ঢাকা, ০৭ জুলাই (প্রাইম নিউজ বিডি ডটকম)- উত্তরাঞ্চলের পর এবার দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। উত্তরের বন্যার পানি গড়িয়ে সমুদ্রে যেতে যেতে দক্ষিণের কীর্তনখোলা, সন্ধ্যা, সুগন্ধ্যা, পায়রা ও মেঘনাসহ কয়েকটি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর জমির ফসল, বীজতলা, বাগান ও শাক-সবজির ক্ষেত। দক্ষিণাঞ্চলের শত শত মাছের ঘের পানিতে ডুবে লাখ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। এদিকে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে বানের পানি নামতে থাকলেও দুর্ভোগ কাটেনি লাখ লাখ বানভাসি মানুষের। বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে রোগ-ব্যাধি। এতে জনদুর্ভোগ আরো বাড়ছে।
ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে নদী তীরের কয়েকটি জেলায়। ঘরবাড়ি ছেড়ে আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে শুরু করেছে লোকজন। শরীয়তপুরে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে এরই মধ্যে অন্ততঃ ৫শ’একর ফসলি জমি ও ৩১০টি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন আতঙ্কে এলাকার মানুষ বসতভিটা থেকে ঘর-বাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে।
পূর্ণিমার জোয়ার ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্র তীরবর্তী ঝেলা বরগুনার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া বরগুনা সদর, আমতলী, পাথরঘাটা, বেতাগী, বামনা ও তালতলী উপজেলার কমপক্ষে ১৫টি স্থানের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। চরম আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন লোকজন।
নদীর পানি বাড়ার কারণে পিরোজপুরের ভা-ারিয়া উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে নদমূলা, চরখালী, হেতালিয়া, বোথলা, পশারীবুনিয়া, সিংহখালী, গাজীপুর, গৌরিপুর, আতরখালী ইকড়ি, তেলিখালী, জুনিয়া, হরিণপালা, এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার অসংখ্য মাছের ঘের, পুকুর ডুবে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়ছে। আমনের বীজতলা, বিভিন্ন ফসল ও সবজি খামার পনিতে ডুবে গেছে। ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরা উপজেলার বাঁধ ধসে জোয়ারের পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। বুধবার পর্যন্ত সেখানকার আটটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
এদিকে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে বানের পানি নামতে থাকলেও দুর্ভোগ কাটেনি লাখ লাখ বানভাসি মানুষের। বানের পানির তোড়ে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, গাছপালা, ফসলি জমি, গবাদিপশু। এখন বানের পানি নেমে যাওয়ায় ঘরে ফিরে পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে অনাহার আর অর্ধহারেই দিন কাটাচ্ছেন দরিদ্র মানুষেরা । চরম সংকট দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের। বন্যা উপদ্রুত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও ওষুধ সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগের ৮৫টি টিম কাগজ-কলমে থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তাদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।
উত্তরের নদী যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, তিস্তাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করায় বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়েছে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, পাবনা ও জামালপুরে। কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তাসহ ১৬টি নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও এখনও ১৮০টি চরাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। সেখানে বানের পানিতে ২৭ হাজার ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ায় আশ্রয়হীন লক্ষাধিক লোক এখনও বাস করছেন পাকা সড়ক ও বাঁধের উপর খোলা আকাশের নিচে।
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে পানিবন্দি মানুষের মাঝে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে। বন্যাকবলিত মানুষ খোলা আকাশের নিচে, সড়কে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে অতিকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। গাইবান্ধায় বন্যাকবলিত ৩ লাখ মানুষের মধ্যে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। দুর্গত বেশিরভাগ এলাকায়ই কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি।
জামালপুরে যমুনা নদীর পানি কমতে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে ঘরবাড়ি থেকে বন্যার পানি এখনও সরে না যাওয়ায় ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দেড় শতাধিক পরিবার উঁচু রাস্তা, বাঁধ ও রেললাইনের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। পানি কমার সঙ্গে নদীভাঙ্গনও তীব্র আকার ধারণ করেছে। নতুন করে আওনা ইউনিয়নের চন্দনপুর, বালিকান্দি, ঘইঞ্চারচর, কুলপাল গ্রামের ৪০-৫০টি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীতে আকস্মিকভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এনায়েতপুর ও চৌহালীতে বন্যা শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে এই দু’টি থানার ৯টি ইউনিয়ন পুরোপুরি বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে যমুনার পূর্ব তীরবর্তী বোয়ালকান্দি থেকে দক্ষিণে পাথরাইল পর্যন্ত প্রায় ১৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শুরু হয়েছে ভয়াবহ নদী ভাঙন। গত এক সপ্তাহে প্রায় পাঁচ শতাধিক ঘর-বাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে গেছে। পদ্মায় পানি বাড়তে না বাড়তেই রাজশাহীর চারঘাটের টাঙ্গন থেকে ইউসুফপুর ঘোষপাড়া পর্যন্ত এলাকার বাঁধে ধস নেমেছে। ইতোমধ্যেই শহর রক্ষা বাঁধের দেড় কিলোমিটার এলাকার প্রায় দশটি স্থানে ধস দেখা দেওয়ায় এলাকার মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
এদিকে দেশের উত্তর-পর্বাঞ্চলীয় নদী সুরমা ও কুশিয়ারার উজানে পানি কমায় সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে । তবে বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ডায়রিয়া পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। রোববার থেকে সিলেটের ১২ উপজেলায় ডায়রিয়া প্রকোপ দেখাদিয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের সিভিল সার্জন ডা: কামরুল ইসলাম। জেলায় বন্যা পরবর্তী রোগ-ব্যাধির প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় ১৫৭ টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০টি টিম দুর্গত এলাকায় কাজ করে যাচ্ছে।
পার্বত্য জেলা বান্দরবানে গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ১০৭টি নলকূপ, রিংওয়েল এবং পানি সরবরাহের পাইপলাইন নষ্ট হওয়ায় নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকট বিরাজ করছে। বন্যাদুর্গত এলাকার শত শত মানুষ এখন বাধ্য হয়ে পাহাড়ি ঝর্ণাও খালের দূষিত পানি ব্যবহার করছে। এতে বহু এলাকায় অসংখ্য লোক পেটের পীড়াসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জন প্রতিনিধিরা।









