধীদলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ। অন্যদিকে প্রায় ১০ বছর শেষ হতে যাওয়া ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা, সুবিধা পাওয়া, না পাওয়া নিয়ে নিজেদের মধ্যে নানা বিভক্তি তৈরি করেছে। এমনকি বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে- সরকারের বাড়তি সুবিধাপ্রাপ্তদের মধ্যে আন্দোলন মোকাবেলার ক্ষেত্রে পিছুটান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেননা অতিরিক্ত অর্থবিত্ত একদিকে তাদের জীবনকে করে মূল্যবান, অন্যদিকে নিজেদের করেছে আন্দোলন বিমুখ। আর দলের বঞ্চিতদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারাও হয়তো আন্দোলন প্রশ্নে খুব বেশি ঝুঁকির মধ্যে যেতে চাইবেন না। এই অবস্তায় বিরোধী দলের তুলনায় সরকার দলের প্রস্তুতি বেশ নড়বড়ে বলেই মনে হচ্ছে। অবশ্য বিরোধী দলের কর্মসূচিতে জনগণ কেমন সাড়া দেয় এবং সরকারের ন্যায়, অন্যায় আদেশ নির্দেশ পালনে প্রশাসন (পুলিশসহ) কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে সরকার রীতিমতো অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে চলছে কঠিন হিসাব-নিকাশ। যদিও নির্বাচন হবে কি না, সেটা পরিষ্কার নয়। কারণ নির্বাচনের সময় দ্রুত এগিয়ে আসলেও এখনো নির্বাচনকালীন সরকার গঠন ও তফসিল ঘোষণা খানিকটা মনে হচ্ছে ঝুলে আছে এক অদৃশ্য নির্দেশনায়। সে ক্ষেত্রে চলতি মাসের প্রথম দিকে নির্বাচনকালীন সরকার ও মসের মাঝামাঝিতে তফসিল ঘোষণাও হয়তো আটকে যাচ্ছে। তাই চলতি মাসের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগতে পারে। ফলে ডিসেম্বর ছাড়িয়ে নির্বাচন জানুয়ারিতে গিয়েও ঠেকতে পারে। তারপরও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের হিসাব-নিকাশ হচ্ছে, যেনতেন নির্বাচন করে হলেও পুনরায় ক্ষমতায় আসা। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা, গ্রেফতার অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী, এজেন্ট কারা কারা এবং মাঠ পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার সক্ষমতা কার আছে, এমন নেতাকর্মীদেরও শনাক্ত করা হচ্ছে, নামে-বেনামে গায়েবি মামলা দেওয়া হচ্ছে।

পক্ষান্তরে বিএনপির হিসাব-নিকাশ হচ্ছে, সংলাপ কিংবা আন্দোলনের মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে ক্ষমতাসীন সরকারকে বাধ্য করা। যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় না যেতে পারলেও অন্তত শক্তিশালী বিরোধীদল হয়ে ওঠা।

শুক্রবার, ৫ অক্টোবর এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আগামীতে আন্দোলনের উপযুক্ত কর্মসূচি দেওয়া হবে। কারণ দেশের মানুষ এই সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। তাই জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আগামীতে এমন কর্মসূচি দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে এই সরকারের পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।’

মওদুদ বলেন, ‘কী ধরনের কর্মসূচি দিতে হবে, তা আগামী দিনের পরিস্থিতি বলে দেবে। গণমাধ্যমের অনেক বন্ধু জিজ্ঞাসা করেন কী ধরনের কর্মসূচি দেবেন, কখন দেবেন? আমি বলতে চাই, এগুলোর সময় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। আগামী এক মাসেই অনেক পরিবর্তন দেখা যাবে। তারা একতরফা যতই প্রচারণা করুক না কেন, তাতে কোনো লাভ হবে না।’

বিএনপি নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে, নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পূর্বে খালেদা জিয়ার মুক্তি, সংসদ ভেঙে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টির খুব একটা সুরাহা দেখছে না বিএনপি। তাই সামনে আন্দোলনের জন্য রণ প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। ফলে চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে রাজপথে নামতেও প্রস্তুতি রয়েছে। সেই লক্ষ্যে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পূর্বেই মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা, জনসভাসহ নানা কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে শুরু হয়ে এক পর্যায়ে ধাপে ধাপে চূড়ান্ত ও কঠোর আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হবে। বিভাগীয় ও জেলা নেতৃত্বকেও কেন্দ্র থেকে সে ভাবেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তফসিল ঘোষণার পর সারা দেশ অচল করে দেওয়ার মতো কর্মসূচি দেওয়া হবে। কারণ তাদের ধারণা সাধারণ মানুষের ম্যান্ডেট এখনো বিএনপির পক্ষেই রয়েছে। একটা অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিপুল ভোটে জিতবে বিএনপি।

এই বিষয়ে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ শাহজাহান বলেন, ‘ক্ষমতায় আরোহণ নয়, বিএনপির মূল লক্ষ্য একটাই, সেটা হলো যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগকে সরাতে হবে। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে দেশে কোনো গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূল নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে না। জনগণের সরকারও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। তাই আন্দোলনের বিকল্প নাই। আন্দোলনেই সমস্যা সমাধান করতে হবে, তাই কর্মসূচি নিয়ে বিএনপিকে ফের মাঠে নামতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় নয়, অন্তত সংক্ষিপ্ত সময়ের আন্দোলনে দাবি আদায়ে সরকারের পতন নিশ্চিত করার কৌশল পরিকল্পনায় ছক কষতে হচ্ছে।’

শাহজাহান বলেন, ‘পরস্পর বিরোধী অবস্থানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে নির্বাচনকে ঘিরে খুব একটা সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। অথচ সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। মনে হচ্ছে, সামনের দিনগুলোতে দেশবাসীর জন্য অপেক্ষা করছে কেবলই অনিয়শ্চয়তা, দুর্দশা ও সহিংসতা। তার মনে কি আরেকটি ২৮ অক্টোবর ধেয়ে আসছে? আমরা কি মুখোমুখি হবো সেই পরিস্থিতির? যেখানে দেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষ কখনোই এ রকম পরিস্থিতি প্রত্যাশা করে না।’