নাজমুল হক শামীম, ফেনী প্রতিনিধিঃ ০২ জুলাই (প্রাইম নিউজ বিডি ডটকম)- ফেনীর দক্ষিণাঞ্চলের ত্রাস পুলিশের তালিকাভূক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী যুবলীগ ক্যাডার জলদস্যূ ও ডাকাত সর্দ্দার আনোয়ার হোসেন প্রকাশ মিন্টু (৩৫) কে সোমবার সকালে উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের পূর্ব বড়ধলী গ্রামের তার শ্বশুর বাড়ি থেকে সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জলদস্যূ সর্দ্দার আনোয়ার হোসেন মিন্টু দীর্ঘদিন থেকে সোনাগাজীর উপকুলীয় অঞ্চলে লুটপাট, ডাকাতি, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছিল। পুলিশ ও র্যাব একাধিক বার অভিযান চালিয়েও বেশ কয়েকবার গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার সকালে তার শ্বশুর বাড়ি পূর্ব বড়ধলী গ্রামের সেলিম লন্ডনীর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশ মিন্টুকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসার সময় তার বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় বোমা ফাটিয়ে আতংক সৃষ্টি করলে পুলিশও পাল্টা চার রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। গ্রেফতারকৃত জলদস্যূ সর্দ্দার আনোয়ার হোসেন মিন্টু চরচান্দিয়া ইউনিয়নের মধ্যম চরচান্দিয়া গ্রামের আবুল কালামের ছেলে।
সোনাগাজী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নবীর হোসেন জানান, সোনাগাজীর দক্ষিণাঞ্চলের ত্রাস জলদস্যূ সর্দ্দার মিন্টুকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। তার বির“দ্ধে সোনাগাজী মডেল থানায় ডাকাতি, লুটপাট, ধর্ষণ, খুন, চাঁদাবাজি, চুরি সহ নানা অপরাধ মূলক কর্মকান্ডে ২০টি মামলা সহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
যেভাবে পিচ্চি চোর থেকে ডাকাত দলের গ্যাং লিডারে হয় মিন্টুঃ
ফেনীর সোনাগাজীর দক্ষিণে বিস্তৃর্ণ চরাঞ্চলে বিভিন্ন স্থান থেকে জলদস্যুরা এসে অবস্থান করায় ভয়ংকর রূপ ধারন করেছে এখানকার পরিবেশ। বৃহত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, কোম্পানীগঞ্জ, সন্দ্বীপ, মিরস্বরাই, উড়িরচর সহ নদী পথে আরো বেশ কয়েকটি স্থানে জলদস্যূ ও ডাকাতদের সংঘবদ্ধ ঘাটি হচ্ছে সমুদ্র উপকুলীয় এলাকা। জলদস্যূদের আতংকে কাঁপছে সোনাগাজীর উপকুল। সোনাগাজীর জলদস্যূ ও ডাকাত সর্দ্দার আনোয়ার হোসেন প্রকাশ মিন্টু ডাকাতের হাতের ইশারায় সংঘবদ্ধ ভাবে তারা প্রতিনিয়ত নদী ও স্থলপথে বিভিন্ন ধরণের চুরি, ডাকাতি, লুটপাট, ছিনতাই ও চাঁদাবাজী সহ অনেক অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মিন্টু ডাকাত এ অঞ্চলের আস্তানা সোনাগাজীর সর্বদক্ষিণ পশ্চিম এলাকার সমুদ্র উপকুলে। এখানে রয়েছে সংঘবদ্ধ প্রায় ৩০টিরও অধিক জলদস্যূ ও ডাকাতদল। ছোটখাট চুরি, ডাকাতি থেকে মিন্টু বর্তমানে আন্ত: জেলা ডাকাতের গ্যাং লিডার হিসেবে রূপ নিয়েছে। মিন্টু ডাকাতকে সহযোগিতাকারী মিরস্বরাই এলাকার জলদস্যূ ও ডাকাত দল সহযোগিতাকারী গ্রুপ গুলো হচ্ছে পিচ্ছি কামাল গ্রুপ, অহিদ গ্রুপ, আর্মি বসর গ্রুপ, হোসেন মাঝি গ্রুপ, ভান্ডারি গ্রুপ, সোহাগ বাহিনী। সন্দ্বীপ এলাকায় তার অধিনস্থ গ্রুপ গুলো হচ্ছে জহির গ্রুপ,জাসু গ্রুপ, নেয়ামত গ্রুপ, ইসমাইল গ্রুপ, লাবলু মেম্বার গ্রুপ, চরলক্ষী এলাকার জুনু মিয়া গ্রুপ, নবী বাহিনী, বসর মাঝি গ্রুপ, জাকের গ্রুপ, আবদুর রব গ্রুপ, মৃত হারিছ গ্রুপ, কোম্পানীগঞ্জ এলাকার টিপু গ্রুপ, মেম্বার আফছার গ্রুপ, বদু গ্রুপ, জাবেদ বাহিনী। সোনাগাজী এলাকার তার অধিনস্থ গ্রুপগুলো হচ্ছে হাসেম মাঝি গ্রুপ, রুস্তম গ্রুপ, সন্দ্বিপী মানিক গ্রুপ, হাসেম মাঝি গ্রুপ, ও নিজামের ৩টি গ্রুপ। এছাড়াও এসব এলাকার ও চট্টগ্রামের নাম না জানা বেশ কয়েকটি বড় বড় জলদস্যূ ও ডাকাতদলের সাথে যুক্ত হয়ে এক সাথে কাজ করে থাকে। সম্প্রতি মিন্টুর নেতৃত্বে ওই সব জলদস্যূ ও ডাকাত দলের সদস্যরা সোনাগাজীর উপকুলে হানা দিয়ে মহিষ, গরু, ভেড়া খামার থেকে প্রায় সহশ্রাধিক গৃহপালিত পশু লুট করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে। সংঘবদ্ধ গ্রুপগুলো রাতের আধারে এ সব অপরাধমূলক কর্মকান্ড ঘটিয়ে ডাকাতি ও লুটকৃত মালামাল ও অর্থের জমা ও বিলি ভন্টন করে মিন্টুর নেতৃত্বে। দিনে দিনে পাশপার্শ্ববর্তী মিরস্বরাই উপজেলার ডাকাতগুলো তার অধীনে নিয়ে আসে। এর পর সন্দ্বীপ, কোম্পানীগঞ্জ, লক্ষীপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ আশেপাশের এলাকায় গ্যাং লিডারদের সাথে যোগাযোগ করে সমুদ্র উপকুলে সংঘবদ্ধ করে মিন্টু বাহিনী। এ সব এলাকায় ডাকাত দের ঘাটি ও নিরাপদ আস্তানা হচ্ছে সমুদ্র উপকুল। সমুদ্র উপকুলীয় এলাকায় আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতি দূর্গম ও দূরদূরান্তে যোগাযোগ ব্যবস্থা কারণে এরা প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকে। কখনো এদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হলে এরা নিজস্ব বাহন ট্রলার করে মাঝ সমুদ্রে গিয়ে নিরাপদে আশ্রয় গ্রহণ করে। অপর দিকে পুলিশ বা আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন নো-যান ব্যবস্থা না থাকায় এদের বিরুদ্ধে নদী বা সমুদ্রে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। তাই এরা নিবিঘ্নে নদীপথে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে থাকে।
সূত্রে আরো জানায়, জলদস্যূ মিন্টু বাহিনীর প্রধান মিন্টু ডাকাত সোনাগাজী থেকে নদী পথে মায়ানমার সহ বিভিন্ন দিকে সার পাচার করে অস্ত্রের চালান এনে ফেনী সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে থাকে। তার অত্যাচার নির্যাতনে সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের হিন্দু, মুসলিম সহ সর্বস্তরের জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। কেউই তার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেনা। চরচান্দিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণাঞ্চলের মিন্টুর নেতৃত্বে প্রতিনিয়ত ঘটছে খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই চাঁদাবাজী সহ অসংখ্য অপরাধ। এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতাদের ছয়ছায়ায় থেকে মিন্টু বাহিনী সোনাগাজীর তথা নদী উপকুলীয় অঞ্চলে এ সব অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
এ দিকে সোনাগাজীর উপকুলীয় অঞ্চলের খামারিরা বর্তমানে প্রতিনিয়ত ডাকাত আতংকে দিনযাপন করছে। দিন-দিন কমে যাচ্ছে গৃহপালিত পশুপালন। কারণ জলদস্যূরা রাতের আধারে খামারে হানা দিয়ে প্রহরীদেরকে বেধম প্রহার ও বেধে রেখে ট্রলারযোগে পুরো খামার শূণ্যপদে পশুগুলো নিয়ে নদীপথে অজ্ঞাত স্থানে চলে যায়।
স্থানীয় জনগণ জানান, ছোট ফেনী ও বড় ফেনী নদীতে কোস্টগার্ড না থাকায় জলদস্যূরা নির্ভয়ে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কোন ব্যক্তি জলদস্যূদের ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মুখখুলে কিছু বলতে চায় না। তার পর ও গত এক সপ্তাহে সোনাগাজীর দক্ষিণাঞ্চলের চরআবদুল্যাহ থেকে প্রায় ৩ শতাধিক গৃহপালিত পশু জলদস্যুরা লুট করে নিয়ে যাওয়ার পর থানায় দুটি মামলা হলেও পুলিশ এখনো পর্যন্ত নৌপথে অভিযান চালিয়ে কোন জলদস্যূকে গ্রেফতার করে পারেনি। মিন্টু সহ তার বাহিনীর অনেকগুলো সদস্যকে গ্রেফতার করলেও উপকুলে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থেমে যায়নি। তবে সাধারণ জনগণ এ গ্রেফতারে সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
সূত্রে জানায়, সোনাগাজীর দক্ষিণাঞ্চলের ত্রাস জলদস্যূ সর্দ্দার আনোয়ার হোসেন মিন্টু কে গ্রেফতার করা হলেও বাকি রয়ে গেল জলদস্যূ সর্দ্দার রুস্তম আলী এবং আবদুর রহমান মানিক ওরুপে সন্দ্বিপী মানিক, হাসেম মাঝিকে গ্রেফতার করা হলেও সোনাগাজীর দক্ষিণাঞ্চল তথা সমুদ্র উপকুল পুরোপুরি নিরাপদ হয়ে যাবে। তাদের ছয়ছায়ায় বিভিন্ন স্থানে জলদস্যূরা সোনাগাজী এলাকায় প্রবেশ করে নির্ভয়ে দিনযাপন করে। দূর্গম পথ ও থানা প্রশাসনের কাছে নদী অভিযান পরিচালনা করার মত কোন যানবাহন না থাকায় তারা নির্বিঘ্নে বড় ফেনী নদীর ওপারে ফরেস্ট বাগানে আশ্রয় গ্রহণ কর্। তাদের একাধিক লোক থানার সামনে অবস্থান করে পুলিশের গতিবিধি সর্বদা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাদেরকে জানিয়ে দেয়।
পুলিশ সংবাদ পেয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযান চালাতে বের হলেও তার পূর্বেই জলদস্যূরা পুলিশ আসছে খবর পেয়ে নদী পথে অজ্ঞাত স্থানে চলে যায়। সোনাগাজীর উপকুলীয় অঞ্চল কে জলদস্যূ ও ডাকাতমুক্ত করতে হলে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, চট্টগ্রামের মিরস্বরাই ও ফেনী জেলার সোনাগাজী থানা পুলিশ কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সহযোগিতা নদীপথে একযোগে অভিযান পরিচালনা করতে হবে বলে জানিয়েছের এলাকাবাসী।
এদিকে গত দুমাসে জলদস্যূ সর্দ্দার আনোয়ার হোসেন মিন্টুর নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থানে জলদস্যূরা সোনাগাজীর উপকুলের চরাঞ্চলে হানা দিয়ে খামার গুলো শূণ্য করে অন্তত ৩ সহস্রাধিক গরু, মহিষ, ভেড়া লুট করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে। অপর দিকে মিন্টুকে গ্রেফতারের পর এলাকার সাধারণ ও নির্যাতিত জনগণ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে দুপুরে যোহরের নামাজ পড়ে অনেক ধর্ম প্রাণ মুসল্লী পুলিশ প্রশাসনের জন্য দোয়া মুনাজাত করেছেন। এছাড়াও তার গ্রেফতারের খবরে এলাকাবাসী বিভিন্ন স্থানে মিষ্টি বিতরণ করেছে।









